ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আহলান সাহলান মাহে রমজান

ramadan4আহলান সাহলান মাহে রমজান। আল্লাহর করুণা, বরকত, ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির পয়গাম নিয়ে ১৪৩৪ হিজরি সনের রমজানুল মুবারক আমাদের মধ্যে সমাগত। এটি হলো কল্যাণ লাভের মওসুম, বহু গুণ পুরস্কার লাভের মওসুম, গুনাহ মাফের মওসুম। বিভিন্ন দিবস, ঈদ, পার্বণকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন এবং তারা তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ করার জন্য ব্যবসায়িক মওসুমের অপেক্ষা করতে থাকেন। যখনই তাদের সেই মোক্ষম সময় আসে তখনই তাদের মধ্যে হুলস্থূল লেগে যায়। এ থেকে তাদের বৈষয়িক সম্পত্তি, ঐশ্বর্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে, যারা ঈমানদার, যারা আল্লাহ ও রাসূলপ্রেমিক তারা পার্থিব ধনসম্পদ লাভ করতে পারে না।

কিন্তু মহাকালের জন্য তারা মহাসঞ্চয় করে নেয়। তারা তাদের পারলৌকিক ইজ্জত সম্মানের স্থায়ী ব্যবস্থা করে নেয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিকটতম বান্দাদের আরো নিকটতম করতে এবং তাদের পরকালীন পাথেয় ভারী করতে তাদের ওপর করুণাস্বরূপ এ মাহে রমজানুল মুবারক দান করেছেন, যাতে তারা তাদের ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত গুনাহ এ মাসে মাফ করিয়ে নিতে পারেন। কুরআন তিলাওয়াত, শ্রবণ, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, দান-খয়রাত, রোজাদারদের ইফতার করানো, খাদ্য খাওয়ানো ইত্যাদি নেক আমল, আনুগত্যের মাধ্যমে বহু গুণ সাওয়াব লাভ করে পরকালীন কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারেন। জাহান্নামের লেলিহান শিখা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেন।

রমজান মাসকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সমগ্র মাসের মধ্যে মহিমান্বিত করেছেন। এ মাসেই তিনি কুরআন নাজিল করেছেন। এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। আর রাসূল সা: এ মাসে তারাবিহ ও তাহাজ্জুদকে সুন্নত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এ মাস সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী রূপে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাই তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে এবং কেউ পীড়িত থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান আর যা তোমাদের জন্য কেশকর তা চান না এ জন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে এবং তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করবে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)

আল্লাহ তায়ালা সব মাসের মধ্যে এ মাসের প্রশংসা করেছেন, কারণ তিনি এ মাসকেই কুরআন নাজিলের জন্য নির্বাচন করেছেন। অন্যান্য আসমানি কিতাব নাজিলের জন্যও তিনি এ মাসকে বাছাই করেছেন। হাদিসে এসেছে, এটি এমন একটি মাস যে মাসে পূর্ববর্র্তী নবীদের ওপর আসমানি কিতাব নাজিল হয়েছিল। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল ওয়াসেলা ইবন আসকা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা: বলেছেন ‘হজরত ইব্রাহিম আ:-এর ওপর সহিফা রমজানের প্রথম রজনীতে নাজিল হয়েছিল, রমজানের ছয় তারিখ তাওরাত নাজিল হয়েছে, রমজানের তেরো তারিখ ইঞ্জিল নাজিল হয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালা রমজানের চব্বিশ তারিখ কুরআন নাজিল করেছেন।’ (ফতহুর রব্বানি, ১৮খ., পৃ.৪৬)

সহিফা ও তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল নির্দিষ্ট নবীর কাছে একত্রে নাজিল হয়েছে। কুরআনুল করিম প্রথম আকাশের বায়তুল ইজজাতে একত্রে নাজিল হয়েছে। আর তা ছিল রমজান মাসের লায়লাতুল কদর। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ ‘নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে।’ (সূরা কদর : ০১) তিনি আরো বলেছেনÑ ‘আমি তো এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে। ‘(সূরা দুখান : ০৩) অতঃপর তা বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সা:-এর ওপর খণ্ড খণ্ড আকারে নাজিল হয়েছে। হজরত ইবন আব্বাস রা: থেকে একাধিক সূত্রে এরূপই বর্ণিত হয়েছে। (তাফসিরে ইবন কাসির, ১খ., পৃ. ২১৫)

রমজানের ফজিলতের ব্যাপারে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা: বলেছেন: ‘যখন রমজান মাস আগমন করে তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে বন্দী করা হয়।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘শয়তানকে শেকল পরানো হয়’। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল সা: বলেছেন ‘রমজান মাসের প্রথম রাতে অবাধ্য জিন শয়তানদের শেকল পরানো হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, এর একটি দরজাও খোলা হয় না। জান্নাতের দ্বার খুলে দেয়া হয় তার একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলেন, হে কল্যাণের প্রত্যাশী, এগিয়ে আস। হে অনিষ্টের প্রত্যাশী থেমে যাও। আর এ মাসের প্রতিটি রাতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেন।’ (্ইবন হাব্বান)

হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে একনিষ্ঠ সওয়াব লাভের আশায় রমজানের রোজা রাখবে তার পেছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি) আবু হুরায়রা রা: থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা: বলেছেন: ‘দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা, এক রমজান থেকে আরেক রমজান এদের মধ্যকার সব গুনাহ মুছে ফেলে যদি কোনো ব্যক্তি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম)

হজরত সালমান ফারসি রা: থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সা: শাবান মাসের শেষ দিন আমাদের সামনে এক ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদেরকে ছায়াদান করতে যাচ্ছে একটি মহান মাস, একটি মুবারক মাস। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তায়ালা এ মাসের সিয়ামকে ফরজ এবং কিয়ামকে নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল কাজ করবে সে অন্য মাসে একটি ফরজ কাজ করার সওয়াব পাবে আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ আদায় করবে সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায়ের সাওয়াব পাবে। মাসটি হলো ধৈর্যের মাস, যার পরিণতি হলো জান্নাত। এ মাস হলো সহমর্মিতার। এ মাস এমন মাস যাতে মুমিনের রিজক বৃদ্ধি করা হয়।’ এ হাদিসের শেষের দিকে রাসূল সা: বলেছেন, ‘এটা এমন মাস যার প্রথমাংশ হলো রহমত, মাঝের অংশ হলো মাগফিরাত আর শেষের অংশ হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির। যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনদের বোঝা হালকা করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেবেন।’ (মিশকাত, পৃ. ১৭৩-১৭৪)

এ মাসের বিশেষ ফজিলত যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মাদিকে বিশেষায়িত করেছেন তা হলো হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন, ‘আমার উম্মতকে রমজান মাসে পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, যা তাদের আগে কাউকে দেয়া হয়নি। প্রথমত, তাদের মধ্যে রোজাদারদের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের চেয়ে অধিক সুগন্ধময়; দ্বিতীয়ত, ইফতার না করা পর্যন্ত ফিরিশতারা তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে; তৃতীয়ত, তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন জান্নাতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন এবং বলেন, আমার নেক বান্দাহগণ দুঃখকষ্ট সহ্য করে অচিরেই এখানে পৌঁছবে; চতুর্থত, অবাধ্য শয়তানদের এ মাসে বন্দী করে রাখা হয় বলে অন্যান্য মাসের মতো এ মাসে তারা পাপকার্য সংঘটিত করতে পারে না; পঞ্চমত, রমজান মাসের শেষ রজনীতে তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়। রাসূল সা:-কে বলা হয় তা কি লায়লাতুল কদর? জবাবে তিনি বললেন : না, বরং শ্রমিক তার কাজ পূর্ণ করলেই তাকে পারিশ্রমিক দেয়া হয়।’ (ইমাম আহমাদ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন)

তাই আমাদের উচিত নেক আমালের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করা এবং পার্থিব কাজকর্মের চেয়ে অন্তত এ মাসে অপার্থিব আমলের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা। আমাদের জীবন ও সময়কে গণিমত মনে করে এর সর্বোত্তম ব্যবহার করা। আগের কৃত পাপের জন্য খাঁটি তওবা করে, সৎকর্ম, দান-খয়রাত, তিলাওয়াত, তারাবিহ, তাহাজ্জদ ইত্যাদির মাধ্যমে সফলকাম হওয়া। সেসব মহান বান্দা আল্লাহর রহমত ও বরকত দিয়ে সিক্ত হবেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

Category: রোজা