ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

এতেকাফ : আল্লাহর নৈকট্য লাভের সোপান

মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি, মানসিক উৎকর্ষ সাধন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। এ মাসেই মুমিন ব্যক্তি আধ্যাত্মিক সাধনায় চরম উৎকর্ষ লাভ করেন। এ মাসেই রয়েছে এমন একটি রাত, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। সেই রাতের পূর্ণ সওয়াব অর্জন করার জন্য এতেকাফের গুরুত্ব ও উপকারিতা অপরিসীম। এতেকাফ আরবি শব্দ। এর অর্থ অবস্থান করা, বসা, ইবাদত করা প্রভৃতি। ইবাদতের নিয়তে মসজিদ বা নির্জন স্থানে বসা বা অবস্থান করাকে এতেকাফ বলে।

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের ল্েয, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য মাহে রমজানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (২০ রমজান সূর্যাস্তের আগেই এতেকাফ শুরু করতে হবে এবং শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার পর এতেকাফ শেষ করবে) পুরুষেরা মসজিদে, মহিলারা নিজ গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থান করাকে এতেকাফ বলে। যিনি এতেকাফ করেন তাকে মু’তাকিফ বলে।

এতেকাফের উদ্দেশ্য : দুনিয়ার সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আত্মশুদ্ধি, নামাজ, তারাবি, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া-দরূদের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের ল্েয আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করার জন্য সুসম্পর্ক স্থাপন করা, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা, আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হওয়া, আল্লাহ কেন্দ্রিক ব্যতিব্যস্ততা, অন্তর সংশোধন, ঈমানি দৃঢ়তা অর্জন। পাশবিক প্রবণতা ও অহেতুক কাজ থেকে দূরে থাকা, মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা, দুনিয়া ত্যাগ ও বিলাসিতা থেকে দূরে থাকা। লাইলাতুল কদরের পূর্ণ ফজিলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে মূলত মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ করা হয়। এ উদ্দেশ্য সাধনের ল্েয রাসূল সা: মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ করেছেন। লাইলাতুল কদর কোন রাতে, তা নির্দিষ্ট নয়। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতেই হতে পারে। এতেকাফকারীরা ইবাদতে বিশেষ মনোযোগী হন। ফলে এতেকাফকারী তার পূর্ণ ফজিলত পেয়ে যাবেন।

এতেকাফের ফজিলত : এতেকাফের ফজিলতসংক্রান্ত অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: আমৃত্যু রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করেছেন। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ এতেকাফ করেছেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

হজরত আনাছ রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: প্রতি রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ করতেন। এক বছর কোনো বিশেষ কারণে এতেকাফ করতে পারেননি তাই পরের বছরে শেষ ও মধ্যবর্তী দশকসহ মোট ২০ দিন এতেকাফ আদায় করে নিয়েছেন। (তিরমিজি)

হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, যখন রমজানের শেষ ১০ রাত আসত, তখন নবী করিম সা: কোমরে কাপড় বেঁধে নামতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি)

এতেকাফের শর্তাবলি : এতেকাফের নিয়ত করতে হবে। কেননা মসজিদে অবস্থান হয়তো বা এতেকাফের নিয়তে হবে, অথবা অন্য কোনো নিয়তে। আর এ দুইয়ের মাঝে পার্থক্য করার জন্য নিয়তের প্রয়োজন। রাসূল সা: বলেছেন, এতেকাফ মসজিদে হতে হবে। এ ব্যাপারে সব আলেম একমত। তবে জামে মসজিদ হলে উত্তম।

মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধান : মু’তাকিফ যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয়, তাহলে তার এতেকাফ ভেঙে যাবে। আর যদি প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য বের হয়, তাহলে ভাঙবে না। বাহক না থাকায় এতেকাফকারীকে যদি পানাহারের প্রয়োজনে বাইরে যেতে হয় অথবা মসজিদে খাবার গ্রহণ করতে লজ্জাবোধ হয়, তবে এরূপ প্রয়োজনেও বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে। যে মসজিদে এতেকাফ বসেছে, সেখানে জুমার নামাজের ব্যবস্থা না থাকলে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া ওয়াজিব। কোনো নেকির কাজ করার জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। যেমন রোগী দেখতে যাওয়া, জানাজায় উপস্থিত হওয়া প্রভৃতি।

এতেকাফকারীর জন্য যা কিছু বিধিবদ্ধ : ইবাদত, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির-আজকার প্রভৃতি। এতেকাফকারী তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাথে নেবেন, যাতে নিজের কাজে তাকে বারবার বাইরে যেতে না হয়। যেমন এলার্ম ঘড়ি, বালিশ, চাদর, কম্বল, তেল, সাবান, লোশন, মিসওয়াক, ওষুধপত্র, ১০ দিন ব্যবহারের কাপড়-চোপড়, পড়াশোনার জন্য কুরআনের অর্থসহ তাফসির, অন্যান্য ইসলামি বইপত্র।

এতেকাফকারী যা থেকে বিরত থাকবেন : ওজরছাড়া এতেকাফকারী এমন কোনো কাজ করবে না, যা এতেকাফের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। যথা বেশি কথা বলা, বেশি মেলামেশা করা, অধিক ঘুমানো, ইবাদতের সময়কে কাজে না লাগানো, টেলিফোনে গল্পগুজব করা, বিনা কারণে ইন্টারনেট ব্রাউজ করা, চ্যাটিং করা, মসজিদে অবস্থানরত অন্যদের সাথে হাসিঠাট্টা করা, ঝগড়া করা, অন্যের পরনিন্দা করা প্রভৃতি।

উপসংহার : এতেকাফ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ফজিলতময় ইবাদত, যার মাধ্যমে আল্লাহ সাথে বান্দার গভীর সুসম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। যার ফলে সারা বিশ্বের সহ ওলামায়ে মুমিনগণ কেরাম মাহে রমজানের শেষ দশককে নিজের জন্য ঠিকানা বা স্থান নির্ধারণ করে নেন, আল্লাহর পবিত্র ঘর মসজিদকে। তারা দুনিয়ার সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর ধ্যানে গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন।

লেখক : হাফেজ মাওলানা রিদওয়ানুল কাদির উখিয়াভী – প্রবন্ধকার

Category: রোজা