ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমজানে কী খাবেন

রমজান মাসে ইফতার ও সেহরিতে মুখরোচক অনেক খাবার বাসায় যেমন তৈরি হয়, তেমনি বাজারে নানা ধরনের রকমারি খাবার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর সারা দিন রোজা রেখে ইফতারের সময় ভাজাপোড়া ঝাল খেতেই যেন আমরা বেশি ভালোবাসি। এসব খেয়ে আমাদের শুরু হয় পেটজ্বলা, বুকজ্বলা, বমি, পাতলা পায়খানা। দেখা যায় পরদিন অনেকে রোজা রাখতে পারেন না। সারা দিন রোজা রাখার পর অনেক কিছুই খেতে ইচ্ছা করে। মুখরোচক বুট, মুড়ি, হালিম, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপসহ ভাজাপোড়াজাতীয় খাবার দিয়ে আমরা ইফতার করি।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মতে, এসব ভাজাপোড়া খাবার স্বাস্থ্যের জন্য তিকর। রমজান মাসে পানাহার হতে হবে সহজপাচ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত। এ সময় পেটভর্তি খাওয়া উচিত নয়। রাতে কম করে হলেও কিছু খাওয়া উচিত। সেহরির সময় না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আবার এ সময় বেশি মাত্রায় খাদ্য গ্রহণ করলে বদহজম হতে পারে।

কেমন হবে ইফতার : ইফতার শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেঁয়াজু, চপ, কাটলেট, বুট, গোশত ভাজা, কাবাব প্রভৃতি। এসবই তেলে ভাজা ও গরম মসলাযুক্ত এবং সুস্বাদু ও মুখরোচক। স্বাস্থ্যের কথা না ভেবে যা মুখে স্বাদ লাগে, আমরা তা-ই পেট পুরে খাই। বহুবার পোড়ানো তেলেভাজা এসব খাদ্য হজম করা অত্যন্ত কঠিন ও অস্বাস্থ্যকর। সারা দিন পানাহার বন্ধ রেখে এগুলো খেলে বদহজম হতে পারে, পেটের নানা অসুখে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি।

এ সময় যা খাওয়া প্রয়োজন, সেগুলো হলো লেবুর শরবত, ভেজানো নরম চিঁড়া, দই, কলা, পাকা ফলমূল; পানিসমৃদ্ধ কাঁচা ফল, যেমন শসা, ীরা, কাঁচা পেপে, পাকা টমেটো প্রভৃতি; দেশী কোনো ফল, যেমন পেয়ারা, জাম্বুরা, আপেল, কামরাঙ্গা বা আম; দইয়ের শরবত বা টক দইয়ের মাঠা বা ঘোল। খাদ্যাভ্যাসে থাকতে হবে প্রচুর ফল, আশযুক্ত সবুজ শাকসবজি, থাকবে না উচ্চ ক্যালরি, চর্বি, চিনি ও আলগা লবণ। খুব ইচ্ছা হলে ঝাল ছাড়া বা কম ঝাল দিয়ে তৈরী বুটভুনা, মুড়ি, একটা পেঁয়াজু বা চপ অথবা একটা বেগুনি খাওয়া যেতে পারে।

সন্ধ্যায় বা তারাবির নামাজের পর ভাত বা আটার রুটি, মাছ বা গোশত, ডাল, সবজি খেতে পারেন। ইফতারের সময় অথবা তার পর অতিরিক্ত পরিমাণ ঝাল, মসলা, ভাজা, তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার অল্পসময়ে অধিক পরিমাণে গ্রহণ করায় গলব্লাডারের হজমসংক্রান্ত রস ঠিকমতো নির্গত হতে পারে না, তাতে হজমের ব্যাঘাত এমনকি বমিও হতে পারে। তা ছাড়া তৈলযুক্ত ভাজা খাবার অল্প সময়ে অধিক পরিমাণে গ্রহণে তাৎণিক পেনক্রিয়াটাইটিস হতে পারে যাকে পেনক্রিয়াসের সাঙ্ঘাতিক রোগ বলে গণ্য করা হয়। এর ফলে জীবনও বিপন্ন হতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরী খোলা খাবার, পানীয় জল ও শরবত প্রভৃতির মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে তাৎণিক হেপাটাইটিস হতে পারে। তা ছাড়া কৃত্রিম রঙমিশ্রিত খাবার ও জীবনবিধ্বংসী রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে তৈরী শরবত ও জুস থেকে থাকবেন শত হাত দূরে। এসব খাবার লিভারের মারাত্মক বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এসব খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় অবশ্যই বর্জনীয়।

রাসূলে কারিম সা: বলেছেন, ‘তোমরা খেজুর দিয়ে ইফতার করো, কেননা তাতে বরকত রয়েছে। যদি খেজুর না থাকে তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করো। পানি পাক ও পবিত্র।’ ‘রাসূল সা: ইফতারিতে শুধু খেজুর ও পানির কথা বলেছেন কেন’ এ বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখেছেন। প্রমাণিত হয়েছে খেজুর শক্তিতে ভরপুর ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। খেজুর সোডিয়ামমুক্ত, চর্বিমুক্ত, বিশেষ করে কোলেস্টেরলমুক্ত এবং আঁশের একটি ভালো উৎস। খেজুর হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। প্রতিদিন পাঁচ-ছয়টি খেজুর খেলে প্রাত্যহিক আঁশজাতীয় খাবারের চাহিদা পূরণ হয়। এটি শরীরে ১৪ শতাংশ আঁশজাতীয় খাবারের জোগান দেয়।

খেজুরে প্রাপ্ত শর্করা দেহে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে। খেজুরে প্রচুর ভিটামিন-বি কমপ্লেক্সসহ অন্যান্য ভিটামিন আছে। তবে কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। পচা, নিম্নমানের ও সস্তা কেমিক্যালমিশ্রিত খেজুর খেয়ে অনেকেই ফুড পয়জনিংয়ের শিকার হন। প্রতি বছর ইফতারির জন্য বিপুল পরিমাণ খেজুর বিদেশ থেকে আমদানি হয়। আমদানি করা সব খেজুর এক মওসুমে শেষ হয়ে যায় না। আমাদের দেশে খেজুর প্রিজার্ভেশন ব্যবস্থা কতটা মানসম্মত, তা প্রশ্নসাপে। আমাদের উচিত খেজুরসহ ইফতারি হিসেবে ঠাণ্ডা পানীয়, ডাবের পানি, দেশী ফলমূল যেমন পেঁপে, শসা, ক্ষীরা, জাম্বুরা, আনারস, আমড়া প্রভৃতি দিয়ে ইফতার করা।

ঝালজাতীয় খাবার যদি না খেলেই নয়, তা হলে কম ঝাল দিয়ে তৈরি বুটভুনা, পেঁয়াজু, বেগুনি, মুড়ি পরিমিত খাওয়া যেতে পারে। চিঁড়া, মুড়ি, নারিকেল, সেমাই, সুজি পরিমাণমতো খাওয়া যেতে পারে। ইফতারিতে পান করতে হবে প্রচুর পানি, যাতে দেহ পানিশূন্য হয়ে না পড়ে। অল্প ইফতার গ্রহণ করায় লালা নিঃসরণকারী গ্ল্যান্ড চাঙ্গা হয় এবং পরবর্তী খাবার গ্রহণের জন্য শরীর প্রস্তুত হয় বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন।

সেহরি রোজা রাখার জন্য সেহরি খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারা দিন রোজার উদ্দেশ্যে উপবাস থাকার জন্য শেষ রাতে পানাহার জরুরি। শেষ রাতে না খেলে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে শরীর অত্যধিক দুর্বল হয়ে পড়বে। আর আল্লাহ যেহেতু দিনে পানাহার নিষিদ্ধ করেছেন, তাই রাতে প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ যুক্তিসঙ্গত, ইসলামী শরিয়তে সুন্নত। সেহরিতে আমরা যা খাই, তা গুরুত্বপূর্ণ। যথাসাধ্য কম মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত।

সেহরিতে সাদা ভাত, মসলাহীন তরকারি, ডাল, হালুয়া, রুটি, দুধ সেমাই, দই, সবজি, ফল এবং প্রচুর পানি ও পানীয় বিজ্ঞানসম্মত। সেহরির সময় ভাত, মাছ বা গোশত, ডাল, সবজি খেলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সুস্থ দেহ ও মনের জন্যও রোজার গুরুত্ব অতুলনীয়। রোজা রাখলে মেদভুঁড়ি, শরীরের অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে খারাপ চর্বির পরিমাণ কমে। মাঝে মধ্যে দেখতে হবে রক্তে গ্লুকোজ, চর্বির পরিমাণ, কেমন আছে রক্তচাপ ও শরীরের ওজন। মনে রাখতে হবে সংযত হয়ে পানাহার করাও রোজার শিা।

রমজান মাসে রোজা রাখলে কোনো গ্যাস্ট্রিক(?) হয় না বা আলসার হয় না। হার্টের রোগী এবং ডায়াবেটিস রোগীরাও নির্ভয়ে রোজা রাখতে পারেন। অবশ্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। ইফতারের সময় একজন ডায়াবেটিক রোগী অধিক পরিমাণে মিষ্টি বা চর্বিজাতীয় খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে, তাই এসব খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে। সেহরির সময় তাদের খাবার সেহরির শেষ সময়ের আগে খেতে হবে। পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে যেন পানিশূন্যতা ও অপুষ্টিতে না ভোগেন।

খেজুরে প্রচুর ক্যালরি থাকে তাই একটার বেশি খেজুর খাওয়া ঠিক হবে না। ওষুধ খাওয়ার সময়গুলো ডাক্তারের পরামর্শসাপেে রিঅ্যারেঞ্জ করা যায়। সকালের ওষুধ সুবহে সাদিকের আগ মুহূর্তে খেয়ে নেয়া যায়, দুই বেলার ওষুধ সন্ধ্যায় ও শেষ রাতে খেলে চলে। এ মাসে রোগের ধরন ও প্রকৃতি অনুসারে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনমতো ডেইলি সিঙ্গেল ডোজ কিংবা সাসটেইন্ড বা টাইমড রিলিজড ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন। তবে নিজে নিজে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা ঝুঁকিপূর্ণ, এর পরিণতি হতে পারে মারাত্মক।

সঠিক ক্যালরি হিসাব করে রমজান মাসে যদি আমরা নিয়ম মেনে ঠিকমতো আহার করি তাহলে কোনো অবস্থায়ই আমরা অসুস্থ হবো না। তাই আসুন, আমরা নিয়ম মেনে খাদ্যাভ্যাস করি। জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলি। আশা করি ঈদের নিয়মমানা আনন্দের মাঝেও রোজা ও ঈদের আধ্যাত্মিক শিায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা স্বাস্থ্য পরিচর্যার নিয়মাবলি ও সংযমী খাদ্যাভ্যাসে সতর্ক থাকব। পরিমিত খাবার আহার করে, চর্বিযুক্ত, তৈলাক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার পরিত্যাগ করে রোজা রেখে সুস্থ থাকব, দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকব।

Category: রোজা