ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

সমাজ গঠনে সিয়াম-সাধনা

বিশ্বের সব জাতি যখন তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধনে ব্যস্ত, তখন আমাদের সমাজে কী দেখছি? আমরা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য জাতীয় স্বার্থের মূলে কুঠারাঘাত করছি। আমরা পরস্পর সামান্য ব্যাপারে দ্বন্দ্ব ও কলহে লিপ্ত হচ্ছি। খুন, সন্ত্রাস, ঘুষ, কালোবাজার, চোরাকারবার ও পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষক্রিয়া সঞ্চারিত করছে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারছে না, কে কখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, কার কখন ছিনতাই হবে, কে কখন হাইজ্যাকারের কবলে পড়বে, রাহাজানি ও ডাকাতির, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হবে তার নিশ্চয়তা নেই। সমাজ থেকে মূল্যবোধ ও মানবতাবোধ আজ নির্বাসিত।

সমাজের এ অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বাঁচার কোনো উপায়ই কী নেই? আমরা কি চিন্তা করে দেখেছি সমাজের এ নৈরাশ্যজনক নৈরাজ্যের মূল কারণ কী? সমাজের এ দুষ্ট গ্যাংগ্রিন দূর করে কি মানুষের জন্য সুস্থ সমাজ ও সুশীল সমাজ গঠন করা যায় না? মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত আল-কুরআনের প্রদর্শিত জীবনবোধ এবং মহানবীর (সা.) প্রদর্শিত সহজ-সরল নিশ্চিত সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত ও পদস্খলিত।

মহাগ্রস্থ আল-কুরআনে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি জাগতিক কাজের সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত নিখুঁত নির্দেশিকা মানুষের জীবন উপযোগী করে বলে দেয়া হয়েছে। পাপ-পুণ্য, হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ, নৈতিক-অনৈতিক, মায়া-মমতা, সাম্য-ভ্রাতৃত্ব, শান্তি-শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, মানবতা ও মূল্যবোধ ইত্যাদির সঠিক অনুশীলন ও প্রায়োগিক কৌশল আল-কুরআন এবং আল-হাদিসে বিশদভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। বস্তুত অপরাধ প্রবণতার অন্যতম মূল্য উত্স মানুষের সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে নিহিত আর সে বোধ মানুষের অভ্যন্তরীণ অপরাধ প্রবণতার মানসিক প্রবৃত্তিজাত।

ইসলামী বিধান মানেই শান্তির বিধান, আল্লাহ্র হুকুমতে আত্মসমর্পণের বিধান। এ বিধানে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। জনকল্যাণ, জননিরাপত্তা, মানব মর্যাদা সেখানে পূর্ণ স্বীকৃত। এ বিধানে বান্দার তাকওয়ার প্রতি অগ্রাকাির দেয়া হয়েছে। আর তাকওয়ার সর্ববিধ আয়োজন শিক্ষা ও জ্ঞাননির্ভর। মানবাধিকার, ইনসানিয়াত ও হারাম-হালাল, সীমিত সংযত জীবন-যাপনই তাকওয়ার মূল উদ্দেশ্য। মানুষের অহঙ্কার, আত্মাভিমান সে বিধানে নিষিদ্ধ। চরিত্র গঠন ও নৈতিকতা বজায় রাখাই বিধিসম্মত। শিষ্টের পালন, অশিষ্টের দমন; ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিলোপ সাধন; হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ধারণ করে সত্য প্রতিষ্ঠা এবং অসত্যের বিনাশ সাধন এ বিধানের অন্যতম অমোঘ উপাদান।

ছোট-বড়, উঁচু-নিচু, সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এ বিধানে নেই। সমাজের অক্ষম, অসহায় এতিমদের সাহায্য করা, দুঃখী ও মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করা, সহনশীলতা, বিনয়-নম্রতা, ধৈয্য ও শিষ্টাচারের অনুশীলন এ নীতির আদর্শ। পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য, সংহতি ও শৃঙ্খলাবোধ, অত্যাচার, জুলুম এবং দুর্নীতির মূলোত্পাটন করে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এ সমাজের বিধানের অবশ্য কর্তব্য। মিথ্যাচার, পরচর্চা, গীবত, চুরি, মজুতদারী, কালোবাজারি, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, ব্যভিচার ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন এ জীবনধারার অন্যতম অবশ্য পালনীয় বিধান। বান্দা নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে; আমানত খেয়ানত করবে না ও ওয়াদা খেলাফ করবে না। অর্থনীতি ও সমাজ জীবনে সবার সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। স্বদেশ ও বিশ্বমাবতার কল্য্যাণে জ্ঞান, বিদ্যা-বুদ্ধি, মেধা ও শক্তি ব্যয় করবে। বিশ্বাসঘাতকতা পরিহার করবে, হাতে, মুখে, কাজে ও আচরণে অপরকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকবে।

মহানবী (সা.) যুগ যুগ ধরে বিবাদ-কলহে লিপ্ত, গোত্রে গোত্রে বিভক্ত, পরস্পর যুদ্ধরত অজ্ঞ বেদুঈনদের অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধান দিয়েছিলেন। তিনি এক দুর্ধর্ষ উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে সুসংহত, সুশৃঙ্খল, কর্মমুখী, সত্, সুখী এক আদর্শ জাতিতে পরিবর্তিত করেছিলেন। তাঁর স্বীয় জীবনের আদর্শ, নীতি, আচরণ, ভূমিকা, কর্ম ও ত্যাগের মহিমায় এবং সর্বোত্তম নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি এ কাজে সমর্থ হয়েছিলেন। আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ও মহানবী (সা.) প্রদর্শিত পথই মানবতার মুক্তির একমাত্র উপায়। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা ঈড়সঢ়ষবঃব পড়ফব ড়ভ ষরভব প্রদান করে এবং তাঁর প্রেরিত রাসূলের (সা.) তা জীবনে বাস্তবায়িত করে তাই দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। এর বাস্তবায়নেই সুশীল সমাজ গঠনের সাফল্য নিহিত।

আল-কুরআনুল করিমে বিধৃত এবং আল-হাদিসে বিবৃত মুমিন ও মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় বিধানগুলোর মধ্যে সিয়াম সাধনা অন্যতম। এর মধ্যে আমাদের বর্তমান সমাজের যাবতীয় গলদ দূর করে ভবিষ্যত্ সুশীল সমাজ গঠনের যে সব উপাদান রয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

ইসলামে ইবাদতকে দু’ভাগে করা হয়েছে : হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ, অর্থাত্ আল্লাহর হক এবং সৃষ্টি বা বান্দার হক। উভয় ক্ষেত্রেই ঈমান বা বিশ্বাস ও তাক্ওয়া বা নিষ্ঠা অপরিহার্য। নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি-প্রলয়ের কর্তা, সর্বগুণের আধার এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তাঁর কল্যাণকর ব্যবস্থাপনায় তাঁর বাণীবাহক নবী-রাসূল, তাঁর আজ্ঞাবহ ফেরেশতা, তাঁর হুকুম ও বিধি-ব্যবস্থা সম্বলিত কিতাব এবং মানুষের ভালো-মন্দ কাজের হিসাবের পর যথা প্রাপ্য ফল ভোগ—এসবের প্রতি আস্থা স্থাপন মুমিনের ঈমান বা বিশ্বাসের প্রধান অঙ্গ। ঈমানের সঙ্গে সর্বগুণের আধার প্রতিপালক প্রভুর কাছে আত্মনিবেদনের পর তাঁর গুণাবলী অর্জন করে তাঁর বৈশিষ্ট্য লাভের চেষ্টায় প্রয়াসী হলে আল্লাহর হক আদায় বা আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালন করা হয়। আর সৃষ্ট জীবের প্রতি, মানুষের প্রতি ন্যায় ও সদয় ব্যবহার করলে, মানুষের মঙ্গলের জন্য সচেষ্ট হলে তাদের প্রতি কর্তব্য বা হক্কুল ইবাদ আদায় হয়।

ইসলাম যে পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার দুটি—সালাত ও সিয়াম হলো হক্কুল্লাহ। আর জাকাত ও সাদকা প্রদান এবং হজ্জব্রত পালন—এ দুটি হলো হক্কুল ইবাদ। বাকি একটি অর্থাত্ কলেমা, সালাত, সিয়াম, জাকাত ও হজ্জ—এ চারটি তার পরিপূরক ও পরিপোষক। তার মানে বান্দা প্রথমে বিশ্বাস করবে, ঈমান আনবে, তারপর বাকি চারটির অনুশীলন বা আমল করবে। আপনি যদি বিশ্বাসই না করেন, ঈমানই না আনেন, তবে এসব করা-না করার নির্দেশ আপনার ওপর বর্তায় না।

আর যদি তওহিদে ঈমান আনেন, মেনে নেন যে আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয় এবং তাঁর হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধান অবশ্য পালনীয়, তাহলে হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদে বিবৃত পালনীয় চারটি ‘আমালি’ বৈশিষ্ট্য আপনার জন্য অবশ্য করণীয় হয়ে পড়ে। ঈমান আনার পর এ চারটিও ঈমানেরই অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়। এগুলোকে আলাদা করে চিন্তা করা যায় না। এগুলোর প্রত্যেকটিই ঈমানের অঙ্গ, আবার প্রত্যেকটিই একটি অপরটির সহগামী ও সম্পূরক। আর সামগ্রিকভাবে এ পাঁচটি অংশ পালনের একমাত্র উদ্দেশ্য মুত্তাকি হওয়া। কেননা মুত্তাকি হওয়া মুমিন ও মুসলিম হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।

স্রষ্টা ও প্রতিপালকের প্রতি সৃষ্টির হক অর্থাত্ হক্কুল্লাহ আদায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই সালাত ও সিয়াম অবশ্য পালনীয় বা ‘ফরজ’রূপে স্বীকৃত হয়েছে। আর কুরআনে ‘আকিমিস সালাতা’ বলে সালাত প্রতিষ্ঠার জন্য বহুবার তাকিদ দেয়া হয়েছে। কারণ সালাত মুত্তাকি হওয়ার পথে অবশ্য পালনীয় সহায়ক। জাগতিক জীবনে সালাত কি প্রয়োজন সাধন করে? না, সালাত মানুষকে মুত্তাকি ও মুমিন হওয়ার অর্থাত্ প্রকৃত সুমলিম তথা সত্যিকার মানুষ হওয়ার পথ পরিষ্কার করে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে : ‘ইন্নাস্ সালাতা তানহা আনিল ফাহশায়ে ওয়াল মুনকার’—সালাত নিশ্চয় অশ্লীলতা ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখে।

Category: রোজা