ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

সওয়াব অর্জনের মওসুম

মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে পৃথিবীতে তাঁর খলিফা তথা প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করলেন। উদ্দেশ্য মানবজাতি এই ধরাতে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করবে। আল্লাহর প্রিয় মাখলুক তথা আশরাফুল মাখলুকাত (মানুষ) দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনে সঠিক পথ থেকে দূরে না যায় সেজন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী রাসূল পাঠিয়েছেন, যাতে তাঁরা মানবজাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে পারেন।

যারা তাঁদের দাওয়াত গ্রহণ করেছেন তারা হলেন উম্মতে ইজবা তথা মুসলিম। যারা মুসলিম তারাই মুমিন, নবী রাসূলদের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী ও রাসূল হলেন আমাদের পিয়ারা নবীজী হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সা:। তিনি আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থা উপহার দিলেন তার নাম ইসলাম।

ইসলাম ধর্মের রুকন তথা ভিত্তি পাঁচটি। তার মধ্যে অন্যতম ভিত্তি হলো মাহে রমজানের ফরজ রোজা। চান্দ্র মাসের নবম মাস রমজান। সব মাসের সেরা মাস হলো রমজান। অন্য কোনো মাসের সাথে এ মাসের তুলনা হয় না। রমজান ফারসি শব্দ। এর আরবি প্রতিশব্দ রামাদান। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এই মাসটিকে রমজান হিসেবেই সবাই জানেন। শব্দটি রামজ ধাতু থেকে নির্গত। অর্থ হলো পুড়িয়ে ফেলা, জ্বালিয়ে দেয়া ইত্যাদি। যেহেতু এই মাসে রোজা রাখলে গুনাহ ক্ষমা করা হয়, গুনাহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়, তাই এর নাম রামাদান।

রমজান মাস তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত এবং তৃতীয় ১০ দিনকে নাজাতের সময় বলা হয়। এই মাসটিতে উম্মতে মুহাম্মদীর পুণ্য অর্জন এবং গুনাহ ক্ষমা করাইয়া নেয়ার অপূর্ব সুযোগ। প্রতিটি কাজেরই একটা মওসুম বা ঋতু থাকে। আর অনেক কাজ বা পুণ্য অর্জনের অন্যতম মওসুম হলো রমজান মাস। সঙ্গত কারণেই প্রতিটি মুসলিম নর-নারী এই মাসটির জন্য ১১ মাস অপেক্ষায় থাকেন। তাই তো রাসূলে আকরাম সা: রজব মাস এলে দোয়া করতেন ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবানের বরকত আমাদের দান করো এবং রমজান পাওয়ার তাওফিক দাও।’

শুধু মানবজাতি নয়, গোটা সৃষ্টি জগতই রমজানের জন্য অপেক্ষায় থাকে। তাই তো দেখা যায়, মাহে রমজান শুরু হলে প্রকৃতি যেন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। রোজাদারের হৃদয়ে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। জান্নাতি বাতাস প্রতিটি মুমিন মুসলমানের ঘরে প্রবাহিত হয়। রোজা একটি ফরজ ইবাদত। শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া রোজা পরিত্যাগ করলে কবিরা গুনাহ হবে। তবে কোনো মুসলমান একে অস্বীকার করলে বা বিদ্রƒপ করলে কাফির হয়ে যাবে। সে আর মুসলমান হিসেবে গণ্য হবে না।

রমজানের সাথে রোজা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রোজা ছাড়া রমজানের ফজিলত আশাই করা যায় না। রোজা ফারসি শব্দ। আরবি ভাষায় এর প্রতি শব্দ সাওম। শব্দটি একবচন, বহুবচনে সিয়াম। অর্থ বিরত থাকা, কঠোর সাধনা করা, অবিরাম প্রচেষ্টা, আত্মসংযম ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়াতের পরিভাষায় সাওম বা রোজা হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ হতে বিরত থাকা।

রাসূলে আকরাম সা:-এর হাদিস অনুযায়ী দেখা যায়, সাওম বা রোজা সর্বমোট ছয় প্রকার। যথা ফরজ রোজা যেমন- রমজান মাসের রোজা, ওয়াজিব রোজা, যেমন মানতের রোজা, সুন্নাত রোজা, যেমন- জুমআর দিন, আশুরা, শবেবরাত, শবেমিরাজ ইত্যাদির রোজা রাখা। নফল রোজা নিষিদ্ধ পাঁচ দিন ব্যতীত আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখা, মাকরুহ রোজা যেমন অনবরত রোজা রাখা। হারাম রোজা যেমন বছরে নিষিদ্ধ পাঁচদিন রোজা রাখা।

রমজানের রোজা কেন ফরজ করা হয়েছে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো বা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)

আলোচ্য আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া। তাকওয়া আরবি শব্দ। শব্দটির অর্থ হলো ভয় করা। ইসলামি শরিয়াতের পরিভাষায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সব আদেশ মানা ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকাকে তাকওয়া বলে। রাসূলে আকরাম সা: এরশাদ করেন, ‘রোজাদারের জন্য রয়েছে দু’টি আনন্দ। একটি হলো ইফতারের সময় এবং অন্যটি হলো আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। আল্লাহর কাছে রোজাদারের মুখের গন্ধ মেশক আম্বরের সুঘ্রাণের চেয়েও উত্তম।’ (বোখারি, মুসলিম)

সত্যিকারভাবেই ইফতারির পূর্বক্ষণে বান্দাহ এমন এক অজানা আনন্দে পুলকিত হয়। সারা দিনের ুধা পিপাসার কথা ভুলে যায়। পারিবারিকভাবে হোক কিংবা সামাজিকভাবে হোক ইফতারসামগ্রী সামনে নিয়ে যখন বসা হয়, তখন রোজাদারেরা অপেক্ষমাণ থাকে কখন মাগরিবের আজান হবে। যখনই আজানের সুর ভেসে আসে, তখনই ইফতার শুরু হয়ে যায়। এ এক অনাবিল আনন্দ, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অপর আনন্দটি হলো আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ। তার জন্যই তো কঠোর সাধনা করে রোজা রাখা হয়।

রাসূলে আকরাম সা: এরশাদ করেন, বেহেশতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। রোজাদার ছাড়া আর কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বোখারি, মুসলিম) মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য রোজা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালা রোজা শুধু উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ফরজ করেননি, অতীতের সব নবীর উম্মতের জন্যও রোজা ফরজ ছিল। অর্থাৎ রোজা রেখে মানুষ সুস্থ থাকবে, আর সুস্থ শরীর নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে। আমার যা খাই পাকস্থলীর মাধ্যমে পারিপাক হয়ে শরীরের যে অংশে যা যা প্রয়োজন তা সেই অংশে চলে যায় এবং বাকি অংশ বর্জ্য আকারে বের হয়ে যায়। একটি যন্ত্র অনবরত চলতে থাকলে নষ্ট হয়ে যায় বা অল্প সময়ে বিকল হয়ে যায়। যারা রোজা রাখেন তাদের শরীরের পরিপাকযন্ত্র কিছু সময়ের জন্য বিশ্রামে থাকে, ফলে রোজাদার কঠিন রোগব্যাধি থেকে রক্ষা পায়।

রাসূলে আকরাম সা: এরশাদ করেন, তোমরা রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে। হাদিসটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, বিজ্ঞান এই হাদিসের বার্তার কাছে নতি স্বীকার করেছে। প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে রাসূলে আকরাম সা:-এর মুখনিঃসৃত পবিত্র এই বাণীটুকু আজ বিজ্ঞানের কাছে অপার বিস্ময়। কারণ এ পর্যন্ত রোজার মাধ্যমে অনেক রোগের প্রতিকারের রহস্য আবিষ্কৃত হয়েছে। মূলত ইসলামি শরিয়ার প্রতিটি বিধি-বিধানের মধ্যে রয়েছে মানবতার অপার কল্যাণ, যা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত।

রোজা কম খাওয়ার অন্যতম ট্রেনিং। রোজার মাধ্যমে ুধার্ত এবং পিপাসার্ত মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও বোঝা যায়। বর্তমানে কিছু রোজাদার এমন আছেন, যারা ইফতারের পর থেকে সেহরির পূর্ব পর্যন্ত রকমারি সুস্বাদু খাবার খেতেই থাকেন। যা রোজার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। রোজাদার সর্বক্ষেত্রে সংযমী হবে। খাবার খেতেও সংযমী হতে হবে।

রোজা ইসলাম ধর্মের এক বৈজ্ঞানি বিধান। এর ফজিলত অপরিসীম। এই ফজিলত অর্জন করতে হলে দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রোজার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রথমেই অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। রাসূলে আকরাম সা: এরশাদ করেন, ‘হুঁশিয়ার! শরীরের মধ্যে এক টুকরা গোশত এমন আছে যা ঠিক ও সংশোধিত হলে গোটা শরীর ঠিক ও সংশোধিত থাকে এবং খারাপ হলে গোটা শরীর খারাপ হয়ে যায়। হুঁশিয়ার, সেটি হলো অন্তর। ( বোখারি, মুসলিম)

সুতরাং অন্তরকে শিরক, হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা, ঘৃণা, ধোঁকাবাজি ইত্যাদি গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখতে পারলেই অন্তরের রোজা হয়ে যাবে। পেটের রোজা হলো হালাল খাবার অর্থাৎ পেটকে হারাম খাদ্য ও পানীয় থেকে বাঁচাতে হবে। সুতরাং, সুদ, ঘুষ, জুয়া, হারাম জিনিসের ব্যবসায়-বাণিজ্য, চোরকারবারি, মজুদদারি, ওজনে কম দেয়া, ভেজাল মেশানো, চুরি, ডাকাতি, জুলুম, নির্যাতন ও ছিনতাই ইত্যাদির মাধ্যমে উপার্জিত খাবার দ্বারা রোজা রাখলে ওই ব্যক্তির রোজা আল্লাহর দরবারে কখনো কবুল হবে না।

আফসোসের বিষয় হলো উল্লিখিত ইসলাম ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপই আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে। তাই তো দেখা যায়, রমজান আসার আগেই সব জিনিসের দাম হু হু করে বেড়ে যায়, যা রোজার শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ কারণেই রাসূলে আকরাম সা: এরশাদ করেন, বহু রোজাদার রোজার মাধ্যমে ুধা ও পিপাসা ছাড়া আর কিছুই লাভ করে না এবং রাতের বহু নামাজী রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই পায় না। (ইবনে মাজাহ)

জিহ্বার রোযা হলো- মিথ্যা, অশ্লীল ও খারাপ কথা থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখতে হবে। জিহ্বা হলো মানুষের কথা বলার বাহন। এটি আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত। সুতরাং এই জিহ্বা দ্বারা সব সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। কারণ পরকালে মানুষের মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ ও বাক্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

রাসূলে আকরাম সা: এরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ ত্যাগ করে না তার খানাপিনা বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বোখারি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি রোজা রাখার পরও মিথ্যা কথা বর্জন করল না, তার রোজা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কান শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। কানের রোজা হলো গান-বাজনা না শোনা; বরং কুরআন তিলাওয়াত ও ভালো ভালো কথা শুনা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন‘তারা যখন বেহুদা কথা শোনে তখন তারা তা এড়িয়ে যায়।’ (সূরা : আল-কিসাস-৫৫)

চোখ শরীরের অন্যতম অঙ্গ। এর ভেতরে আল্লাহ তায়ালা এমন দৃষ্টি সৃষ্টি করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার সব কিছু দেখতে পায়। চোখ কত বড় নেয়ামত অন্ধের দিকে তাকালেই তা অনুভব করা যায়। সুতরাং চোখের রোজা হলো- হারাম, অশ্লীল কাজ থেকে চোখের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখা। বরং আল্লাহর এই নেয়ামত চোখ দ্বারা সব সময় ভালো কাজের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। রমজান মাসে চোখকে যদি সংযত রাখা যায়। আশা করা যায় যে, বাকি ১১ মাসে এই অনুশীলন বা প্রশিক্ষণ কাজে লাগবে।

রমজান মাস মহিমান্বিত মাস। এই মাসেই আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন নাজিল হয়েছে; যা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত অটুট ও অক্ষয় রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এই মাসেই রয়েছে পবিত্র লাইলাতুল-কদর, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। এই রজনীর ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে বেশি। এখানে হাজার মাস বলতে আধিক্য বুঝানো হয়েছে। যার সীমা-পরিসীমা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।

রমজান মুসলমানদের বিজয়ের মাস। জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য রমজান মাসেই শপথ নিতে হবে। যাবতীয় অনাচার থেকে পূতপবিত্র থাকার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালানো একান্ত প্রয়োজন। দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতে মুক্তির জন্য মাহে রমজানের শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। আমরা রোজা রাখব রোজার হক আদায় করে। তাহলে এই রোজাই আমাদের বিনা হিসাবে জান্নাতে পৌঁছে দেবে।

লেখক : মাওলানা মুহাম্মদ বশির উল্লাহ ভাইস প্রিন্সিপাল, মাতুয়াইল ইসলামিয়া মাদরাসা

Category: রোজা