ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমজান ও সিয়ামের তাত্পর্য

আরবি চান্দ্র বছরের বারো মাসের মধ্যে রমজান ইসলামী জীবন বিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ তাত্পর্যবাহী। এই মাসে এমন একটি বিশেষ ইবাদত পালন আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন, যা তার নৈকট্যলাভের পথ সহজ করে তোলে। এই রমজান মাস রহমত, ক্ষমা ও মুক্তির সওগাত নিয়ে পৃথিবীর মানুষের কাছে হাজির হয়।

এই মাসে একজন মুমিন বান্দা তার নেক আমল বৃদ্ধি করে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন নাজাতের উপায় নিশ্চিত করতে পারেন। রমজানের শব্দগত অর্থের মধ্যে এই ধারণা নিহিত রয়েছে। রমজান সব অমঙ্গল ও পাপাচার দহন করে পুত-পবিত্র করার ক্ষেত্র তৈরি করে। ইসলামের পাঁচটি রোকন বা মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে সিয়াম বা রোজা পালন অন্যতম।

এটি একমাস ধরে মানুষের কুবাসনা ও কামপ্রবৃত্তি দমন করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাই রমজান ও সিয়াম বিশেষভাবে পারস্পরিক সম্পর্কিত। এই দুয়ের মধ্যে দহন করার উপাদান বিদ্যমান। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এটি মহান বৈশিষ্ট্য পানাহার থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থাকা। মহানবী (সা.) আল্লাহর গুণাবলীর মৌলিক উপাদান নিয়ে আচার-আচরণ ও চরিত্র গঠন করতে তার অনুসারীদের উত্সাহিত করেছেন।

এক মাস রমজানের সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর এই বিশেষ গুণের কর্ষণ করে একজন সিয়াম পালনকারী তার আত্মার পরিশুদ্ধি লাভের সুযোগ পায়। সিয়াম পালন একজন রোজাদারের মালিন্য দূর করে এবং মানসিক প্রশান্তি বয়ে নিয়ে আসে। সিয়াম পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘তাবকিয়ায়ে নফস’ বা আত্মার পবিত্রতা হাসিল ও তাকওয়া অর্জন। সিয়ামের এই বিশেষ উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ও জনগোষ্ঠীর ওপর যে রূপভাবে সিয়াম ফরজ করা হয়েছিল, তেমনি তোমাদের ওপর তা ফরজ করা হয়েছে; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ আল-কোরআন ২:১৮৩। তাহলে আল-কোরআনের এই আয়াত থেকে অনুধাবন করা যায় যে, তাকওয়া অর্জন করা রোজা পালনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সাধারণভাবে ‘তাকওয়া’ শব্দের অর্থ খেদাভীরুতা বলে ধরা হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ‘তাকওয়া’ শব্দের অর্থ ব্যাপক। আল-কোরআনের সূরা আল-বাকারের প্রথমেই এসেছে যে, ‘তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্যই আল-কোরআন হচ্ছে পথপ্রদর্শক ও হিদায়াত গ্রন্থ।’ আল-কোরআন ২:২।

প্রাসঙ্গিকভাবে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় এনে ‘তাকওয়া’র বাংলা প্রতিশব্দে সাবধানতা অবলম্বন করা হলে এই শব্দের ব্যাপকতা ও প্রায়োগিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সর্ব অবস্থায় আল্লাহর দেয়া অনুশাসন ও জীবনবিধানকে সামনে রেখে বান্দা অতি সাবধানতার সঙ্গে তার কাজ সম্পাদন করবে এবং তা হলেই সে তাকওয়া অর্জন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে।

এতে করে প্রতিটি কাজে আল্লাহর উপর আসবে তাওয়াক্কুল বা পূর্ণ নির্ভরতা এবং সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হবে তার কাছে জবাবদিহিতার প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি যখন জবাবদিহিতার কথা মনে-প্রাণে গ্রহণ করবে. তখন কোনরূপ সূত্র ছাড়াই একদিকে আল্লাহ শাস্তির ভীতি এবং অপরদিকে তার রহমতের প্রত্যাশা তার অন্তরে আসন গেড়ে বসবে। এটিই প্রকৃত ঈমানের সংজ্ঞা। রমজানের এক মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাকওয়ার এই প্রশিক্ষণ হয়ে থাকে। রমজানের এই সিয়াম লোক দেখানো কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক জীবনের এটি মুক্তি সনদ।

একজন সিয়াম পালনকারী সব আবিলতা দূরে নিক্ষেপ করে ব্যক্তি জীবনকে করে তোলে প্রত্যয়ী এবং সমাজ জীবনে সৃষ্টি করতে পারে নিজেকে একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। এরূপ আদর্শ ব্যক্তি সমাজকে করে তুলতে পারে পরিশীলিত এবং মানুষকে দিতে পারে সুপথের সন্ধান।

পার্থিব জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সংযম, ধৈর্য ও শৃঙ্খলাবোধের। রমজানের সিয়াম সংযম, ধৈর্য ও সহমর্মিতার তালীম প্রদান করে। মহানবী (সা.) এই মাসকে সহমর্মিতা ও ধৈর্যধারণের মাস হিসেবে অভিহিত করেছেন। রোজা ঢাল স্বরূপ এবং তা সিয়াম পালনকারীকে সর্বপ্রকার গর্হিত কাজ হতে বিরত রাখে। এসবের প্রতিদানে আল্লাহ তাদের জন্য বেহেশত সংরক্ষিত করে রেখেছেন। রমজান মাস নিয়ে আসে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার ভাণ্ডার।

রোজার এই মাস সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, রমজানের প্রথম দশকে আল্লাহর অপার রহমত বর্ষিত হয়, মধ্য দশকে তার ক্ষমার ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং শেষ দশকে দোজখের কঠোর শাস্তি থেকে পরিত্রাণের আশ্বাস মিলে। পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পরকালীন জীবন অনন্ত ও অসীম। এক মাস ধরে সিয়াম পালন করে মানুষের অন্তরে তাকওয়ার যে বীজ উপ্ত হয় তা ক্রমান্বয়ে মহিরূহে পরিণত হয়ে তার জান্নাত প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করে দেয়।

হাদিসে কুদসীতে এসেছে যে, প্রত্যেক নেক-কর্মের প্রতিদান আল্লাহ পরিমাপ করে দেবেন, তবে রোজা কেবল তারই জন্য হওয়ায় এর প্রতিদান তিনি তার ইচ্ছামাফিক দেবেন, কোনো পরিমাপ করে নয়। আল্লাহ রোজা পালনকারীদের জন্য বেহেশতে প্রবেশের রায়য়ান দরজা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। রোজাদার ব্যতীত কেউ এই দরজা নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।

আল্লাহ আমাদের রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের তাওফীক দান করুন এবং পরকালীন জীবনে শান্তির আবাস জান্নাতে স্থান করে দিন।

লেখক : ড. এ কে এম ইয়াকুব আলী, প্রবীণ অধ্যাপক, ইসলামী চিন্তাবিদ

Category: রোজা