ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমজান, রোজা ও আমাদের স্বাস্থ্য

রহমত, বরকত আর মাগফিরাতের মাস এই রমজান মাস; যা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য মহান রবের পক্ষ থেকে এক অফুরন্ত নেয়ামত। এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে বিশ্বমানবতার মহা আসমানী গ্রন্থ আল কুরআন। তাই এ মাসকে কুরআনের মাসও বলা হয়। এ মাসের অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ মাসে মুমিনগণ রোজা রেখে তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন করেন। আর এটাই হচ্ছে রোজার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ মাসের নফল ইবাদত অন্য মাসের ফরজের সমান। আর এ মাসের একটা ফরজ ইবাদত অন্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান। এ মাসে বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়।

রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম। এ মাসে ওমরাহ করলে হজের সমান সওয়াব হয়। কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে রোজাদারের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। যদিও রোজাদারের সওয়াবের কোনো ঘাটতি করা হয় না। এ মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এ মাসে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হয়। ফলে রোজার ত্রুটিবিচ্যুতি দূর হয়। এ মাসে রোজা রাখার ফলে ুধা-পিপাসায় কাতর অভাবী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বোঝা যায়। এভাবে এ মাসের অসংখ্য বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যায়।

এখন আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ রোজার স্বাস্থ্যগত গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব। রাসূল সা: বলেছেন ‘তোমরা রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে।’ আজকের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও এটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর আগে রাসূল সা: এই বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়েছিলেন। রোজার কারণে দিনে শরীরে পানির পরিমাণ কমে যায় বলে চামড়াতেও পানির অংশ কমে যায়। ফলে ব্রণসহ যাবতীয় চর্মরোগ প্রতিরোধে রোজা ভূমিকা রাখে। ড. রবার্টের মতে, ‘রোজা সেসব মাইক্রোব ধ্বংস করে, যা বিভিন্ন সেলকে আক্রমণ করে। ফলে তা নতুন করে গঠিত হয়।’ চিকিৎসা বিশ্বকোষে ‘খাদ্যের মাধ্যমে চিকিৎসা’ অধ্যায়ে আছে ‘বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমপক্ষে সপ্তাহে এক দিন, মাসে এক সপ্তাহ এবং বছরে এক মাস রোজা রাখা উত্তম।’ চিকিৎসা ও সার্জারিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. আলেকসিস কারিল তার ‘মানুষ : অজ্ঞাত’ নামক বইতে লিখেছেন ‘অধিক খাদ্য গ্রহণ মানবজাতির অস্তিত্ব ধ্বংসের একটি বড় কারণ। মানুষের শরীরের গঠন হলো কম খাদ্য গ্রহণের উপযোগী দুর্ভিক্ষ না থাকা সত্ত্বেও মানুষ অতীত ইতিহাসে উপবাস থাকত।’

শরীরে বেশি চর্বি থাকলে হজম দেরিতে হয়। রোজা রাখলে আমাদের শরীরের পুঞ্জীভূত চর্বি ও অতিরিক্ত ৫০ হাজার ক্যালরির ব্যবহার হয় এবং তা থেকে শরীর মুক্ত হয়। এ ছাড়া রোজা কলিজার পাশে জড়ো হওয়া চর্বিগুলোকে দূরীভূত করে। ফলে হজম ও পরিপাক ক্রিয়া দ্রুত করে। যেমনটি চিকিৎসাবিজ্ঞানী আর ক্যাম ফোর্ড তার ‘সায়েন্স কল ফর ফাস্টিং’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘চিকিৎসকদের মতে, রোজা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, শরীরের পরিপাক ও হজম প্রক্রিয়ায় এবং শারীরিক সুস্থতা বিধানে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।’

এ জন্য ইউরোপে শরীরের ভেতরে জমে থাকা ৫০ হাজার কিলোক্যালরি কমানোর জন্য ৩০ দিনে গড়ে ১২ ঘণ্টা করে রোজার মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ছাড়া শরীরে চর্বি জমে মেদ বাড়লে মানুষ মোটা হয়ে যায়। এর ফলে শরীরে আলঝেইমার্স নামক রোগ হয়। আর এ রোগের ফলে মানুষ জ্ঞানবুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি ও উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। দেখা গেছে, কেউ এক সপ্তাহ রোজা রাখলে তার শরীর থেকে দু-এক কেজি ওজন কমে যায়। তাই এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে রোজার কোনো বিকল্প নেই।

ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য রোজা বিরাট একটি নেয়ামত। কম খাদ্য গ্রহণ ও দীর্ঘ সময় খাদ্য গ্রহণ না করার ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে আসে। এতে রোগ নিয়ন্ত্রিত থাকে। দেখা গেছে, অনেক রোগীর ওষুধ সেবনেরও দরকার হয় না। অন্য এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রোজা রেখে হাঁটলে ডায়াবেটিস আরো নিয়ন্ত্রিত থাকে।

প্রখ্যাত মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা যেকোনো পুরাতন রোগ থেকে মুক্তির জন্য রোজা রাখার কথা বলতেন। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শিক্ষক ড. পি জি স্পাসকি বলেন ‘রোজার মাধ্যমে কালোজ্বর এবং শরীরের ভেতরের অন্যান্য পুরাতন রোগ বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ভালো হতে পারে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিসর দখলের পর হাসপাতালগুলোতে যৌন রোগের চিকিৎসার জন্য রোজা রাখার হুকুম দিয়েছিলেন। দশম ও একাদশ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম চিকিৎসকেরা ‘সিফিলিস’ রোগের চিকিৎসার জন্য রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বসন্ত রোগ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য তিন সপ্তাহ রোজা রাখার কথা বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হ্যমিলটন ও তার সাথীরা এক হাজার নারী-পুরুষের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন। তারা সবাই সপ্তাহে এক দিন উপবাস করেন। ফলে তাদের দাঁতের অবস্থার উন্নতি হয়। কেননা খাদ্য থেকে বিরত থাকার কারণে দাঁতও বিরতি লাভ করে। এ ছাড়া এক দিন খাদ্য গ্রহণ না করায় পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম লাভ করে এবং স্নায়ুগুলো শীতল হয়ে আসে। ফলে পেটের অসুখসহ মাংসপেশির ব্যথা দূর হয়।

ইতালির বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী মাইকেল অ্যাংলো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। ৯০ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মক্ষম ও কর্মঠ ছিলেন। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ‘আমি বহু আগ থেকেই মাঝে মাঝে রোজা রেখে আসছি। আমি প্রতি বছরে এক মাস, প্রতি মাসে এক সপ্তাহ এবং দিনে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাই।’ মস্কোর মানসিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. নিকোলাইড ৫০ বছর ধরে মাসে মাসে রোজা রাখতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বর্তমান যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কোনটি? উত্তরে তিনি বলেন ‘সেটা হলো রোজার মাধ্যমে বয়স্ক লোকদেরকে যুবকের মতো শারীরিক বুদ্ধি-বিবেক ও আত্মিক শক্তি ফিরিয়ে দেয়া।’ তিনি আরো বলেন ‘আমি ৮৫ বছর বয়সেও নিজ মাথার ওপর সহজে দাঁড়াতে পারি। অথচ আমার চেয়ে কম বয়সের লোকেরাও এ কঠিন ব্যায়াম করতে অপারগ।’

কলাম্বিয়ার সাংবাদিক স্কুলের টার্ন ব্র্যান্ড বলেন ‘রোজার শারীরিক ফায়দা অপেক্ষা আত্মিক ফায়দা বেশি।’ তিনি আরো বলেন ‘যদিও আমি শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর জন্য রোজা রাখি। কিন্তু আমি দেখি যে রোজা আমার চিন্তার জন্য উপকারী। আমি নতুন নতুন চিন্তা করতে পারি এবং কোনো জিনিসকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি।’

পাকিস্তানের প্রবীণ চিকিৎসক ডা: মোহাম্মদ হোসেন ও আমেরিকার চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. ম্যাক ভাডন বলেন ‘রোজার ফলে বাত রোগের আরোগ্য হয়। এ ছাড়া রোজা কিডনির পাথর সৃষ্টিতে বাধা দেয়। রোজার ফলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। সোডিয়ামের কাজ হলো ক্যালসিয়াম জমতে বাধা দেয়া। কারণ, ক্যালসিয়াম জমেই পাথর সৃষ্টি হয়।’ তাই আসুন, এই পবিত্র মাহে রমজানে রোজা পালন করে আমাদের সুস্বাস্থ্য গঠন করি এবং তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন করে পরকালীন নাজাতের পাথেয় অর্জন করি।

Category: রোজা