ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রোজার শুদ্ধতা ও জাকাতুল ফিতর

দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার (দৈহিক ইবাদতের) পর বিশেষ আর্থিক ইবাদত হলো, জাকাতুল ফিতর বা ফিতরা। গরিবদের ঈদের আনন্দে শরিক হওয়া এবং রোজাকে ত্র“টিমুক্ত করতে ইসলামী শরিয়াহ এটা আবশ্যক করে দিয়েছে। দ্বিতীয় হিজরিতে এটা আবশ্যক করা হয়। পরিবারের সব সদস্যের প থেকে নির্ধারিত হারে সম্পদ অভাবীদের মাঝে বণ্টন করা জাকাতুল ফিতর। এ ফিতরাকে বিভিন্ন হাদিসে সাদাকাতুল ফিতর, জাকাতুল ফিতর, জাকাতুস সওম, জাকাতে রমাজান, জাকাতে আবদান (দেহের জাকাত) ও সদাকাতুর রুউস বলা হয়েছে (আওনুল বারী)।

একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় সূরা আলার ‘কদ আফলাহা মান তাজাক্কা’ ফিতরার ব্যাপারে নাজিল হয় (সহিহ ইবনে খুজাইমা)। ইমাম আবু হানিফা রহ:-এর মতে, জাকাতুল ফিতর ওয়াজিব, ফরজ নয়। তবে ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমদ রহ:সহ একদল আলিমের মতে, এটা ফরজ, ওয়াজিব নয় (শরহে মুসলিম, মিরআত)। 

আবদুুল্লাহ ইবনে উমার রা: বলেন, ‘রাসূল সা: জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং প্রত্যেক স্বাধীন ও গোলাম, নারী ও পুরুষ, ছোট ও বড় সবার ওপরে এক সা খেজুর বা যব দান করার নির্দেশ দিয়েছেন’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত)। যারা ওয়াজিব বলেন, তারা ফরজ শব্দটিকে নির্ধারণ করা অর্থে ব্যবহার করেছেন। দাস-দাসীর ফিতরা মালিক আদায় করবে। নারী ফিতরা দিতে না পারলে স্বামী দেবেন। অবিবাহিত হলে বাবা দেবেন। অপ্রাপ্ত বয়স্কেরও ফিতরা বাবা দেবেন। 

আবদুুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ‘রাসূল সা: সদাকাতুল ফিতরকে রোজাদারের বেহুদা কথা, কাজ ও গুনাহ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্ব অসহায় মিসকিনদের খাবারের উদ্দেশ্যে ফরজ (নির্ধারণ) করেছেন’…(আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম)। কিছু আলিম বলেন, ফিতরা হলো, সাহু সিজদার মতো। সাহু সিজদা দ্বারা যেমন নামাজের ত্র“টি দূর হয়, তেমনি ফিতরা দ্বারা রোজার ত্র“টি দূর হয়। 

ইমাম আবু হানিফা রহ:-এর মতে, জাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। বেশিরভাগ আলিমের মতে, যার ওপর জাকাত ফরজ নয়, অথচ তার কাছে ঈদের দিন নিজের ও তার পরিবারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকলে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব। সদাকাতুল ফিতরের সম্পর্ক দেহের সাথে ও রোজার সাথে। আর জাকাতের সম্পর্ক মালের সাথে। রোজাদার গরিবও হতে পারে আবার ধনীও হতে পারে।

ইমাম শাফিঈ, মালেক, আহমদ রহ:সহ একদল আলিমের মতে, রমাজানের শেষ দিন সূর্যাস্তের মুহূর্তে সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়। কারণ, সূর্য ডোবার সাথে সাথে রোজা শেষ হয়। এটা রোজার পবিত্রতার সাথে যুক্ত। ইমাম আবু হানিফা রহ:সহ একদল আলিমের মতে, ঈদের দিন ফজরের সময় তা ওয়াজিব হয়।  

ইবনে আব্বাস রা: বলেনÑ রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে সলাতের আগে ফিতরা আদায় করে, তা ফিতরা হিসেবে কবুল হবে। আর যে সলাতের পরে তা আদায় করে, তা (ফিতরা হয় না) সাধারণ দান হিসেবে গণ্য হবে’ (ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)। 

আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, ‘আমরা রাসূল সা:-এর জীবদ্দশায় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দান করতাম’ (বুখারি, মুসলিম)। নামাজের আগে দিলে পুরো দিন অন্তর্ভুক্ত হয় আর পরে দিলে পুরো দিন হয় না। অথচ নবী সা: বলেন, ‘আজ তাদেরকে ধনী করে দাও’ (বায়হাকি)।

সাহাবিরা ঈদের দুই-এক দিন আগে সদাকাতুল ফিতর আদায় করে দিতেন (বুখারি)। ইবনে উমার রা:ও তাই করতেন। ইমাম আহমদ ও মালেক রহ: এ মত সমর্থন করেছেন। এর আগে আদায় করা নাজায়েজ মনে করেন তারা। ইমাম শাফিঈ রহ:এর মতে, পয়লা রমজান থেকে আদায় করা যায়। হানাফি মাজহাবে বছরের শুরু থেকে আদায় করা যায়। তবে ঈদের দিন ভোরে আদায় করা উত্তম, এবং বিলম্ব না করা উচিত। 

হানাফি মাজহাব মতে ঈদের নামাজের আগেই  ফিতরা দিতে হবে। না পারলে মাফ হবে না, ওয়াজিব অনাদায়ি রয়ে যাবে। ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমদ রহ: বলেন, সালাতের পরে আদায় করা হারাম। ইমাম মালেক রহ: বলেন, আগেও চলবে এবং পরেও চলবে। তবে ইমাম ইবনে হাজম ও ইমাম ইবনে কায়্যিম রহ: বলেন, সালাতের পরে হারাম। সবার মতে, ঈদের পরের দিন হারাম (মিরআত)। 

আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, ‘আমরা রাসূল সা:-এর যুগে ঈদুল ফিতরের দিন এক সা খাদ্য ফিতরা দিতাম, তখন আমাদের খাদ্য ছিল যব, কিশমিশ, পনির, খেজুর’ (বুখারি)। আরেকটি মওকুফ হাদিসে আছেÑ যব, গম, আটা ও ছাতু (ইবনে খুজাইমা)। ত্বআম দ্বারা প্রত্যেক খাদ্যবস্তুকে বোঝানো হয়। আমাদের প্রধান খাদ্য চাল। কখনো কখনো গম। কেউ চাল বা গম দিয়ে ফিতরা দিতে পারে। খাদ্যবস্তু দিয়েই দিতে হবে। এটা সুন্নাত। 

ইমাম আহমদ রহ:-কে খাদ্যের মূল্যদানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এতে সুন্নাতের বিরোধিতা করা হয়। আমি এটা সমর্থন করি না। খুবই অসুবিধা হলে টাকা দিয়ে ফিতরা দেয়া যায়। এটা হানাফি মাজহাবের ফতওয়া। অন্য তিন মাজহাবে অবৈধ। 

এক সা’র কথা হাদিসে এসেছে। মালেকি, শাফিঈ ও হাম্বলি এ মতের সমর্থক। হানাফি মাজহাবে গম ছাড়া অন্যান্য খাদ্যবস্তু এক সা ফিতরা দিতে হবে। আর গম অর্ধ সা। মুয়াবিয়া রা:-এর হাদিস দলিল দেয়া হয়।

আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, ‘আমরা রাসূল সা:-এর যুগে ঈদুল ফিতরের দিন এক সা খাদ্য ফিতরা দিতাম; তখন আমাদের খাদ্য ছিল যব, কিশমিশ, পনির, খেজুর। যখন মুয়াবিয়া রা: মদিনায় আসলেন তখন তিনি বললেন, সিরিয়ার দুই মুদ গম অর্ধ সা খেজুরের সমান’ (বুখারি)। তখন থেকে লোকেরা এ মত গ্রহণ করে এবং আমিও দুই মুদ গম অর্ধ সা দেয়া আরম্ভ করি (ওজায়েফ শাহরি রমাজান)। 

উসমান, আলী, আবু হুরায়রা, জাবির, ইবনে আব্বাস, ইবনে জুুবাইর, আসমা বিনতে আবি বাকর রা: অর্ধ সা আদায় করেছেন (মুসান্নাফে আবদুুর রাজ্জাক)। 

ইমাম শাফিঈ, মালেক, আহমদ বিন হাম্বল, ইসহাক, হাসান বসরি, জাবির বিন ইয়াজিদ এক সা ফিতরার কথা বলেছেন। সেটা গম বা অন্য কিছু হোক না কেন। হিজাজি এক সা হলো দুই কেজি ১৭৬ গ্রাম। আর অর্ধ সা হলো এক কেজি ৮৮ গ্রাম। ফিতরা কয়েকজন জমা করে আদায় করা ভালো। একাকীও আদায় করা যায়। ঈদের সালাতের আগেই বণ্টন করতে হবে, যাতে ঈদের দিন গরিবেরা অভাবমুক্ত হয়। 

এটা ব্যয় করার ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়। এক. জাকাত ব্যয়ের আটটি খাতে ব্যয় করা ওয়াজিব। দুই. জাকাত ব্যয়ের আটটি খাতে ব্যয় করা জায়েজ ও গরিবদের প্রাধান্য দেয়া। তিন. শুধু ফকির-মিসকিনদের দেয়া। একজনের ফিতরা কয়েকজনকে দেয়া যায়। কাফির, মুশরিক, মুরতাদদের ফিতরা দেয়া জায়েজ নেই। নিজ পিতা, সন্তানসন্ততি, স্ত্রীকেও ফিতরা দেয়া যাবে না। 

পাঠক! নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফিতরা আদায় ও বণ্টন করে আমাদের রোজাকে শুদ্ধ করি ও গরিবদের খাবারের ব্যবস্থা করি।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন

কারো আঁখি জলে কারো ঘরে কিরে জ্বলিবে প্রদীপ?

দু’জনার হবে বুলন্দ নসীব, লাখে লাখে হবে বদ নসীব

এ নহে বিধান ইসলামের। 

ঈদুল ফিতর আনিয়াছে তাই নব বিধান,

ওগো সঞ্চয়ী উদ্বৃত্ত যা করবে দান,

ুধার অন্ন হোক তোমার!

ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,

তৃষ্ণাতুরের হিস্সা আছে ও পেয়ালাতে

দিয়া ভোগ কর, কর বীর দেদার।