ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

লাইলাতুল কদর

লাইলাতুল কদর বা মহামর্যাদাপূর্ণ রাত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (আল কুরআন) নাজিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে, (হে নবী!) আপনি জানেন কি! এ মর্যাদাপূর্ণ রাতটি কী? মর্যাদাপূর্ণ এ রাতটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, এ রাতে ফেরেশতাগণ ও তাদের সরদার ‘রূহ’ (জিবরাইল আ:) সহ তাদের মালিকের সব ধরনের আদেশ ও বার্তা নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন, সে আদেশ বার্তাটি হচ্ছে চিরন্তন প্রশান্তি, তা ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত অব্যাহত থাকে’ (সূরা আল কদর : ১-৫)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে (আল কুরআনকে) নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) সতর্ককারী। এ রাতেই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত বা নির্ধারিত হয়। আমারই আদেশক্রমে কর্মসম্পাদনের জন্য আমি নিঃসন্দেহে আমার দূত (ফেরেশতা) পাঠিয়ে থাকি’ (সূরা আদ দোখান : ৩-৫)।

লাইলাতুল কদর শব্দ দু’টির অর্থ হচ্ছে, প্রথমত; লাইল শব্দের অর্থ হচ্ছে রাত বা রজনী। দ্বিতীয়ত; কদর শব্দের অর্থ হচ্ছে মর্যাদাপূর্ণ, সম্মানিত, মহামহিমান্বিত বা মাহাত্ম্যপূর্ণ। একসাথে লাইলাতুল কদর শব্দ দু’টির অর্থ হচ্ছে মহামহিমান্বিত বা সম্মানিত রাত বা রজনী। সূরা আদ দোখানে ‘কদর’ এর স্থলে ‘মুবারাকা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ বরকতপূর্ণ বা সম্মানিত।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই এ মর্যাদাপূর্ণ রাতেই (লাইলাতুল কদর : ১) আমি এটি (আল কুরআন) অবতীর্ণ করেছি’ (সূরা আল কদর :

১)। আরো বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি একে (আল কুরআনকে) এক বরকতময় রাতে (লাইলাতিম মুবারাকাতে) নাজিল করেছি’ (সূরা আদ দোখান :

৩)। দ্বিতীয়ত; এ রাতের মর্যাদার কারণ হচ্ছে, ‘এ মর্যাদাপূর্ণ রাতটি (লাইলাতুল কদর) হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’ (সূরা আল কদর :

৩), আরো বলা হয়েছে, এ রাতেই (লাইলাতিম মুবারাকাতে) প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত বা নির্ধারিত হয় অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। তৃতীয়ত; এ রাতের মর্যাদার কারণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার আরো ঘোষণা হচ্ছে, ‘এ রাতে (লাইলাতুল কদরে) ফেরেশতা ও তাদের সর্দার ‘রূহ’ (বা জিবরাইল আ:) আল্লাহ তায়ালার সব ধরনের আদেশ নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন’ (সূরা আল কদর :

৪), আরো বলা হয়েছে, আমারই আদেশক্রমে কর্মসম্পাদনের জন্য আমি নিঃসন্দেহে (এ রাতে) আমার দূত (ফেরেশতা) পাঠিয়ে থাকি’ (সূরা আদ দোখান :

৫)। এ রাতের মর্যাদার চতুর্থ কারণ হচ্ছে, ‘ফেরেশতাগণ আল্লাহ তায়ালার যে আদেশ বার্তাটি নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন, তা হচ্ছে চিরন্তন প্রশান্তির বার্তা, যা সূর্য উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে’ (সূরা আল কদর :

৫)। মূলত আল কুরআন নাজিলের কারণেই রমাদানে লাইলাতুল কদর আল্লাহ তায়ালা আমাদের দান করেছেন। তা ছাড়া হজরত ইবনে আবি হাতেম রা: বলেন, রাসূল সা: একবার জনৈক বনি-ইসরাইলি মুজাহিদ সম্পর্কে বললেন, যে এক হাজার মাস পর্যন্ত অবিরাম জিহাদে ছিলেন কখনো অস্ত্র সংবরণ করেননি।

মুসলমানগণ এ কথা শুনে বিস্মিত হলে আল্লাহ তায়ালা সূরা কদর নাজিল করেন। ইবনে জারির রা: বলেন, বনি-ইসরাইলি এক ব্যক্তি পুরো রাত ইবাদত ও দিনের বেলায় জিহাদে লিপ্ত থেকে এভাবে এক হাজার মাস কাটিয়ে দিলেন। এ ঘটনা শুনে সাহাবাগণ আফসোস করে বললেন, আমরা কিভাবে তাদের সমক হতে পারি! এরই পরিপ্রেেিত সূরা কদর নাজিল হয়।

‘হজরত আবু হুরায়রাহ রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদর এ আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে জাগরণ করে, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মা করে দেন’ (বুখারি-১১৬৪ ও তিরমিজি-৬৩৫)।

লাইলাতুল কদরের কারণ

(১) মানুষের হেদায়াতের জন্য সত্য দ্বীনসহকারে ও হক-বাতিলের মানদণ্ড হিসেবে রমাদান মাসের লাইলাতুল কদরে আল কুরআন নাজিল করা হয়েছে,

(২) লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম অর্থাৎ মানুষ তার সারা জীবন যে নেক আমল করতে পারে, সে ইচ্ছা করলে এক লাইলাতুল কদরে তার চেয়েও বেশি নেক আমল করতে পারে,

(৩) এ রাতে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতাগণ আল্লাহ তায়ালার সব রকমের আদেশ-নিষেধ, রহমত-বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে জমিনে বিচরণ করে,

(৪) আল্লাহ তায়ালার রহমতের ফেরেশতাগণ ফজর পর্যন্ত তাঁর বান্দাদের সব রকমের সুসংবাদ দিতে থাকেন অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য, হায়াত-মউত, রিজিক ইত্যাদি নির্ধারিত করা হয় এ রাতে ও

(৫) লাইলাতুল কদরে আল্লাহ তায়ালা তাঁর আবেদ বান্দার অতীতের সব গুনাহ মা করে দেন।

কখন লাইলাতুল কদর পালন করব :

আবুল্লাহ ইবনে ওমর রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, তোমরা লাইলাতুল কদর রমাদান মাসের শেষ সাত দিবসের রজনীতে তালাশ করো (বুখারি ১১৬৫, মুসলিম ২৬৩০ ও ২৬৩১)।

হজরত আবু সালামাহ রা: হজরত আবু সাঈদ রা: থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা রমাদান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতে কদর তালাশ করো (বুখারি ১১৬৬)। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত বুখারি ১১৬৭, তিরমিজি ৭৪০ ও মুসলিম ২৬৩২ ও ২৬৩৩ নম্বর হাদিসে একই কথা বলা হয়েছে।

আল কুরআন ও হাদিসে লাইলাতুল কদর ব্যতীত আর কোনো রাতের এত গুরুত্ব দেয়া হয়নি। রাসূল সা: বলেছেন, দুনিয়া শুরু থেকে এ পর্যন্ত সব পয়গম্বরের প্রতি যত কিতাব নাজিল হয়েছে, তা সবই রমাদান মাসের বিভিন্ন তারিখে নাজিল হয়েছে। হজরত কাতাদাহ রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, হজরত ইব্রাহিম আ:-এর ওপর সহিফা রমাদানের প্রথম তারিখ অবতীর্ণ হয়, হজরত মুসা আ:-এর ওপর তাওরাত রমাদানের ৬ তারিখ অবতীর্ণ হয়, হজরত দাউদ আ:-এর ওপর যাবুর রমাদানের ১২ তারিখ অবতীর্ণ হয়, হজরত ঈসা আ:-এর ওপর ইঞ্জিল রমাদান মাসের ১৮ তারিখ অবতীর্ণ হয়, আর মহাগ্রন্থ আল কুরআন রমাদান মাসের ২৪ তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৫ রমাদানে অবতীর্ণ হয়’ (কুরতুবি)।

হজরত আবু জর গিফারি রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, হজরত ইব্রাহিম আ:-এর ওপর অবতীর্ণ সহিফাগুলো ৩ রমাদান অবতীর্ণ হয়। হজরত মুসা আ:-এর ওপর তাওরাত ৬ রমাদানে অবতীর্ণ হয়। হজরত ঈসা আ:-এর ওপর ইঞ্জিল ১৩ রমাদানে অবতীর্ণ হয়। হজরত দাউদ আ:-এর ওপর জাবুর অবতীর্ণ হয় ১৮ রমাদান আর মহাগ্রন্থ আল কুরআন অবতীর্ণ হয় ২০ রমাদান রাতে’ (মাজহারি)।

হাদিস দু’টিতে ঐশী গ্রন্থ নাজিলের তারিখ সামান্য হেরফের হলেও রমাদান মাসে নাজিল হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কুরআন নাজিলের কারণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমাদান মাসই হলো সেই মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়াত ও সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী, (সূরা বাকারা : ১৮৫)।

আদেশ-নিষেধসংবলিত কুরআনে বলা হয়েছে, ‘(হে নবী!) যে কিতার (আল কুরআন) আপনার ওপর নাজিল করা হয়েছে, আপনি তা থেকে তিলওয়াত করুন এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করুন, নিঃসন্দেহে সালাত মানুষকে সব ধরনের অশ্লীলতা ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, মূলত আল্লাহ তায়ালাকে সর্বদা স্মরণ করার জন্য সালাত একটি উত্তম ও সহজ মাধ্যম, (হে মানুষ!) তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তায়ালা তা সম্যক অবগত আছেন’ (সূরা আন কাবুত : ৪৫)। ওই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কুরআন তিলওয়াত বা অধ্যয়ন (অর্থ ব্যখ্যা ও নাজিল হওয়ার কারণসহ বুঝে পাঠ) করা ও সালাত কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর এ নির্দেশ মানা ফরজ। সাথে সাথে সালাতের ফজিলত ও বয়ান করেছেন যে, ‘নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে সব ধরনের অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে’। সালাতের এ ফজিলত পেতে হলে আমাদের সালাতের হাকিকত জানতে হবে। ওই আয়াতে সালাতের সে হাকিকত সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সালাতে আমরা কুরআন থেকে যা পাঠ করি বা শুনি, তা মেনে নিয়ে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে জীবনযাপন করলেই আমরা সব ধরনের অশ্লীলতা ও খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে পারব ইনশাআল্লাহ।

মানুষ সৎ হবে না অসৎ হবে তা নির্ভর করে শুধু সে মানুষের আল্লাহভীতি বা তাকওয়াহর ওপর আর এ আল্লাহভীতি বা তাকওয়াহ পয়দা করবে সিয়াম। অতএব, সালাতের ফজিলত পেতে হলে যে আল্লাহভীতি বা তাকওয়াহ প্রয়োজন তা আমরা সিয়াম পালনের মাধ্যমে অর্জন করে থাকি আর সিয়ামের পূর্ণতার জন্য যে অশ্লীলতা পরিহার করা দরকার, তা সালাতের মাধ্যমে আমরা অর্জন করে থাকি।

সিয়াম সালাত আর কদর মূলত আল কুরআনেরই মর্যাদা বৃদ্ধি করে। এতেকাফ রমজান মাসের একটি গুরুত্ব পূর্ণ আমল, রাসূল সা: রমজান মাসের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। হজরত আয়েশা রা: বলেন, যখন রমাদানের শেষ ১০ দিন আগমন করত, রাসূল সা: পরিধানের কাপড় মজবুত করে বাঁধতেন, রাত জাগতেন ও পরিবারের লোকদেরও জাগাতেন’ (বুখারি ১১৭৩)। রাসূল সা: কখনো ঘরে আর কখনো মসজিদে এতেকাফ করতেন। রাসূল সা: তাঁর ওফাতের বছর ২০ দিন এতেকাফ করেছেন (বুখারি ১১৮০)। হজরত আয়েশা রা: বলেন, রাসূল সা: যখন এতেকাফের ইচ্ছা করতেন, তখন ফজরের সালাতের পর এতেকাফের স্থানে প্রবেশ করতেন (তিরমিজি ৭৩৯)।

লেখক : গাজী মুহাম্মদ শওকত আলী – মানবাধিকার কর্মী

Category: রোজা