ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইতিকাফ কাক্সিক্ষত ইবাদত

যদিও ইতিকাফ কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত নয়। মহল্লার পক্ষ থেকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ইতিকাফ করলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। সারা জীবন কর্মব্যস্ততার মধ্যে প্রাত্যহিক নির্ধারিত ইবাদতের বাইরে বিশেষ কোনো এবাদতের সুযোগ বান্দার খুব কমই হয়ে থাকে।

পোক্ত ঈমানদার ছাড়া তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে মহান আল্লাহর কাছে ধরনা দেয়ার সুযোগ বেশির ভাগ মুমিনের জীবনে হয় না। একজন মুমিন ইতিকাফের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে একান্তভাবে সঁপে দেয়ার সব রকমের সুযোগ পেয়ে থাকে। কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ তাহলীল, নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ নামাজ, তারাবিহর নামাজ, মহান রবের কাছে রাতের গভীরে নীরবে নিভৃতে চোখের জল ফেলে গুনাহ মাফ চাওয়াসহ সব রকমের ইবাদত করার সময় সুযোগ একমাত্র ইতিকাফের মাধ্যমেই বেশি পাওয়া যায়।

বিশেষ করে লাইলাতুল কদর ইতিকাফের মাধ্যমে হাসিল করা খুবই সহজ। রাসূল সা: ইতিকাফের মাধ্যমেই লাইলাতুল কদর তালাশ করেছেন। তিনি প্রতি রমজানেই শেষের ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। আবু সালামা আবদুর রহমান রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি সাঈদ খুদরি রা:-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসূল সা:-কে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে উল্লেখ করতে বলেছেন? তিনি বলেন হ্যাঁ। আমরা রমজানের মধ্যম দশকে ইতিকাফ করছিলাম। ২০ তারিখ সকালে বের হতে চাইলাম। কিন্তু ২০ তারিখ সকালে রাসূল সা: আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, আমাদের লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, কিন্তু তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিতে তা তালাশ করো। আমি দেখেছি, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। অতএব, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথে ইতিকাফ করেছে, সে যেন ফিরে আসে। লোকেরা মসজিদে ফিরে এলো। তখন আমরা আকাশে কোনো মেঘের রঙ দেখতে পাইনি।

একটু পরে আকাশে একখ মেঘ দেখা দিলো, বর্ষণ হলো এবং সালাত শুরু হলো। রাসূল সা: কাদা-পানির মধ্যেই সিজদা করলেন। এমনকি আমি তাঁর কপালে ও নাকে কাদার চিহ্ন দেখতে পেলাম (বুখারি)। এ হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: সাহাবিদের নিয়ে ইতিকাফের মাধ্যমে যে লাইলাতুল কদর তালাশ করেছেন তা স্পষ্টই বোঝা যায়।

হাদিসের বর্ণনা মতে, শুধু একবার রমজানে ইতিকাফ করতে পারেননি। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: এক রমজানে ইতিকাফ করার ইচ্ছা করলেন। এরপর যে স্থানে ইতিকাফ করার ইচ্ছা করেছিলেন সেখানে এসে কয়েকটি তাঁবু দেখতে পেলেন (তাঁবুগুলো হলো নবীসহধর্মিণী) হজরত আয়েশা, জয়নব, হাফসা’র তাঁবু। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি এটা দ্বারা নেকি হাসিলের ধারণা করো? এরপর তিনি চলে গেলেন আর ইতিকাফ করলেন না। পরে শাওয়াল মাসে ১০ দিন ইতিকাফ করলেন। বুখারি।

মূলত ইতিকাফ হলো একটি সিঁড়ি, যে সিঁড়ির মাধ্যমে মহান আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল করা যায়। প্রতিদিন মানুষ বিভিন্ন রকমের ভুলভ্রান্তি করে থাকে। বিভিন্ন পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। পবিত্র মাহে রমজানে শয়তান শৃঙ্খলিত থাকলেও মনুষ্য শয়তান শৃঙ্খলিত হয় না। কর্মব্যস্ততার মধ্যে ইবাদতের সুযোগ খুব কমই হয়, অন্য দিকে অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইতিকাফের মাধ্যমে বছরের এই ১০ দিন সব রকমের পাপকাজ থেকে মুক্ত হয়ে একটি পবিত্র জীবনযাপন সম্ভব হয়। রমজান, বিশেষ করে ইতিকাফ পরবর্তী সময়ে বিরাট প্রভাব ফেলে। ইতিকাফ একজন মানুষের জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ইতিকাফ একজন মানুষের জান্নাত প্রাপ্তির দিকে একধাপ এগিয়ে দিতে পারে।

ইতিকাফ মহান আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তা ছাড়া কুরআন-হাদিস নিবিড়ভাবে অধ্যয়নের এক বিরাট সুযোগ এনে দেয় ইতিকাফ। ইতিকাফে অলস সময় কাটানো উচিত নয়। পরিকল্পিতভাবে সময়কে কাজে লাগানো উচিত। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা না বলা উচিত। খোশগল্প থেকে বিরত থেকে সব সময় ইবাদতের মধ্যে কাটানো উচিত। সর্বোপরি ‘ইতকুম মিনান নার’ বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ইতিকাফকে কাজে লাগানো উচিত।

ইতিকাফে চুপ করে বসে থাকা ঠিক নয়। সব সময় কোনো না কোনো ইবাদতের মধ্যে কাটানো উচিত। একই রকম ইবাদত করলে একঘেয়েমি আসতে পারে। তাই বৈচিত্র্য থাকলে ইবাদতের প্রতি অভক্তি আসবে না। জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তারাবিহ ও তাহাজ্জুদের পাশাপাশি কিছু সময় কুরআন তেলাওয়াত করা, কিছু সময় তাফসিরসহ অধ্যয়ন করা, কিছু সময় হাদিস পড়া, কিছু সময় ইসলামী সাহিত্য পড়া, কিছু সময় নফল নামাজ পড়া, কিছু সময় তাসবিহ তাহলিল পড়া যেতে পারে। ইতিকাফকারীকে মনে রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই অহেতুক কথা বলা যাবে না। সর্বদা অজু অবস্থায় থাকা উচিত।

Category: রোজা