ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

অপরাধমুক্ত সমাজ চায় সিয়াম

মানব জাতিকে পূতপবিত্র ও সুন্দরতম করে গড়ে তোলার একটি অত্যন্ত কার্যকরী পন্থা হলো রমজানের রোজা। পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম-সাধনা আল্লাহর অনন্ত অসীম রহমতের দ্বার খুলে দেয়। মানুষকে বেহেশতি সওগাত লাভ করার উপযুক্ত করে তোলে। রোজার মাধ্যমে মুত্তাকি হওয়া যায় এবং ধনী-গরিবের প্রতি সহমর্মী, ধৈর্যশীলতা ও সহনশীলতা অর্জন করা যায়। সিয়াম-সাধনায় পারস্পরিক সহমর্মিতাবোধ জাগ্রত হয় এবং পাপকাজ থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে ওঠে।

মূলত মানব চরিত্রে, বিশেষ করে মুসলমানদের চরিত্রে এসব অনুভূতি এবং চারিত্রিক গুণাবলি আরো শাণিত করার ল্েযই প্রতি বছর আমাদের দ্বারে এসে উপস্থিত হয় মাহে রমজান; কিন্তু বাস্তবে রোজার মাধ্যমে আমরা কি এসব চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করতে সম হচ্ছি? আমরা কি রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সংযমী ও মিতব্যয়ী হতে পারছি, দরিদ্র অনাহারী মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে পারছি? বর্তমান পরিপ্রেেিত এসব প্রশ্ন আত্মজিজ্ঞাসা হয়ে প্রত্যেক মুমিনের মনে উদয় হওয়াই স্বাভাবিক এবং এগুলোর জবাব খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদেরই। আমাদের রোজার শিাকে গ্রহণ করতে হবে।

অপরাধমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় রমজানের ভূমিকা :

অপরাধমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব গুণ, প্রশিণ ও অনুশীলন করার প্রয়োজন তা হলো ১. তাকওয়া ২. সুশৃঙ্খল প্রবৃত্তি ৩. বিশেষ উদ্দেশ্যে উন্মাদনার নিয়ন্ত্রণ। ৪. ধৈর্যধারণের চর্চা ৫. সত্য বলার প্রবণতা ৬. সারাণ কর্মব্যস্ততা।

তাকওয়া : এই পৃথিবীকে অপরাধমুক্ত করতে হলে তার প্রথম উপাদান হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আরবিতে যাকে বলা হয় তাকওয়া। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বকে অপরাধমুক্ত করতে হলে এই তাকওয়ার কোনো বিকল্প নেই। লোকচুর অন্তরালে, পুলিশি প্রহরা যেখানে নিষ্ক্রিয়, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী যেখানে অপারগ, স্যাটেলাইটের তীè দৃষ্টি যেখানে অসহায়, সেখানেও আল্লাহর ভয় একজন ব্যক্তিকে অপরাধমুক্ত রাখতে পারে। তাকওয়া হচ্ছে- অপরাধমুক্ত সমাজ, পাপমুক্ত লোকালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।

তাকওয়া মূলত নিজের জন্য নিজেই প্রহরী। রাসূল সা: এই তাকওয়ার সমাজ তৈরি করতে পেরেছিলেন বলেই অপরাধপ্রিয় সেই জাহেলি সমাজ শান্তিপ্রিয় সুন্দর সমাজে রূপ নিয়েছিল। প্রহরী, গুপ্তচর, গোয়েন্দা নিয়োগ করে যে সমাজ অপরাধমুক্ত করা একেবারেই অসম্ভব ছিল, শুধু এই তাকওয়ার বীজ বপন করে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অপরাধমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেলেন, অপরাধমুক্ত সমাজ অর্থই হলো তাকওয়ার সমাজ, আর মহান প্রতিপালক এই তাকওয়া অর্জনের জন্যই রোজা ফরজ করেছেন।

সুশৃঙ্খল প্রবৃত্তি : অপরাধ প্রবণতা সংঘটিত করার েেত্র মানুষের কুপ্রবৃত্তির ভূমিকাও কম নয়। অপরাধমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার েেত্র এটি একটি বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করে। যেমন হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন, রাসূল সা:-এর অবর্তমানে এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মুসিবত অবতীর্ণ হয় তা পেটপুরে খাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল। কেননা মানুষের ুধা নিবৃত্ত হলে শরীর সতেজ হয়ে ওঠে। সিয়াম নির্ধারিত সময়ের জন্য এই ুধার অনুশীলন, যা কুপ্রবৃত্তিকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশেষ উদ্দেশ্যে উন্মাদনার নিয়ন্ত্রণ : সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে অবৈধ কামাচারের উন্মাদনার ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। এটি অপরাধ প্রবণতার এক বিষাক্ত জীবাণু বহন করে, সিয়াম সে জন্য মানুষের বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রণে বলিষ্ঠ প্রশিণ দিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত এক শান্তির সমাজে পরিণত করে। সিয়াম এই ুধাকে নিবৃত্ত করে। যেমন রাসূল সা: ইরশাদ করেন- ‘হে যুবকগণ! বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহের সামর্থ্যবানদের বিয়ে করা উচিত, যাদের সামর্থ্য নেই তাদের রোজা রাখা উচিত। কেননা রোজা বিশেষ উদ্দেশ্যের ুধাকে দমন করে। সুতরাং বিশেষ উদ্দেশ্যে উন্মাদনার নিয়ন্ত্রণে সিয়ামের বলিষ্ঠ ভূমিকা সুস্পষ্ট।’

ধৈর্যধারণের চর্চা : অপরাধ সৃষ্টিতে ধৈর্যহীনতার ভূমিকাও কম নয়। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, ঝগড়া-বিবাদ এমনকি হত্যার মতো নিকৃষ্ট অপরাধ সংঘটনের েেত্র ধৈর্যহীনতা যেমন এক জোরালো ভূমিকা পালন করে, ঠিক তেমনি ধৈর্যধারণ বা সবর এসব অপরাধ প্রবণতা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার েেত্র একটি বলিষ্ঠ দায়িত্ব পালন করে। যে সমাজে ধৈর্যধারণের চর্চা যত বেশি, সে সমাজে অপরাধপ্রবণতা তত কম।

রাসূল সা: বলেন, ‘আল্লাহর অনুগ্রহের মধ্যে ধৈর্যধারণের মতা দান সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।’ সিয়াম মূলত এই ধৈর্যধারণ করার এক চূড়ান্ত অনুশীলনের নাম। যেমন রাসূল সা: বলেছেন, ‘সিয়াম অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য ঢালস্বরূপ। সুতরাং যে সিয়াম পালন করবে, সে যেন অশ্লীলতা ও ফিতনা ফাসাদ থেকে বিরত থাকে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় অথবা আহত করে, তাহলে সে শুধু বলবে, আমি সিয়াম পালনকারী, আমি সিয়াম পালনকারী।’

সত্য বলার প্রবণতা : জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মিথ্যা হচ্ছে সব অপরাধের মূল। মিথ্যা বর্জন সব অপরাধকে নির্মূল করতে পারে। সমাজের অসংখ্য অপরাধ প্রবণতার মূল উৎস হচ্ছে এই মিথ্যা চর্চা। তাই রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ পরিত্যাগ করতে পারল না অযথা খাদ্য ও পানীয় পরিহার করে তার কোনো লাভ নেই।’ এই হাদিসের দ্বারা বোঝা যায় সিয়াম পালনকারীর জন্য মিথ্যা বলার সামান্যতম সুযোগও নেই।

সারাণ কর্মব্যস্ততা : কথিত আছে, বেকার মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। বেকার সময় মানুষকে অপরাধ চিন্তা ও অপরাধ সংঘটিত করতে সহায়তা করে। সিয়াম পালনকারীর নিজস্ব কাজ-কর্ম তো আছেই এর পরও ইফতার, মাগরিবের সালাত, তারাবিহ, কিয়ামুল লাইল, সেহরি সম্পাদনের জন্য কর্মতৎপর হওয়া ছাড়া একজন সিয়াম পালনকারীর জন্য গত্যন্তর থাকে না। অপর দিকে রমজান মাসে বেশি বেশি পুণ্য সঞ্চয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে সিয়াম তাকে আরো কর্মচঞ্চল করে তোলে। অপরাধ প্রবণতার সুযোগই তার থাকে না।

লেখক : মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী, মোফাচ্ছিরে কুরআন ও খতিব

Category: রোজা