ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মিথ্যা পরিহার ও সত্য প্রতিষ্ঠার মাস

‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করবে না তার শুধু খানাপিনা পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনোই প্রয়োজন নেই’ (আল হাদিস)। এ মাসে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে মানবজাতির জন্য আল-কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছিল। এ মাসে রচিত হয়েছিল সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্বের ইতিহাসে চূড়ান্ত সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায় ‘বদর যুদ্ধ’। আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধে লুকায়িত অসংখ্য মিথ্যার বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম চলবে—রমজানের রোজা আমাদের সে মানসিকতা গড়ে তুলুক।

মিথ্যা কথা ও কাজ শব্দ দুটির মাধ্যমে মানুষের সামগ্রিক জীবনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানই সত্য, আল-কোরআন পৃথিবীর মানুষের শেষ হেদায়াতগ্রন্থ। আল-কোরআনের নির্দেশনাই একমাত্র নির্ভুল ও সত্য। আল কোরআনের আলোকে কথা বলা মানেই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করা। আর এ কিতাবের আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় চরিত্র সংশোধন করা মানে জীবনের সামগ্রিক ব্যাপারে ইসলামের পথ অনুসরণ করা।

মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সারাটা জীবন তার অভিব্যক্তিকে দুটি পদ্ধতিতে প্রকাশ করে থাকে। এক. মুখ নামক যন্ত্র যা মৌখিক অভিব্যক্তি, দুই. অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন হাত-পা ও লজ্জাঙ্গ ইত্যাদি, যা বাস্তব আচার-আচরণগত অভিব্যক্তি। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর পরিধি ব্যাপ্ত। প্রথমত. মানুষ প্রত্যুষে ঘুম ভাঙার পর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার মুখ নামক যন্ত্রটি অবিরত চলতেই থাকে। দ্বিতীয়ত. একইভাবে সেই সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সচল থাকে আর এটিই কাজ বা কর্ম। রাসূলে করিম এ দুটি জিনিসের গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম, যার মুখ ও হাত থেকে অপরাপর মুসলমান নিরাপদ।’ রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের মুখ ও দুই উরুর মাঝখানের হিফাজতের গ্যারান্টি দাও, আমি তোমাদের বেহেশতের গ্যারান্টি দিচ্ছি।

মানব জীবনের প্রতিদিনের কথা ও কাজগুলো সত্য অথবা মিথ্যার ওপর পরিচালিত হয়। যাদের নফসের ওপর বিবেক শক্তিশালী তারা সত্য কথা ও কাজের ওপর টিকে থাকতে পারে। পক্ষান্তরে যাদের বিবেকের ওপর নফস শক্তিশালী বা বিজয়ী তারা মিথ্যার বেসাতি ছড়ায়। তাই আল্লাহ রাব্বুল দয়া করে আমাদের বিবেককে শক্তিশালী করার জন্য অনেক কর্মসূচি আল-কোরআনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন।

মহান আল্লাহর প্রতিটি কর্মসূচি ব্যাপক কার্যকর ভূমিকা রাখে। ঈমান, নামাজ, জাকাত ও হজের ন্যায় রোজা একজন ব্যক্তিকে সারা দিনের ক্ষুধা-পিপাসার দুঃসহ জ্বালা নিবারণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ‘আল্লাহ আলিম অর্থাত্ মহাজ্ঞানী, অতিশয় জ্ঞাত বা বাছির অর্থাত্ মহাদ্রষ্টা, গভীর ও প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন’—এ অনুভূতির কারণে সে সুযোগ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে। অবিরত ও ক্রমাগত একটি মাস এ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তার হৃদয়ের গভীরে আল্লাহর এমন এক ভয় অঙ্কিত হয়, যার ফলে বাকি ১১টি মাস সব ধরনের মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়।

এটি এমন একটি শক্তি ও সত্য-মিথ্যা নিরূপণের এমন মানসিকতা, যার সাহায্যে বা যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারে, ন্যায় কাজের জন্য অগ্রসর হতে পারে। এ শক্তির ওপর ভর করে এবং আল-কোরআনের জ্ঞানকে পুঁজি করে মিথ্যা কথা ও কাজ পরিহার করে সত্য কথা ও কাজ করার জন্য এগোতে পারে। এ জন্য তাকওয়ার ট্রেনিং গ্রহণ করার প্রাক্কালেই অর্থাত্ রমজান মাসেই আল্লাহ আল-কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান তো সে মাস, যাতে এ কোরআন নাজিল করা হয়েছে। আর এ কোরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথের দিশা। মানুষের জন্য (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী’ (সূরা-বাকারা-১৮৫)।

শুধু ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকাই ইবাদত নয়, বরং এটা আসল ইবাদতের অবলম্বন মাত্র। প্রকৃত ইবাদত হলো আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের মিথ্যা কথা ও কাজ পরিহার করে সত্যের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া, সত্যের সাক্ষ্য হওয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য সত্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াও’ (সূরা নিসা : ১৩৫)। যে ব্যক্তি মিথ্যার বিরুদ্ধে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে না আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে বড় জালিম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সাক্ষ্য বর্তমান রয়েছে, সে যদি তা গোপন রাখে, তবে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে (সূরা বাকারা : ১৪০)?

সত্যের মৌখিক সাক্ষ্য বলতে বোঝায়, আমাদের কাছে আল-কোরআনের মাধ্যমে যে সত্য পৌঁছেছে, রমজানের রোজার মাধ্যমে মিথ্যা কথাকে পরিহার করে সত্যকে গ্রহণ করার যে শিক্ষা পেলাম, তা বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে মানুষের চিন্তায়, বিশ্বাসে, নৈতিকতায়, তাহজীব-তমদ্দুনে, সামাজিক রীতিনীতিকে, রুজি-রোজগারে, লেনদেনে ও আইন-আদালতে, রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এবং মানবীয় বিষয়াদির অন্য সব দিক ও বিভাগে সত্যতার প্রমাণ খোলাখুলিভাবে বিবৃত করা এবং যুক্তিসহকারে মিথ্যার অসারতা ও দোষত্রুটি নির্দেশ করা।

আর বাস্তব সাক্ষ্যদানের অর্থ হচ্ছে, রমজানের রোজার মাধ্যমে মিথ্যাকে পরিহার করে সত্যকে গ্রহণ করার যে শিক্ষা পেলাম, তা প্রথমে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন ও রূপদান করে নিজেকে দুনিয়াবাসীর সামনে উপস্থাপন করা। যে কোনো স্থানে, যে কোনো অবস্থায়, যে কোনো ব্যক্তি বা জাতির সঙ্গেই আমাদের সাক্ষাত্ হোক না কেন, আমাদের সুন্দর ও উন্নত চরিত্র দেখে যেন মোহিত হয় এবং চারিত্রিক দাওয়াত পেয়ে দুনিয়াবাসী যেন ইসলামের খুব কাছাকাছি চলে আসে।

সত্যিই যদি আমরা মিথ্যা কথা ও কাজকে পরিহার করে সত্যের উপলব্ধি করতে পারি তবেই আমাদের খানাপিনা পরিত্যাগ করা কাজে আসবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের সে তাওফিক দিন। আমিন।

Category: রোজা