ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রহমত ও বরকতের আবহে রমজান

রহমত ও বরকতের মাস রমজান। রমজানে রহমতের আবহে বরকতের স্রোতধারায় মন সজিব হয়ে ওঠে। অনাবিল শান্তি ও কমনীয় ভাব বিরাজ করে সর্বত্র। সুসংবাদ মেলে মাগফিরাত ও নাজাতেরও। এ মাসে অন্যায় অপরাধ অনেক কম হয়। মানুষ তুলনামূলক ইবাদত-বন্দেগি করে বেশি। কারণ রমজানের বরকতে এ মাসে ইবাদতে সওয়াব পাওয়া যায় অনেক বেশি। মুমিনের জীবনে এটি একটি শ্রেষ্ঠ পাওনা।

রহমত ও বরকতের মাস হিসেবে রমজানের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অসংখ্য হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত। তিনি বলেন, ‘আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমাদের কাছে রমজান মাস সমাগত। তা এক অত্যন্ত বরকতের মাস। আল্লাহতায়ালা এ মাসে তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন, এ মাসে আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত হয়ে যায়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং বড় ও সেরা শয়তানগুলোকে আটক করে রাখা হয়।

আল্লাহর জন্য এ মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও অনেক উত্তম। যে লোক এই রাতের মহাকল্যাণ লাভ থেকে বঞ্চিত থাকল, সে সত্যিই বঞ্চিত ব্যক্তি। (নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ) হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, যে লোক রমজান মাসের রোজা রাখবে ঈমান ও চেতনা সহকারে, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গোনাহ (সগিরা) মাফ হয়ে যাবে। (বুখারি ও মুসলিম)

রহমতের আবহে পুরো রমজান মাসে সমগ্র বেহেশতজুড়ে চলতে থাকে উত্সবের আমেজ। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, ‘রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, যখন রমজান শরিফের প্রথম রাত হয়, তখন জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়, আর সারা মাসজুড়ে দোজখের দরজাসমূহ বন্ধ থাকে।

এ সময়ের মধ্যে দোজখের কোন একটি দরজাও খোলা হয় না এবং বিদ্রোহী জ্বিনসমূহকে বন্দি করা হয়। আর রমজান মাসের প্রত্যেক রাতে এক আওয়াজদাতা সুবহে সাদেক পর্যন্ত সারা রাত এই আওয়াজ দিতে থাকে যে, হে কল্যাণ ও নেকির অন্বেষণকারী, নেকির সংকল্প কর এবং খুশি হয়ে যাও। আর হে বদকাজের সংকল্পকারী! বদ কাজ হতে ফিরে যাও এবং নিজের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা কর এবং সেসবের পর্যালোচনা কর।’

পবিত্র মাহে রমজান রহমতের বারি বর্ষণে সিক্ত একটি মাস। দৃষ্টান্ত্তস্বরূপ বলা যায়, এ মাসে প্রত্যেক রাতে ইফতারের সময় ষাট হাজার ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে। ঈদুল ফিতরের দিনেও আল্লাহতায়ালা অনুরূপ সংখ্যক ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। রমজান মাসে প্রত্যেক রাতে ছয় লাখ এবং শেষ তারিখ রাতে এক কোটি আশি লাখ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। অর্থাত্ শুধু ঈদুল ফিতরের দিনই আঠার লাখ লোক জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ করে। (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব)

রমজান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে পুরস্কার বিতরণেরও মাস। এ মাসে উম্মতের জন্য পাঁচটি বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতকে রমজান সম্পর্কিত পাঁচটি বিশেষ পুরস্কার দেয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী উম্মতগণকে দেয়া হয়নি।’

নিম্নে সেই পুরস্কারের কথা বিবৃত হলো :
এক. রোজাদারের মুখের গন্ধ (যা ক্ষুধার কারণে সৃষ্টি হয়, আল্লাহ তায়ালার কাছে মেশকের চেয়েও বেশি পছন্দনীয়। দুই. তাদের জন্য সমুদ্রের মত্সগুলোও ইফতার পর্যন্ত দোয়া করতে থাকে। তিন. তাদের জন্য প্রত্যহ জান্নাতকে সাজানো হয়, অতপর আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, সে দিন দূরে নয় যে, যেদিন আমার বান্দা (দুনিয়ার) দুঃখ-কষ্ট উপেক্ষা করে আমারই দিকে ফিরে আসবে। চার. এ মাসে দুষ্ট শয়তানগুলোকে বন্দি করা হয়। পাঁচ. রমজানের শেষ রাতে রোজাদারদের ক্ষমা করা হয়। (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব)

রমজানের সবচেয়ে বড় ফজিলত হচ্ছে লাইলাতুল কদর। যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তাছাড়া রমজানে প্রত্যেক ইবাদতের সওয়াব বৃদ্ধি করা হয়, যা রমজানেরই বরকতে সাধিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এ মাসে যে ব্যক্তি কোন প্রকার নফল ইবাদত করবে, তার সওয়াব অন্য মাসের ফরজের সমান উন্নীত করা হয়। এ মাসের একটি ফরজ ইবাদতে অন্য মাসের তুলনায় সত্তরগুণ সওয়াব বৃদ্ধি করা হয়। এ মাসে মানুষের মধ্যে ধৈর্য্য, প্রেম-ভালবাসা, সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা বেড়ে যায়। ঈমানদারদের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়।’

রমজানে রহমত ও বরকতের অনন্য নিদর্শন হলো, এ মাসে মানুষ ইবাদত বন্দেগিতে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে অগণিত অসংখ্য পুরস্কার লাভ সম্ভব হয়। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু মালেক আশআরি (রা.) বর্ণনা করেন, রোজাদারকে জান্নাতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন বালাখানা দান করা হবে। সেগুলোর বাইরে থেকে অন্দরমহল এবং অন্দরমহল থেকে বাইরে দৃষ্টিগোচর হবে। (ইবনে হিব্বান)

আমাদের উচিত, এ মাসে সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন হয়ে রমজানের সুফল লাভ করা। আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া। রহমত ও বরকতের সঞ্জীবনী শক্তিতে বেহেশতের শ্রেষ্ঠ মাকামে নিজেদের স্থান করে নেযা। সর্বোপরি আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হওয়া।

Category: রোজা