ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মাহে রমজান ও জাকাত

বোখারি শরিফের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘সব মানুষের মধ্যে মাল খরচ করার ব্যাপারে রাসূল সা:-এর হস্ত অধিক প্রসারিত ছিল। কিন্তু পবিত্র রমজান মাসে যখন জিবরাইল আমিনের সাথে তাঁর সাাৎ হতো তখন তাঁর দানের কোনো সীমা থাকত না। তিনি এমনভাবে দান খয়রাত করতেন যেমনিভাবে ঝড় সব উড়িয়ে নিয়ে যায়।’







অন্য হাদিসে আছে, ‘রমজান মাসের একটি ফরজ ৭০টি ফরজের সমান হয়ে থাকে এবং একটি নফল একটি ফরজের সমান হয়ে থাকে।’ সুতরাং দানের জন্য এর চেয়ে উত্তম মওসুম আর কোনটি হতে পারে? অর্থাৎ এ মাসে যত বেশি মাল আল্লাহর পথে, আল্লাহর দীনের পথে, নিজেদের আত্মীয়স্বজনের জন্য, গরিব-দুঃখী, এতিম ও অসহায় মানবতার জন্য খরচ করা হবে, অন্যান্য সময়ের চেয়ে তত বেশি বরং আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়ে তার দুনিয়া ও আখেরাতকে অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী করা হবে। আল কুরআন ঘোষণা করেছে, আল্লাহর পথে একটি পয়সা, একটি শস্য, একটি দানের বিনিময়ে কমপে সাত শ’ গুণ প্রতিদান দেয়া হবে।

এরপর বলা হয়েছে, এর চেয়েও অধিক দেয়া হবে। তাই জাকাত আদায়ের উত্তম মওসুম হলো রমজান।
আল কুরআনে নামাজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন বা স্তম্ভ হচ্ছে জাকাত। কুরআন মাজিদে নামাজের মতো প্রায় সমান সংখ্যক আয়াতে জাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত আমরা নামাজের পরই রোজার উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু আল কুরআন থেকে জানা যায়, নামাজের পর জাকাতই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

এমনকি বলা হয়েছে, কাফির ও মুশরিকেরা যদিও তওবা করে ও ঈমান আনে, তথাপি যতণ না নামাজ আদায় করে এবং জাকাত না দেয় ততণ পর্যন্ত তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই হিসেবে গণ্য হবে না বরং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে হবে। অর্থাৎ তওবা এবং ঈমানকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য অবশ্যই তাদের নামাজ আদায় ও জাকাত প্রদান করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল বলেন, ‘তারা যদি কুফর ও শিরক থেকে তওবা করে খাঁটিভাবে ঈমান আনে এবং নামাজ কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই হিসেবে গণ্য হবে।’ (সূরা তাওবা-১১)

এখানে একজন ব্যক্তিকে মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্তির জন্য ৪টি শর্ত মানতে হবে। প্রথমত, কুফর ও শিরক থেকে স¤পূর্ণভাবে খুলুছিয়াতের সাথে ফিরে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্রেডিশনাল ঈমান নয় বরং খাঁটিভাবে ঈমান আনতে হবে। তৃতীয়ত, ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশের সাথে সাথে নামাজের যে ওয়াক্তটিই সামনে আসবে তা বাধ্যতামূলক আদায় ও কায়েমের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, মালের মালিক হলে বাধ্যতামূলক জাকাত আদায় করতে হবে ও জাকাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

আল কুরআনের শুরুতেই মুত্তাকিদের কয়েকটি গুণের কথা বলা হয়েছে। এগুলোর অন্যতম গুণটি হলো, ‘আল্লাহ যে ধনসম্পদ দিয়েছেন তা থেকে খরচ করেন।’আল কুরআনে আরোও বলা হয়েছে, ‘ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপে পরস্পর পরস্পরের দায়িত্বশীল বা সাহায্যকারী বন্ধু । এদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, এরা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রাসূলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপে এদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন।’ (সূরা-তাওবা-৭১)




আল কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জাকাত কোনো দয়াদােিণ্য বা দান-খয়রাতির ব্যাপার নয়। বরং এটি একটি অধিকার । আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং তার ধনসম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিত জনের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা জারিয়াত-১৯)। ‘তুমি কি সে ব্যক্তির কথা ভেবে দেখেছ যে শেষ বিচারের দিনটিকে অস্বীকার করে, এ তো সে ব্যক্তি, যে নিরীহ এতিমকে গলা ধাক্কা দেয়, মিসকিনদের খানা দিতে যে কখনো উৎসাহ দেয় না।’ (সূরা মাউন-১-৭)।

দু’টি আয়াত থেকেই বোঝা যাচ্ছে, জাকাত প্রকৃতপে দাতার সম্পদ নয় বরং এটা বঞ্চিত ও মিসকিনদেরই হক। দাতা কেবল তার হক আদায়ের দায়িত্বটুকু পালন করলেন। মনে রাখা প্রয়োজন এটা তার কোনো কৃতিত্বও নয় বা এটি বাহবা, সুনাম-সুখ্যাতি কুড়ানোর কোনো বিষয়ও নয়।

দেশে ইসলামী সরকার না থাকলেও নামাজ এবং রোজা যেমনিভাবে তার সব আহকাম ও আরকানসহ আমরা পালন করে থাকি, জাকাত আদায়ের েেত্রও আমাদের এর সব নিয়ম-কানুনের প্রতি অবশ্যই যতœবান হতে হবে। অন্যথায় নামাজ ও রোজার আহকাম ও আরকান ছুটে গেলে যেমন নামাজ ও রোজা ফাসেদ বা নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি নিজের খেয়াল খুশিমতো জাকাত প্রদান করা হলে তাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

এ সম্পর্কে আল কুরআনে আল্লাহ ধমক দিয়েছেন। হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দানকে অন্যের ওপরে নিজের অনুগ্রহ প্রচার করে বা কাউকে কষ্ট দিয়ে সেই ব্যক্তির মতো নষ্ট করে দিও না, যে শুধু অন্যকে দেখানোর জন্য কিংবা সুনাম কেনার জন্য অর্থ ব্যয় করে অথচ সে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে : একটি মসৃণ পাথরখণ্ডের ওপর মাটির আস্তর জমেছিল। প্রবল বর্ষণের ফলে পুরো মাটি ধুয়ে গেল। এখন সেখানে রয়ে গেল শুধু পরিষ্কার পাথরখণ্ডটি। এসব লোক দান-খয়রাত করে যে নেকি অর্জন করে বলে মনে করে তার কিছুই তার কাছে আসে না। আর আল্লাহ কাফেরদের সোজা পথ দেখান না।’ (সূরা বাকারা-২৬৪)

কাজেই রমজানের রোজা আমি পালন করছি কি না তা যেমন আমি আর আমার আল্লাহই ভালো জানেন, তেমনি দানের ব্যাপারটি ওই রকমই হওয়া উচিত। বলা হয়েছে, তুমি এমনভাবে দান করো যে ডান হাতে দান করলে তোমার বাম হাত যেন তা জানতে না পারে।

%d bloggers like this: