ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

প্রকৃত মানুষ গঠনে রমজান

বরকতময় ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত রমজান এমন একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ব্যাপক ও বিস্তৃত এবং তাত্পর্য অতি গভীর। ‘রমজ’ মূল শব্দ থেকে রমজানের উত্পত্তি হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ দহন করে পরিশুদ্ধ করা। রমজান মাস মানুষের কালিমা, কলুষতা, অপরাধ ও পাপাচার জ্বালিয়ে দিয়ে এবং দহন করে তাকে পূত ও পবিত্র করে তোলে।

এতে অনুধাবন করা যায়, এই মাসটি মানুষকে সব ধরনের আবিলতা থেকে মুক্ত করে প্রকৃত মানুষ হতে সহায়তা করে এবং তাকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা নামবাচ্যে অভিহিত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। রমজান কেন মহিমান্বিত ও তাত্পর্যবাহী তার সূত্র অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের বিষয়ের কিছু গভীরে যেতে হবে। আল-কোরআন ও আল-হাদিসের সংশ্লিষ্ট আয়াত এবং বাণী বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, প্রধান তিনটি বিষয়ের জন্য রমজান মাস বছরের অন্যান্য মাস থেকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও তাত্পর্যপূর্ণ।

প্রথমত এই রমজান মাসে আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, দ্বিতীয়ত, এই মাসে লায়লাতুল কদর বা মহিমান্বিত রাত নিহিত রয়েছে এবং তৃতীয়ত, সিয়ামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এই মাসে ফরজ করা হয়েছে। এই তিনটি বিষয় পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এবং সেগুলোর তাত্পর্য ও বৈশিষ্ট্য আল্লাহর সৃষ্টির উদ্দেশ্যের দিকনির্দেশক। প্রথম বিষয়টি সম্পর্কে আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে ‘এই সেই রমজান মাস যে মাসে আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, আর এই কোরআন হলো মানবগোষ্ঠীর পথনির্দেশক এবং হেদায়েত ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যকারী (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৮৫)’।

বিশ্বসৃষ্টির পর থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শয়তানের কুহক থেকে রক্ষা করতে ও হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূলকে কিতাব দিয়ে পাঠিয়েছেন মানব জাতির কাছে। আল্লাহর হেদায়াত পরিক্রমার এই ধারাবাহিকতায় শেষ ও শ্রেষ্ঠ রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে এই রমজান মাসে। আল-কোরআনের অন্য একটি আয়াতে আরো স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এটি কদরের রাতে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু কোরআন একদিনে মহানবী (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়নি, বরং তার তেইশ বছর নবুয়তী জীবনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকল্পে ও ঘটনার প্রেক্ষিতে আল-কোরআনের অবতীর্ণ হওয়া চলমান ছিল এবং এই দীর্ঘ সময়ক্রমে তা সম্পন্ন হয়েছিল। তাহলে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়ে থাকে যে, রমজান মাসের লায়লাতুল কদরে (মহিমান্বিত রাতে) আল-কোরআন সম্পূর্ণটাই লাওহে মাহফুজ বা সংরক্ষিত কাষ্ঠফলক থেকে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং সে স্থান থেকে প্রয়োজন অনুসারে আল্লাহর নির্দেশে হজরত জিব্রাইল (আ.) মহানবী (সা.)-এর কাছে ওহি নিতে আসতেন তেইশ বছর ধরে। আর এই ওহির সমষ্টি হলো আল-কোরআন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেমন স্থান কালের ঊর্ধ্বে সমগ্র বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর জন্য প্রেরিত রাসূল, তেমনি আল-কোরআন মানব জাতির জন্য হেদায়াত গ্রন্থ। পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত মানুষের যা প্রয়োজন তার সবকিছুর সন্ধান আল-কোরআনে আছে। এটি সব জ্ঞানের আকর এবং বিশ্বমানবতার মুক্তির ঐশী দলিল। তাই বিনা দ্বিধায় বলা যায় যে, আল-কোরআনের অবতীর্ণ হওয়া রমজান মাসকে মহিমান্বিত করে তুলেছে।

দ্বিতীয় বিষয় লায়লাতুল কদর। এই রমজান মাসে লায়লাতুল কদর বা মহিমান্বিত রাতের অনুসন্ধান করার কথা বলা হয়েছে। এই পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী ও পরীক্ষার স্থান। এই পার্থিব জীবনে যেভাবে কাজ করবে সেভাবে পরকালীন জীবনে তার ফল ভোগ করবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হবে এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে। এই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আল্লাহ মানুষ ও জিনকে কেবল তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মহানবী (সা.)-এর উম্মতের আয়ুষ্কাল পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের তুলনায় অনেক কম। তাহলে কীভাবে এই স্বল্পমেয়াদি জীবনে মহানবী (সা.)-এর উম্মত অধিক পুণ্য সঞ্চয় করে পূর্ববর্তী উম্মতের সমপর্যায়ে আনতে পারবে।

আল্লাহ তার ব্যবস্থা করেছেন রমজান মাসে সেই মহিমান্বিত রাত নিহিত রেখে। এই রাতটি হাজার মাসের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। বছরের গণনায় এই রাত ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের চেয়ে বেশি মর্যাদা সম্পন্ন। তাহলে কোনো ব্যক্তি যদি ন্যূনতম একটি থেকে দশটি রাত পেয়ে যায় তাহলে পূর্ববর্তী অধিক বয়সপ্রাপ্ত ব্যক্তির ইবাদতের সমপর্যায়ে ওঠা কঠিন হবে না। মহানবী (সা.) রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এই কদরের রাত তালাশ করতে বলেছেন। তবে রমজান মাসের ২৬ দিবাগত রাতে কদর হওয়ার বেশি সম্ভাবনার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন আলেমরা। এই কদরের রাতে মহানবী (সা.)-এর উম্মতের সওয়াব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে যাত্রা যুক্ত হয়েছে তা পূর্ববর্তী কোনো উম্মতের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রমজান মাস বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

তৃতীয় বিষয় সিয়াম প্রসঙ্গ। সিয়াম বা রোজার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এই রমজান মাসে ফরজ করা হয়েছে। আল- কোরআনে ইরশাদ হয়েছে যে, ‘যখন রমজান মাস এসে যায় তখন সে মাসে সিয়াম পালন কর (আল-কোরআন ২:১৮৫)।’ পার্থিব জীবনের লোভ-লালসা, ভোগলিপ্সা, হিংসা-বিদ্বেষ প্রভৃতি থেকে মানুষকে বিরত রাখতে পারে ‘তাকওয়া’। আর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কথায় ও কাজে তাকে জবাবদিহিতার প্রশ্ন স্মরণ করিয়ে দিয়ে পরিশীলিত করে তোলে। ‘তাকওয়া’ অর্জন করতে পারলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সহজ হয়ে যায় এবং আল্লাহ তার পার্থিব ও পরকালীন জীবনের সব দায়িত্ব নিজের জিম্মায় নিয়ে নেন। আর সিয়ামের মূল লক্ষ্য হলো ‘তাকওয়া’ অর্জন।

এ সম্পর্কে আল্লাহ কোরআন মজিদে ইরশাদ করেছেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার ( আল-কোরআন, ২:১৮৩)।’ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করে চলার অপর নাম হলো ‘তাকওয়া’। এভাবে জীবন পরিচালিত করতে পারলে শয়তানের সর্বপ্রকার কুমন্ত্রণা ও প্রলোভন থেকে একজন ব্যক্তি নিজেকে নিরাপদে রাখতে পারে। একমাস রমজানের সিয়াম পালন একজন মুমিন ব্যক্তিকে ‘তাকওয়া’ অর্জনে শক্তি যোগায় যদি সে নিষ্ঠার সঙ্গে তা আদায় করে থাকে। উপর্যুক্ত তিনটি বিষয়ের জন্য রমজান মাস বছরের অন্য মাসের চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমান্বিত।

Category: রোজা