ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমজানের প্রস্তুতি

রমজানের প্রস্তুতিপ্রতি বছরের মতো এ বছরও কিছু দিন পরই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসছে মাহে রমজান। মুমিনের আত্মাকে আল্লাহ তায়ালা ধুয়েমুছে পাকসাফ করে তার রঙে রঙিন করে তুলবেন। আর যারা খোদাপ্রেমিক তাদেরও অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। তারা শুধুই ভাবছেন, কোন দিন থেকে শুরু হবে রমজান এবং তারা নিজেদেরকে পূতপবিত্র করে গড়ে তুলবেন। তাদের আখলাককে উন্নততর, মহত্তর, পবিত্রতর করে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ সাধন করবেন। পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টির জন্য গরিবের প্রতি সহমর্মী, ধৈর্যশীল ও সহনশীল হবেন। চারিত্রিক গুণাবলি আরো শাণিত করবেন। সিয়াম সাধনার কঠোর সংযমের সিঁড়ি বেয়ে পরহেজগারির শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করবেন।

সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলবেন, বান্দা থেকে বন্ধু হবেন এবং সমাজের অন্যজনকে আত্মসংযমী ও আত্মশুদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করে সমাজকে কলুষমুক্ত করবেন। মহান জগৎ-সংসারের মালিক আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হে ঈমানদারেরা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। আর এ জন্য ফরজ করা হয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া হাসিল করতে সক্ষম হও।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)।

যখনই কোনো বান্দা তাকওয়াবান হয়ে যাবে তখন তার সব কিছুই হবে আল্লাহর জন্য। সর্বক্ষণই তার চিন্তা থাকবে যে আমি যদি আল্লাহর হয়ে যেতে পারি তাহলে সব কিছুই আমার হয়ে যাবে। আল্লাহ ও বান্দা কাছাকাছি হওয়ার মাধ্যম হলো ুধার অনুশীলন, যা কুপ্রবৃত্তিকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। মাহে রমজান প্রতি বছরই ুধার অনুশীলন শিক্ষা দেয়। কিন্তু আমরা রমজান এলেই ভালো খাবার এবং বেশি খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই, যা তাকওয়া অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

হজরত আয়েশা রা: বলেছেন, ‘রাসূল সা:-এর অবর্তমানে তাঁর উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মসিবত অবতীর্ণ হয় তা পেটপুরে খাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল।’ তাই যদি আমরা রমজান শুরু হলেই ভালো খাবার এবং একটু বেশি খাওয়ার নিয়তে সবাই বিশ কেজি করে ছোলা, ৩০ কেজি করে চিনি, পাঁচ কেজি করে বেশন, পেঁয়াজ, মরিচ ইত্যাদি কিনে রাখি তাহলে তো বাজারে পণ্যের টান পড়বেই। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম একধাপ বৃদ্ধি করে সাধারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যায় ইফতারের পণ্যসামগ্রী।

সে কারণে দরিদ্র মানুষ সারা দিন রোজা রেখে ভালো কিছু দিয়ে ইফতার করতে পারেন না। আমরা সারা দিন রোজা রেখে নানা রকম ইফতার করি। বুট, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, হালিমসহ অনেক মুখরোচক খাবার থাকে আমাদের ইফতারের প্লেটে। রোজার মাসে মনে হয়, আমরা কে কত খেতে বা রান্না করতে পারিÑ এই প্রতিযোগিতা করি। কিন্তু সারা দিন রোজা রেখে আমাদের পাকস্থলী খুব ুধার্ত ও দুর্বল থাকে। এর পর যদি এ ধরনের খাবার বেশি খাওয়া হয়, তাহলে আমাদের শরীরে নানাবিধ সমস্যা হতে পারে। তাই প্রয়োজনের তুলনায় যত বেশি খাবার খাওয়া হবে, ততই এর কুফল ভোগ করতে হবে। কারণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইফতারি ও সেহরি খেলে ুধা আরো বেশি লাগে। পরিমিত খাবার খেলে ুধা এত তীব্র হয় না।

সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, শুধু পেট খালি থাকার জন্যই ুধা অনুভূত হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকস্থলীতে চর্বির উপস্থিতিই এর কারণ। পেটে চর্বির স্তর বেশি থাকলেই ুধা বেশি টের পাওয়া যায়। অপর দিকে চর্বি কম থাকলে ুধাও কম লাগে। আসলে চর্বিযুক্ত খাবারই আমাদের ুধাবোধ জাগিয়ে দেয়। পেট খালি থাকলে দেহে ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়। এই ফ্যাটি অ্যাসিড আসে আমরা যেসব খাবার খাই তার চর্বির অংশ থেকে। অর্থাৎ ুধার সাথে চর্বির একটি নিবিড় যোগসূত্র আছে। এ কারণে ইফতার ও সেহরিতে খুব বেশি পরিমাণে খেলে দিনের বেলায় ুধার তীব্রতা বাড়ে। এ ছাড়া অন্যান্য সমস্যার মধ্যে পেট ব্যথা, গ্যাস্ট্রাইটিস, পেট ফাঁপা, মাথাধরা প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সারা দিনে চাহিদামতো যতটুকু ক্যালরি গ্রহণ করা দরকার, তার বেশির ভাগই ইফতারিতে গ্রহণ করা হয়। কারণ ইফতারির আইটেমগুলোতে ক্যালরি বেশি থাকে এবং আইটেমও অনেক থাকে। হিসাব করে দেখা যায়, ২৫ গ্রাম ছোলা ভাজা ৯২ ক্যালরি, বেগুনি মাঝারি সাইজের একটি ৮০ ক্যালরি, শরবত এক গ্লাস গড়ে ৬০ থেকে ৭০ ক্যালরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ ক্যালরি, পেঁয়াজু দু’টি বড় ১০০ ক্যালরি, হালিম এক কাপ ২০০ ক্যালরি, কাবাব একটি ১০০ গ্রামের ১৭০ ক্যালরি, জিলাপি (বড়) একটি ২০০ ক্যালরি, মুড়ি এক কাপ ৬০ ক্যালরি, খেজুর দু’টি ১৪৫ ক্যালরি, ফল দু’টি ৪০ থেকে ১০০ ক্যালরি।

সারা দিন রোজা রাখার পর এত সব ক্যালরিযুক্ত খাবার বেশি খেলে যেমন শরীরের ওজন বেড়ে যায়, তেমনি হজমেও গোলমাল হতে পারে। আমাদের সমাজের অনেকের ধারণা, এক দিন উপবাস থাকলে তারা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়। কারণ তাদের জীবনীশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু দেহ ও দেহের প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং তার উদ্দেশ্যের ওপর গবেষণা চালিয়ে বৈজ্ঞানিকেরা প্রমাণ করেছেন, ুধা লাগলেই সাথে সাথে ভোজনের প্রয়োজন হয় না, আগে থেকেই কিছু না কিছু খাদ্য সঞ্চিত থাকে এবং দেহের প্রয়োজন অনুসারে তা যথাসময় সরবরাহ হয়।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সুস্থ জীবন লাভের জন্য খাওয়ার প্রয়োজন বেশি নয়, বরং কম ও পরিমিত খাবারই সুস্থ জীবন লাভের চাবিকাঠি। অনেক রোজাদারই বলে থাকেন, আমি রোজার মাসে কম খেয়ে ভালো আছি।

Category: রোজা