ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মর্যাদা ও কল্যাণের আধার তাকওয়া

বর্ষ পরিক্রমার চাকায় ভর করে সিয়াম সাধনার মাস রমজান আমাদের জন্য আবারও নিয়ে এলো আল্লাহর অবারিত রহমত, বরকত ও মাগফিরাত। আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও আত্মগঠনের এক বিশেষ প্রশিক্ষণ এ রমজান। এ মাসে সব কল্যাণ ও মর্যাদা যে জিনিসটির সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে সেটি অর্জনের মাস। আর সে জিনিসটিই হলো তাকওয়া। তাকওয়া এমন একটি গুণের নাম যার মধ্যে মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের সব মর্যাদা নিহিত। তাকওয়াহীন ব্যক্তি সে যেই হোন না কেন, তাকে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি বলা যাবে না।

পৃথিবীর মানুষগুলো বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মর্যাদার যে বৃত্ত গড়ে তুলেছে, তাকওয়ার কাছে তা মূল্যহীন। যদিও এগুলো আল্লাহরই সৃষ্টি। তথাপি এগুলো কোনো মর্যাদার মানদণ্ড বা কোনো মাপকাঠি নয়, বরং এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন যাতে মানুষ পরস্পরকে চিনতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে (মোত্তাকি)। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব কিছু জানেন ও খবর রাখেন’ (আল হুজরাত-১৩)।

পৃথিবীর অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ন্যায় মুসলমানরাও যেদিন থেকে তাকওয়াকে বাদ দিয়ে অন্যান্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের মর্যাদা দিতে শুরু করেছে, সেদিন থেকে তাদের কপালও পুড়তে শুরু করেছে।
মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ হলো তাকওয়া। জন্মগতভাবে সব মানুষ সমান। কেননা, তাদের মূল উত্স এক।

একমাত্র পুরুষ এবং একমাত্র নারী থেকে গোটা জাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। তাদের সবার সৃষ্টিকর্তা এক. তাদের সৃষ্টির উপাদান ও নিয়ম-পদ্ধতি এক এবং তাদের সবার বংশধারা একই পিতামাতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং মানুষ যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন সেটি দেখার বিষয় নয়। বরং যে মূল জিনিসের ভিত্তিতে একজন অপরজনের ওপর মর্যাদা লাভ করতে পারে তা হচ্ছে এই যে, সে অন্য সবার তুলনায় অধিক আল্লাহ ভীরু, মন্দ ও অকল্যাণ থেকে দূরে অবস্থানকারী এবং নেকি ও পবিত্রতার পথ অনুগমনকারী।

রাসুল সা. মক্কা বিজয়ের সময় কাবার তাওয়াফের পর বক্তৃতা করেছিলেন তাতে তিনি বলেন : ‘সব প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তোমাদের থেকে জাহিলিয়াতের দোষ-ত্রুটি ও অহংকার দূর করে দিয়েছেন। হে লোকেরা! সব মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত। এক. নেক্কার ও পরহেজগার— যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদার অধিকারী। দুই. পাপী ও দুরাচার যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট। অন্যথায় সব মানুষই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির সৃষ্টি’ (তিরমিজি)। অন্য এক হাদিসে উল্লেখ আছে : ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ-কর্ম দেখেন’ (মুসলিম, ইবনে মাজাহ)।

ইসলাম সাম্য-সংহতির অনুপম শিক্ষা শুধু ব্যক্তি চরিত্রে নয়, বরং মানুষের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় জীবনসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বাস্তবায়ন করেছে। আজ থেকে চৌদ্দশ’ বছর আগে রাসূল সা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনা নামক ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করুন। রাসুল সা. এমন এক সমাজ কায়েম করেছিলেন, যেখানে বর্ণ, বংশ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সে সমাজ ব্যবস্থায় হজরত বেলাল রা. এবং হজরত ওমর রা. এর মধ্যে যেমন কোনো পার্থক্য ছিল না, তেমনি আলী রা. ও আনাস-জায়েদ ইবনে সাবেত রা. মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। থাকলেও সেটি তাকওয়ার ভিত্তিতেই নিরূপণ হতো।

একবার হজরত ওমর রা. বেলালকে রা. ধমক দিয়ে কথা বললে রাসুল সা. অসন্তুষ্ট হন এবং বললেন, ওমর হে! তোমার কি এখনও বংশীয় গৌরব রয়েছে? ওমর রা. লজ্জিত হলেন এবং মাটিতে শুয়ে বেলাল পায়ে আঘাত না করা পর্যন্ত তিনি উঠবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করলেন। শেষ পর্যন্ত বেলালকে রা. তা করতে হলো। এভাবে তিনি নিজের সব আভিজাত্যের অহংবোধকে ধ্বংস করেন। মানবিক সাম্য ও ঐক্য সে সমাজকে এমনই ফুলে-ফলে সুশোভিত করেছিল, যা পৃথিবীর আর কোন ধর্ম বা ব্যবস্থায় পরিলক্ষিত হয় না।