ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমজানে আত্মসুদ্ধি

ইসলাম মানবতার ধর্ম। সত্যের ধর্ম। কল্যাণের ধর্ম। আর মানুষের কল্যাণ তখনই আসে, যখন কল্যাণের সাধনা করা হয়। কল্যাণ সাধনের জন্য আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি চর্চার প্রয়োজন হয়। আত্মশুদ্ধির চর্চা ব্যতীত  কল্যাণ লাভ হয় না। তাই বলা যায় চিরকল্যাণে জন্য আত্মশুদ্ধির চর্চা আবশ্যক। ইসলাম যেহেতু চিরকল্যাণ ও মানবতার ধর্ম; এ কারণে এতে রয়েছে সর্বদা আত্মশুদ্ধির আদেশ। মহান আল্লাহ রমজান মাসকে আত্মশুদ্ধি অর্জনের বিশেষ সুযোগ করে দিয়েছেন। রমজান মাস মানুষকে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, অনাচার-অত্যাচার পরিহার করার আহ্বান করে। আত্মশুদ্ধির জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা ও  কুরবানির পথে পরিচালিত করে। যার ফলে রমজানের বদৌলতে একজন মানুষের অন্তর হয়ে ওঠে সংযমী ও আত্মপ্রত্যয়ী।

‘রমজান’ শব্দটি মূল ক্রিয়া হলো রয়জুন অর্থ উত্তাপ, জ্বালিয়ে দেয়া, পুড়িয়ে দেয়া, ভস্মীভূত করে দেয়া। রমজান যেহেতু গুনাহ পাপরাশি জ্বালিয়ে দেয়। তাই তাকে রমজান বলে নামকরণ করা হয়েছে। রমজানের আরেকটি আরবি প্রতিশব্দ সিয়াম। এর অর্থ বিরত থাকা, সংযত থাকা, সংবরণ করা। সিয়াম যেহেতু আমাদের অনেক বিষয় থেকে বিরত রাখে, এ কারণে তাকে সিয়াম নামে নামকরণ করা হয়েছে।

পরিভাষায় সুবে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম।

রমজানের ফজিলত : হাদিস শরিফে রমজানের প্রচুর ফজিলত পাওয়া যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, রোজা মুমিনের ঢালস্বরূপ। যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধা যেমন ঢাল দিয়ে প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে বাঁচে, ঠিক তেমনি মুমিন রোজার মাধ্যমে অন্যায় ও পাপাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করে। নবী করীম সা: আরো বলেন, আল্লাহ তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করেছেন, আর আমি তোমাদের ওপর রোজার রাত জাগরণ (তারাবি) সুন্নত করেছি। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় দিনে  রোজা ও রাতে জাগরণ করে সেই ব্যক্তি ওই দিনের মতো পাপমুক্ত হয়ে যায়, যেদিন তার মায়ের গর্ভ থেকে জন্মেছে। তিনি আরো ইরশাদ করেন, রোজা ও কুরআন উভয়ই আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করে বলবে হে আল্লাহ! আমি কুরআন তাকে রাতের নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি। রোজা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে দিনের বেলায় সব পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। আমার পক্ষ থেকে তার জন্য সুপারিশ কবুল করো। আল্লাহ উভয়ের সুপারিশ কবুল করে ওই ব্যক্তিকে জান্নাতবাসী করে দেবেন (মিশকাত)।

রোজার উদ্দেশ্য : রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। আর তাকওয়া মুমিন জীবনের পরম কামনা। মুমিন তাকওয়া ছাড়া অন্য কোনো বস্তুর আশা করতে পারে না। রমজান তাকওয়ার মাস। মুমিনেরা এ মাসে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শুধু তাকওয়া অর্জনের জন্য দিনের বেলা সব পানাহার ও নারী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকেন। মুমিনের নয় শুধু, প্রতিটি রোজাদার দিনে এমন সময় অতিবাহিত করেন, যে সময় তিনি কারো সামনে থাকেন না,  কেউ তাকে দেখেন না; তারপরও শুধু তাকওয়ার ভয়ে কোনো কিছু খান না, স্ত্রী সম্ভোগ করেন না। এটাকেই তাকওয়া বলে। রমজান বা রোজার এটাই উদ্দেশ্য।

রমজানের আমলগুলো : সেহরি : রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সেহরি খাও। কেননা সেহরিতে যা খাওয়া হয় তাতে বরকত হয়। যেকোনো রোজার জন্য সেহরি খাওয়া সুন্নত। রাসূলুল্লাহ দায়েমি সুন্নত হলো সেহরি। এটাও একটি ইবাদত। এ মাসের একটি ইবাদত অন্য মাসের সত্তর গুণ সওয়াবের অধিকার রাখে। অন্য হাদিসে রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘সেহরিতে বরকত আছে। কখনো তোমরা তা পরিত্যাগ কোরো না। কিছু না থাকলে শুধু এক ঢোক পানি খেয়ে হলেও সেহরি আদায় কোরো। কেননা, যারা সেহরি আদায় করে তাদের প্রতি আল্লাহ রহমত দান করেন। এবং ফেরেস্তারা তাদের জন্য কল্যাণের দোয়া করেন।

ইফতার : ইফতার অর্থ ভঙ্গ করা। দিনের শেষে রোজা ভঙ্গ করাকে ইফতার বলে। ইফতার রোজার অন্যতম একটি ইবাদত। সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা সুন্নত। সেহরিতে বিলম্ব ইফতারে দ্রুততা সুন্নত। রোজা মূলত প্রশিক্ষণের মাস। আল্লাহর  রাসূলের আদর্শ হলো রাতের শেষ ভাগে তাই যতটুকু সম্ভব খাওয়া। আর ইফতারে তার আদেশ শুরু ভাগে খাওয়া। তাহলেই বান্দা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবে। যখন বলা হয়েছে খাও, তখন খাবে। যখন বলা হয়েছে ভঙ্গ করো, তখন বিলম্ব না করে ভাঙ্গতে হবে। আমাদের সমাজে ইফতারের শুরু ভাগে, খাওয়াকে মন্দ মনে করে। বিলম্ব করে খায়। এটা ভুল। চরম মূর্খতা। তিনটি কাজ রাসূলের নিয়মিত সুন্নত। তন্মধ্যে একটি তাড়াতাড়ি ইফতার। ইফতারের বিভিন্ন ফজিলত হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন রোজাদারের দু’টি আনন্দের বিষয় রয়েছে। একটি ইফতারের সময়, অন্যটি আল্লাহ তার পুরস্কার প্রদানের সময়। অন্য বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি অপরকে ইফতার করাল সে রোজাদারের সমান সওয়াব পেল। অথচ রোজাদারের সওয়াবে কমতি হলো না। বলা হলো আমাদের মাঝে অনেকেরই পেট ভরে খাওয়ানোর সক্ষমতা নেই। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘ পেটভরে নয়, শুধু একটু খেজুর দিয়ে হলেও।’

তারাবি :  তারাবি অর্থ আরামদায়ক বসা। আরাম করা বা পাওয়া, সাহাবিদের যুগে প্রতি চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ আরাম করে নিতেন। এই অর্থে এ নামাজকে তারাবিহ বলে। তারাবির নামাজ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। দশ সালামে বিশ রাকাত নামাজ পড়া। এশার পর বেতরের নামাজের আগে এ নামাজ আদায় করা। তবে কতটুকু সময়ের মধ্যে তারাবি পড়তে  হবে তার কোনো ধরাবান্ধা নিয়ম নেই। তাড়াতাড়ি পড়া! এতেও বাধা নেই। ধীরস্থিরভাবে আদায় করা, তাতেও নিষেধ নেই।

কুরআন খতম : রমজানের অন্যতম একটি আমল কুরআন তিলাওয়াত। যদি তা নামাজে হয় তাহলে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো ইবাদত রমজানে নেই। তিলাওয়াতের বিশেষ সুযোগ হলো তারাবির নামাজ। প্রতিদিন এক পারা হলে ত্রিশ রমজানে সম্পূর্ণ এক খতম। অলসতার দরুন রমজানের তিলাওয়াতের খতম ছেড়ে দেয়া অনুচিত। তবে ছোট ছোট সূরা দিয়ে আদায় করলেও তারাবি আদায় হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত হলো সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদত। আর রমজানের তিলাওয়াত অন্য সময়ের তুলনায় বেশি সওয়াবের অধিকারী।’

Category: রোজা