ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমযান মাস উপলক্ষে প্রস্তুতি নেয়ার কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ

রমযান মাস উপলক্ষে প্রস্তুতি নেয়ার কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হল:

১. সত্যিকার তাওবাহ

আর এটি সবসময়ের জন্যই ওয়াজিব, তবে যেহেতু এক মহান মুবারাক (বরকতময়) মাসের দিকে সে এগিয়ে যাচ্ছে তাই তার ও তার রবের মাঝে যে গুনাহগুলো আছে এবং তার ও মানুষের মাঝে যে অধিকারসমূহ রয়েছে সেগুলো থেকে দ্রুত তাওবাহ করার জন্য তার আরও বেশি তৎপর হওয়া উচিৎ; যাতে করে সে এই মুবারক (বরকতময়) মাসে পবিত্র মন ও প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে প্রবেশ করে আনুগত্য ও ‘ইবাদাতে মশগুল হতে পারে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন :

﴿وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٣١ ﴾ [النور: ٣١]

“আর তোমরা সবাই, হে মু’মিনেরা, আল্লাহ্‌র কাছে তাওবাহ কর যাতে করে সফলকাম হতে পার।” [সূরা আন-নূর: ৩১]

আল-আগার ইব্‌ন ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

وعَنْ الأَغَرَّ بن يسار رضي الله عنه عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ) رواه مسلم (2702)

“হে লোক সকল, আপনারা আল্লাহ্‌র কাছে তাওবাহ করুন কারণ, আমি দিনে তাঁর কাছে ১০০ বার তাওবাহ করি।” [মুসলিম (২৭০২)]

২. দো‘আ পাঠ

কোনো কোনো পূর্বসূরী (সাহাবীগণ, তাবি‘ঈনগণ …..) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা ৬ মাস ধরে আল্লাহ্‌র কাছে দো‘আ করতেন যাতে তিনি তাঁদের রমযান মাস পাওয়ার তাওফীক্ব দেন, এরপর (রমযান শেষে) ৫ মাস ধরে এই দো‘আ করতেন যেন (রমযানের আ‘মালসমূহ) তাদের কাছ থেকে কবুল করা হয়।

তাই একজন মুসলিম তার রবের কাছে দো‘আ করবে যাতে তিনি তাকে রমযান মাস পাবার তাওফীক্ব দেন সর্বোত্তম দ্বীনি অবস্থা ও শারীরিক সুস্থতার মাঝে এবং তাঁর কাছে এই দো‘আ করবে যাতে তিনি তাকে তাঁর আনুগত্যে সাহায্য করেন এবং তাঁর কাছে এই দো‘আ করবে যাতে তিনি তার আমল কবুল করেন।

৩. এই মহান মাসের আসন্ন আগমনে আনন্দিত হওয়া

রমযান মাসের আগমন একজন মুসলিম বান্দার প্রতি আল্লাহ্‌র সুমহান নি‘আমাতগুলোর (অনুগ্রহসমূহের) একটি, কারণ রমযান কল্যাণময় একটি মওসুম। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। এটি হল ক্বুর‘আনের মাস, আমাদের দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ, চূড়ান্ত সংগ্রামের মাস। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন :

﴿قُلۡ بِفَضۡلِ ٱللَّهِ وَبِرَحۡمَتِهِۦ فَبِذَٰلِكَ فَلۡيَفۡرَحُواْ هُوَ خَيۡرٞ مِّمَّا يَجۡمَعُونَ ٥٨ ﴾ [يونس: ٥٨]

“বলুন, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়, অতঃপর এর দ্বারা তারা আনন্দিত হোক; তা, তারা যা সঞ্চয় করে তা থেকে উত্তম।” [ইঊনুস : ৫৮]

৪. ওয়াজিব সিয়াম হতে নিজেকে দায়িত্ব মুক্ত করা

আবূ সালামাহ হতে বর্ণিত যে তিনি বলেছেন :

عَنْ أَبِي سَلَمَةَ قَالَ : سَمِعْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا تَقُولُ : »كَانَ يَكُونُ عَلَيَّ الصَّوْمُ مِنْ رَمَضَانَ فَمَا أَسْتَطِيعُ أَنْ أَقْضِيَهُ إِلا فِي شَعْبَانَ« . رواه البخاري (1849) ومسلم (1146)

“আবু সালামাহ বলেন, আমি ‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে বলতে শুনেছি, “আমার উপর বিগত রমযানের সাওম বাকি থাকত যার কাযা আমি শা‘বান ছাড়া আদায় করতে পারতাম না।”

[বুখারী (১৮৪৯) ও মুসলিম (১১৪৬)]

হাফিজ ইব্‌নু হাজার-রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন :‘এ হাদীস দ্বারা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা কর্তৃক শা‘বান মাসে রমযানের সিয়াম পালনের চেষ্টা প্রমাণ করে যে, এক রমযান এর কাযা আরেক রমযান প্রবেশ করা পর্যন্ত দেরী করা জায়েয নয়।” [ফাতহুল বারী (৪/১৯১)]

৫. পর্যাপ্ত ‘ইল্‌ম (জ্ঞান) অর্জন করা, যাতে সিয়ামের হুকুম-বিধি-বিধান এবং রমযান মাসের মর্যাদা সম্পর্কে জানা যায়।

৬. রমযান মাসের ‘ইবাদাত থেকে একজন মুসলিমকে বিরত করতে পারে এমন কাজসমূহ দ্রুত সম্পন্ন করে ফেলা।

৭. পরিবারের সদস্যবর্গ যেমন-স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে বসে তাদেরকে সিয়ামের বিধি-বিধান শিক্ষা দেয়া এবং ছোটদের সিয়াম পালনে উৎসাহিত করা।

৮. কিছু বই প্রস্তুত করা যা বাড়িতে বসে পড়া সম্ভব বা মাসজিদের ইমামকে উপহার দেয়া, যা তিনি রমযান মাসে লোকদের পড়ে শোনাবেন।

৯. রমযান মাসের প্রস্তুতিস্বরূপ শা‘বান মাস থেকেই সিয়াম পালন শুরু করা।

‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা-থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে সিয়াম পালন করতেন যে আমরা বলতাম তিনি আর সিয়াম ভঙ্গ করবেন না এবং এমনভাবে সিয়াম ভঙ্গ করতেন যে আমরা বলতাম, তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ছাড়া অন্য কোন মাসের গোটা অংশ সাওম পালন করতে দেখি নি এবং শা‘বান ছাড়া অন্য কোনো মাসে অধিক সিয়াম পালন করতে দেখি নি।” [বুখারী (১৮৬৮) ও মুসলিম (১১৫৬)]

‘উসামাহ ইব্‌ন যাইদ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে শা‘বান মাসের মত অন্য কোনো মাসে এত সাওম পালন করতে দেখিনি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “এটি রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী একটি মাস, যখন মানুষ গাফিল হয় এবং এমন মাস যখন আমলসমূহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে উঠানো হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে আমার আমল আমি সাওম পালন রত অবস্থায় উঠানো হবে।” [নাসা’ঈ (২৩৫৭) এবং আলবানী একে সহীহ আন-নাসায়ীতে একে হাসান বলেছেন।]

শা‘বান মাসের সাওম পালনের হিকমতের বর্ণনায় হাদীসে এসেছে যে এটি এমন মাস যখন আমলসমূহ উঠানো হয়। ‘আলিমগণের মাঝে কেউ কেউ অন্যান্য হিক্‌মাহসমূহ উল্লেখ করেছেন, আর তা হল শা‘বানের সাওম ফরয নামাযের পূর্বের সুন্নাহ্‌র মত যা ফরয আদায়ে মনকে প্রস্তুত করে ও উৎসাহ যোগায়। ঠিক একই বক্তব্য প্রযোজ্য রমযানের পূর্বে শা‘বানের সিয়ামের ক্ষেত্রে।

১০. কুরআন তিলাওয়াত:

সালামাহ ইব্‌ন কুহাইল বলেছেন : “শা‘বান মাসকে ক্বারীগণের মাস বলা হত।”

আম্‌র ইব্‌ন ক্বাইস, শা‘বান মাস শুরু হলে, তাঁর দোকান বন্ধ করে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য অবসর নিতেন।

আবূ বাক্‌র আল-বালাখী বলেছেন : “রাজাব মাস হল বীজ বপনের মাস, শা‘বান মাস হল ক্ষেতে সেচ প্রদানের মাস এবং রমযান মাস হল ফসল তোলার মাস।”

তিনি আরও বলেছেন : “রাজাব মাসের উদাহরণ হল বাতাসের ন্যায়, শা‘বান মাসের উদাহরণ মেঘের ন্যায়, রমযান মাসের উদাহরণ বৃষ্টির ন্যায় ; তাই যে রাজাব মাসে বীজ বপন করল না, শা‘বান মাসে সেচ প্রদান করল না, সে কীভাবে রমযান মাসে ফসল তুলতে চাইতে পারে?”

Category: রোজা