ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংযমের মাস

ইসলাম অর্থ শান্তি ও আত্মসমর্পণ। মহান স্রষ্টা, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির জন্য ইসলামী জীবনবিধান দান করেছেন তাদের শান্তির জন্য। কিন্তু এই শান্তি কখনোই লাভ করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ওই জীবনবিধানের কাছে নিজেকে সমর্পণ না করে। অর্থাত্ ইসলামের বিধানকে মানুষ যদি বাস্তব জীবনে অনুসরণ বা বাস্তবায়িত না করে।

শান্তির পথ অনুশীলনের এক শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো সিয়াম সাধনা। এই অনুশীলনের শিক্ষাকে অনুসরণ করতে হবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা পার্থিব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। আর তা করলেই শুধু জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানব জীবনে শান্তি আসতে পারে। আর এই শান্তি পেতে হলে মানুষ তথা সব সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে।

জানতে ও বুঝতে হবে যে, মহান স্রষ্টা এ পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। বলেছেন—তিনিই (মহান স্রষ্টা) তোমাদের (মানুষের) জন্য সবকিছু সৃষ্টি করেছেন আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন খলিফা বা স্থলাভিষিক্ত রূপে, পৃথিবীর সব কার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মানুষকে। তাই তো মানুষ হলো খলিফা। তারা পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবে মানবপ্রেম তথা সৃষ্টিপ্রেমের মাধ্যমে। বর্তমান ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ অশান্ত পৃথিবীর দিকে তাকালে কি মনে হয় যে খলিফারূপে মানুষ তার দায়িত্ব পালন করছে না বলেই পৃথিবীতে এত অশান্তি। এই অশান্তি প্রশান্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে যদি মানুষ মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত বিধানের কথা শুধু মুখে না বলে বাস্তব জীবনে তা রূপায়িত করে।

আর সেই পথ হলো সামাজিক জীবনে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহ, মমতা, সহনশীলতা ও ভালোবাসা। পারস্পরিক সম্প্রীতি, সংযম ও মানবতাবোধের গুণাবলি অর্জন এবং হিস্রতা ও পাশবিকতা বর্জন করার জন্যই মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সিয়াম সাধনা বা রমজানের মাস দিয়েছেন। তাই তো আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।’

এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। জগতে সবাই নিজেদের কোনো না কোনো ধর্মাবলম্বী বলে দাবি করে। সব ধর্মই ন্যায়, নীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও মানবপ্রেমরে কথা বলে। কোনো ধর্মই হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ, সন্ত্রাস, যুদ্ধ তথা অশান্তির শিক্ষা দেয় না। সব ধর্মই মানবপ্রেম, সৃষ্টিপ্রেম তথা শান্তির পথনির্দেশনা দেয়। তারপরও পৃথিবীতে সন্ত্রাস ও অশান্তি কেন? আসলে মুখে সবাই ধর্ম তথা মানবতার কথা বলে ঠিকই, কিন্তু অতি নগণ্যসংখ্যক ছাড়া বাকি সবাই বাস্তবে তা মানে না।

যদি পৃথিবীর সব মানুষ নিজ নিজ ধর্ম বাস্তব জীবনে রূপায়িত করত তাহলে এ পৃথিবীটা শান্তির নীড়ে পরিণত হতো। তাই তো পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন—‘তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা নিজেরাই কর না।’ বর্তমানে সারা বিশ্বে মানবসমাজের অধিকাংশই জটিল রোগে আক্রান্ত। সবাই বক্তৃতা বা উপদেশ দিতে সিদ্ধহস্ত, যদিও বক্তা বা উপদেশদাতার মধ্যে তার বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত।

কবি বলেছেন, মানুষের কষ্ট ও ব্যথা-বেদনা নিরসনের জন্যই মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে (এরই মাধ্যমে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে), না হলে মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য তো ফেরেশতারাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে তাকালে যে দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, তা বড়ই হৃদয়বিদারক।

দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে তথা সারা বিশ্বে কলহ-বিবাদ, দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে। সামান্যতম স্বার্থের জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করতে একটুও চিন্তা-ভাবনা করছে না। রঙের বৈপরীত্য, ধর্মের বৈপরীত্য, ভাষার ও মানসিকতার বৈপরীত্যের কারণে মানুষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে। একে অপরের সম্পদ ও সম্ভ্রম লুটে নিচ্ছে। অথচ মানবহৃদয়ে একটুও কম্পন বা কষ্ট অনুভূত হচ্ছে না।

ইরাক, লেবানন, চেচনিয়া ও ফিলিস্তিনসহ বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যে পৈশাচিকতার হোলি খেলা চলছে তা দেখে যার হৃদয়ে সামান্যতম মানবিক কম্পন মমত্ববোধ আছে তার হৃদয়ে যেন অশ্রু নির্গত না হয়ে পারে না। এমন হলো কেন? মানুষের প্রতি মানুষ এমন নির্দয়-নিষ্ঠুর আচরণ করছে কেন? আসলে এসব অমানুষিক ও অমানবিক চরিত্রের জন্য কলঙ্কজনক ঘটনা সংঘটিত হয় এবং হচ্ছে বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করার কারণে। অত্যাচারী, নির্দয় ও নিষ্ঠুর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি একটু ভেবে দেখে যে, আজ থেকে শতবর্ষ আগে তার বা তাদের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতে ছিল না, আবার এখন থেকে শতবর্ষ পরে তার বা তাদের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতে থাকবে না—এই বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করলে মানব মন থেকে অন্যায়, অবিচার ও পাপ-পঙ্কিলতার ভাব চিরতরে দূর হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

Category: রোজা