ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মাহে রমজানে আমাদের দায়িত্ব

ramadan-graphicমাহে রমজান এক অনন্য ইবাদতের মাস। এ মাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা। মাসের প্রতিটি দিন উপোস করে, সংযমের সাথে কাটানো। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেহরি ও ইফতার-রোজার সূচনা ও শেষের খাবার। আছে তারাবিহ। ফরজ নামাজ ও জরুরি অন্যান্য আমলের পাশাপাশি নফল ইবাদত, তিলাওয়াত ও দান-খায়রাতের সম্পর্কও এ মাসের সাথে জড়িয়ে আছে। এ জন্য দ্বীনী প্রয়োজন ও নিয়মসহ স্বভাবজাত ও বাস্তব নানা কারণে এ মাসটিতে মুসলমানদের জীবনে কিছু ব্যতিক্রমী রুটিন, প্রস্তুতি, উপল ও প্রবণতা ফুটে ওঠে। এর প্রভাব মুসলিম প্রধান এ দেশটিতে অমুসলিমদেরও স্পর্শ করে যায়।

এ জন্য রমজানের রোজা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত আমল হওয়া সত্ত্বেও এ উপলে পারস্পরিক নির্ভরতা, সহযোগিতা ও একের প্রতি অন্যের বিবেচনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে চলে আসে। এ বিষয়গুলো আসে বিভিন্ন দিক থেকে। মনোযোগ, বিবেচনা ও সচেতনতা না দিলে এতে বিভিন্ন ধরনের বিপত্তি ও সঙ্কটের সৃষ্টি হতে পারে ও হয়ে থাকে। মাহে রমজানের প্রাসঙ্গিক ও জরুরি এ বিষয়গুলোর প্রতি তাই সচেতন হওয়া আমাদের প্রত্যেকের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমেই মুসলিম রোজাদার পরিবারগুলোর ঘরণী বা নারী সদস্যদের কথা। রমজানে ঘরের প্রয়োজনীয় সম্মিলিত আয়োজনগুলোতে তারাই সবচেয়ে বেশি শ্রম ও সময় দিয়ে পাশাপাশি ইফতার, সেহরি, রাতের খাবারের প্রস্তুতিসহ পরিবারের রোজাদার সদস্যদের নানা চাহিদা মেটানোর পেছনে অকাতরে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। আবার তারা রোজাও রাখেন।

ফরজ, ওয়াজিব, নফল ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার আবশ্যকতা ও আগ্রহ তাদের মধ্যেও থাকে। রোজাজনিত অবসাদ ও কান্তিও তারা বোধ করেন। কিন্তু পরিবারের পুরুষেরা অনেক সময়ই পরিবারের নারীদের সামর্থ ও সীমাবদ্ধতার এ দিকের প্রতি চোখ রাখেন না। এ জন্য এ বিষয়টির প্রতি পূর্ণ সতর্কতা ও সর্বোচ্চ বিবেচনা বজায় রাখা রোজাদার পরিবারের পুরুষদের দায়িত্ব। এ েেত্র কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিলে সমস্যার মাত্রা কমে যাবে বলে আশা করা যেতে পারে।

রমজানের শরয়ি প্রয়োজন ছাড়া নফল-মুস্তাহাব পর্যায়ের সেবার জন্য নারীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে না দেয়া।

রমজানে রোজা রাখা তো প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর ফরজ। আর রোজার অনিবার্য অনুষঙ্গ হচ্ছে, শারীরিক অবসাদ ও কান্তিবোধ। এ জন্য রমজান মাসে গৃহকর্মীদের প্রতি বিশেষভাবে সদয় ও ছাড়ের দৃষ্টি থাকা উচিত পরিবারের কর্তা-কর্ত্রীদের। পরিবারের সামর্থ ও সুবিধাভেদে গৃহকর্মীদের থাকতে পারে নানা পর্যায়। কাজের সহযোগী মহিলা, নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক এবং এ রকম আরো অনেকেই। কোনো কোনো পরিবারে গৃহকর্মী মাত্র একজন থাকতে পারেন, কোথাও হয়তো দিনের খণ্ড সময়ের জন্য একজন। তারা যদি রোজাদার হন তা হলে তাদের প্রতি গৃহের অভিভাবকদের কিছু দায়িত্ব চলে আসে। সেটি হচ্ছে কাজকর্মে তাদের সহযোগিতা করা।

অর্থাৎ যে কাজটি সে একা করত, সেটিতে নিজেও হাত লাগানো যায়। এ ছাড়া রোজা অবস্থায় নির্ধারিত দায়িত্ব থেকে তার সেবা কিছু কম গ্রহণ করেও এটা করা যায়। অর্থাৎ অন্যান্য সময়ের হিসাব ধরে রমজানে তাকে সবটুকু কাজ করতে বাধ্য না করা রমজানে তার সেবার বিনিময়ে অন্যান্য মাসের তুলনায় পারিশ্রমিকও কিছু বাড়িয়ে দেয়া যায়। গৃহকর্মীও আল্লাহর বান্দা, তাকদির ও তাকসিমে রিজিকের কুদরতি সিদ্ধান্তে সে এখন আমার অধীনস্থ’-এ অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রেখে রমজানে তার প্রতি যতটুকু সদয় হওয়া যায়, ততই কল্যাণ।

রমজানুল মুবারক ও রোজার প্রতি সদয় ও সদাচারী হওয়ার সওয়াব হাসিলের সৌভাগ্য এভাবে হাসিল হতে পারে। একইভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রমজানে রোজাদার কর্মচারীদের ওপর কাজের চাপ কমানোর ব্যবস্থা করা যায়। একজন সুস্থ-সবল ও প্রাণচঞ্চল কর্মীর কাছে যতটুকু সময়ে যতটুকু কাজ নেয়া হয়ে থাকে, রমজানে রোজাদারের জন্য সে েেত্র রোজাজনিত কান্তিবোধের প্রতি কিছুটা হলেও সদয় হওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হবে।

মানবিক ও ভ্রাতৃত্বমূলক আচরণ হিসেবেও সেটি গণ্য হবে। এটি অন্যভাবেও করা যায়। কাজের সময়-পরিমাণটাই কমিয়ে দিয়ে তাতে পূর্ণ উদ্যমে কাজ করানোর ব্যবস্থা করা যায়। এতে রোজাদারের প্রতি সদয় আচরণের সুফল ও বরকত প্রতিষ্ঠানটি অন্যভাবে লাভ করতে পারবে বলেই আশা করা যায়।

আমাদের সমাজে অনেক সময় হজ-কোরবানীর অর্থ-অপচয় নিয়ে সচেতনতার প্রসঙ্গ উঠিয়ে একশ্রেণীর মানুষ কেবল ধর্মীয় বিষয়গুলো টেনে আনেন। হজ-কোরবানীর অর্থ-খরচ নিয়ে লম্বা কথা বলেন। অফিস চলাকালে নামাজের বিরতি কিংবা রমজানে রোজাজনিত কান্তিÍর কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার গল্প ফাঁদেন। এটি মূলত ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরে থাকার একটি স্বাভাবিক অথচ অবান্তর প্রবণতা। কারণ এ সমাজে নেতিবাচক কাজেও গুনাহর খাতে দৈনিক কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়। সেটা তারা ভুলে যান।

ফাঁকিবাজি, ইউনিয়নবাজি, অপরাজনীতি ইত্যাদি নেতিবাচক কারণে অফিস-আদালত, কলকারখানায় প্রতিদিন কোটি কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সে দিকে তাদের চোখ যায় না। তাই তাদের ভুল যুক্তির পেছনে না ছুটে ধর্মীয় জরুরি আচরণ-অনুষ্ঠান ও আল্লাহর ইবাদতে কর্মীদের নিমগ্নতার সময়টাকে প্রতিষ্ঠানের জন্য রহমতের কারণ মনে করা উচিত। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে তেমনটিই ঘটতে দেখা যায়। এ েেত্র জরুরি অপর একটি বিষয়ের উল্লেখ খুবই প্রাসঙ্গিক। সেটি হচ্ছে, রমজানে কাজের েেত্র কর্মীদের মাঝে ইচ্ছাকৃত কোনো ধরনের ঢিলেমি না থাকা চাই।

গৃহকর্মী বলি আর প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মী বলি, নির্ধারিত সময় ও চুক্তিতে পুরো কাজ করার মানসিকতা ও প্রস্তুতি নিজেদের মধ্যে লালন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কর্তার দায়িত্ব হচ্ছে রমজানে রোজাদার অধীনস্থদের প্রতি সদয় হওয়া। এটা তার কাজ। কিন্তু কর্মীদের মনে রাখতে হবে, কর্মীদের জন্য এটা অধিকার নয়। তারা তাদের কাজ যথাসময়ে, যথানিয়মে করার ”েষ্টা করবেন। মূলত দুই দিক থেকে পরস্পরের প্রতি বিবেচনা থাকলে বিষয়টির বিবেচনা ও ভারসাম্য রা করা সহজ হয়ে যায়।

রমজানের খাবার জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় একটি জটিল ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা রমজানুল মুবারকে রোজাদার ভোক্তাদের প্রতি সুবিচার করবেন এটিই তো ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। এ েেত্র স্বাভাবিক সুবিচার ব্যবসায়ী সমাজের প থেকে পাওয়া যায় না। অথচ এসব ব্যবসায়ীর বেশির ভাগই মুসলিম ও রোজাদার। তার পরও কেন এমন হয় ভাবলে সবারই মন বিষিয়ে ওঠে। এটি কি ব্যবসায়ীদের ওপরতলার কয়েকজনের সিন্ডিকেটেই সীমাবদ্ধ, নাকি সুবিধার ভাগ নিতে গিয়ে ওপর-নিচের সবাই সমান আকাক্সক্ষী।

সাধারণ রোজাদারদের পে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এটি বের করা কঠিন। কিন্তু ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় জড়িত ব্যবসায়ী সমাজ এখানে রোজাদারদের হা-হুতাশ ও কষ্টের তীরে যে প্রতি মুহূর্তে বিদ্ধ হন, এটা আমরা অনুভব করি। রমজান মাসে রোজাদারদের সাথে চালাকি করে ব্যবসায় না করলে ব্যবসায়ীদের কোনো তি হবে বলে মনে হয় না। চোখে দেখা নগদ লাভের বাইরেও লাভ-তির অন্য অঙ্ক আল্লাহ তায়ালার হিসেবে চালু আছে। অনেক সময় সে হিসাব এ দুনিয়াতেও তার দাপট নিয়ে সামনে এসে হাজির হয়। তাই রমজানে রোজাদারদের ভোগান্তি কমাতে ব্যবসায়ীরা বাড়তি ও বিশেষ মওসুমি মুনাফার চেষ্টা বন্ধ রাখলে প্রকৃত হিসেবে তারাও লাভবান হবেন।

রমজানে পারস্পরিক সহযোগিতার সাথে জড়িত এ রকম আরো বহু ত্রে সামনে চলে আসে। চলার পথ, কেনাকাটা, যানবাহনে ওঠা-বসা ইত্যাদি েেত্র অনেক সময়ই পরিস্থিতি এমন হয় যে, কোনো একজনের অনড় অবস্থান কিংবা একগুঁয়েমির কারণে জটিলতা তৈরি হয়। এতে অনেকই ভোগান্তির শিকার হন। এসব েেত্র সহনশীলতাই প্রধান অবলম্বন। কেউ হয়তো ভুল করছেন, অপরজন নরম হয়ে, অন্য কেউ কোমলভাবে বুঝিয়ে পরিস্থিতি সহজ করতে উদ্যোগী হলে সবার জন্যই কল্যাণ হয়।

মাহে রমজানের রোজা ও অন্যান্য ইবাদত আমলের মধ্য দিয়ে একটি সামগ্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। এ জন্য রমজান ও রোজার বিষয়টিকে যার যার ব্যক্তিগত ধর্মপালনের পর্যায়ে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এর জন্য ব্যক্তির পর সমাজ, সমাজের পর রাষ্ট্রের পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতাকে সবারই গুরুত্বের চোখে দেখা উচিত। এটি কেবল এ দেশীয় প্রোপটের বিষয় নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের সব ক’টি দেশেই এ মাসের চিত্রে একটি উজ্জ্বল ভিন্নতা ফুটে ওঠে।

অমুসলিমপ্রধান দেশগুলোতেও মুসলমানেরা নিজেদের মধ্যে রমজানের পবিত্রতা ও জরুরি আনুষ্ঠানিকতা রায় জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করে থাকেন, তা হলে আমরা কেন সচেতন হবো না? নিজেদের পরিমণ্ডলে সহযোগিতা সদয়তা ও ছাড়ের মধ্যে দিয়ে সুন্দর ও কামিয়াব রমজান কাটানোর চেষ্টা আমাদের করা উচিত।

Category: রোজা