ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

সিয়াম বা রোজার উদ্দেশ্য

আল্লাহ তায়ালার প্রত্যেকটা ফরজ ইবাদতের বা হুকুমের পেছনে কিছু না কিছু উদ্দেশ্য নিহিত আছে। আরো আছে সে হুকুম মানার মধ্যে রহমত, বরকত, ফজিলত ও শিা। সিয়াম বা রোজা এমনই একটি ইবাদত, যা শুধু আল্লাহ ও বান্দার সাথে একান্তই সম্পর্কিত। আল্লাহকে যারা একান্ত ভয় করে চলে তারাই সিয়াম পালন করে। ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির পঞ্চম হচ্ছে ‘সিয়াম’ (বুখারি ও মুসলিম)। সিয়াম সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘হে ঈমান গ্রহণকারী লোকেরা! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)।

‘সিয়াম’ বা সওম এটি আরবি শব্দ ও কুরআনের একটি পরিভাষা। সাধারণত সিয়ামকে আমরা রোজা বলে জানি। রোজা এটি ফার্সি শব্দ। হাদিস বলছে, কুরআনের যেকোনো একটি শব্দ উচ্চারণ করলে ১০ নেকি পাওয়া যায়। অতএব, আমরা রোজার পরিবর্তে কুরআনে বর্ণিত সিয়াম শব্দ ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত মনে করি। সিয়াম শব্দের অর্থ হচ্ছে, কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা বা পরিত্যাগ করা। সিয়ামের জন্য নিয়ত করার পর হক বা ফরজ হচ্ছে সুবেহ সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ে খাদ্য, পানীয় ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকা। সিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘আশা করা যায় যে তোমরা তাকওয়াহ বা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারবে’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)।

আল্লাহ তায়ালা ঈমানের দাবিদারদের বারবার তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত হচ্ছে (১) কুরআন নাজিল হওয়া, (২) সিয়াম ফরজ হওয়া ও (৩) লাইলাতুল কদর দান করা। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘রমজান মাসই হলো সে মাস যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে, আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে ব্যক্তি অন্য সময় গণনা করে (এ দিনের সিয়াম) পূরণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য কাজকে সহজ করতে চান, কোনো কঠোরতা আরোপ করতে চান না, যাতে করে তোমরা গণনা করে (সে সিয়াম পালনের দিনগুলো) পূরণ করতে পারো এবং তোমাদের হেদায়াত দান করার দরুন আল্লাহ তায়ালার মহত্ত্ব বর্ণনা করো আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)।

রাসূল সা: বলেছেন, দুনিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব পয়গম্বরের প্রতি যত কিতাব নাজিল হয়েছে, তা সবই রমজান মাসের বিভিন্ন তারিখে নাজিল হয়েছে। হজরত কাতাদাহ রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, হজরত ইব্রাহিম আ:-এর ওপর সহিফা রমজানের প্রথম তারিখ অবতীর্ণ হয়, হজরত মুসা আ:-এর ওপর তাওরাত রমজানের ৬ তারিখ অবতীর্ণ হয়, হজরত দাউদ আ:-এর ওপর যবুর রমজানের ১২ তারিখ অবতীর্ণ হয়, হজরত ঈসা আ:-এর ওপর ইঞ্জিল রমজান মাসের ১৮ তারিখ অবতীর্ণ হয়, আর মহাগ্রন্থ আল কুরআন রমজান মাসের ২৪ তারিখ দিবাগত রাতে অবতীর্ণ হয়’ (কুরতুবি)।

হজরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, সিয়াম গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য ঢালস্বরূপ। সুতরাং সিয়াম পালনকারী অশ্লীল কথা বলবে না বা বর্বর আচরণ করবে না। কোনো লোক তার সাথে ঝগড়া করতে চাইলে বা গালাগাল করলে সে তাকে বলবে আমি সিয়াম পালনকারী। কথাটি দু’বার বলবে। রাসূল সা: বলেন, যাঁর করতলে আমার জীবন সে সত্তার কসম! সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরীর সুঘ্রাণ হতেও উত্তম। কেননা সিয়াম পালনকারী আমার আল্লাহর জন্য খাদ্য, পানীয় ও কামস্পৃহা বর্জন করে থাকে। তাই আল্লাহ বলেন, সিয়াম আমারই জন্য সুতরাং আমি বিশেষভাবে সিয়ামের পুরস্কার দেবো (বা আমি নিজেই সিয়ামের পুরস্কার)।’ লোকেদের প্রত্যেক কাজের পুরস্কার হচ্ছে ১০ গুণ পর্যন্ত, সিয়ামের পুরস্কার ১০ গুণ নয়, বরং তা আরো অধিক। যা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজেই দান করবেন (বুখারি-১১০৩)।

সিয়াম পালনকারীর জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা থাকবে, এ দরজা দিয়ে শুধু সিয়াম পালনকারীরা প্রবেশের পর তা বন্ধ করে দেয়া হবে যাতে করে আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে না পারে (বুখারি-১১০৪)। রমজান মাস শুরু হলে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় (বুখারি-১১০৬, মুসলিম-২৩৬৪)।

সিয়াম সম্পর্কে এমনই আরো অনেক ফজিলতের বর্ণনা বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সেহরি ও ইফতার সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর বিধান হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘আর তোমরা পানাহার করো (সেহরির জন্য) যতণ না রাতের কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার ভাবে দেখা যায়, আর সিয়াম পূর্ণ করো রাত (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)।

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত নিহিত রয়েছে (বুখারি-১১২১)। হজরত তাল্ক ইবনে আলী রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, তোমরা পানাহার করতে থাকো, ঊর্ধ্বগামী আলোকরশ্মি যেন তোমাদের ভীত না করে, লাল আভা প্রশস্তভাবে ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করতে পার (তিরমিজি-৬৫৫)। হজরত সামুরাহ ইবনে জুনদুব রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, বেলালের আজান যেন তোমাদের সেহরি খাওয়া থেকে বিরত না রাখে এবং সাদা রেখাও, যতণ পর্যন্ত না সাদা রেখার বিস্তৃতি প্রকাশ পায় (মুসলিম-২৪১৩)।

ইফতারের সুন্নাত তরিকা হচ্ছে, ‘আর তোমরা সিয়াম পূর্ণ করো রাত (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)। হজরত সাহল ইবনে সাদ রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, লোকেরা যত দিন তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে’ (তিরমিজি-৬৫১, বুখারি-১১৩৮)। হজরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা তাড়াতাড়ি ইফতার করে তারাই আমার বেশি প্রিয়। কিয়াম বা তারাবির ফজিলত : হজরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, রাসূল বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের রাতে ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় কিয়াম বা তারাবির সালাতে দাঁড়ায় তার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায় (বুখারি-১১৬২)।

হজরত সালমান ফারসি রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো ভালো কাজ বা নেক আমল স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টির সাথে করবে তার প্রতিদান ও সওয়াব এত হবে যতটা অন্যান্য মাসের ফরজ ইবাদতে হয়’ (মিশকাত শরিফ)। রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলত হচ্ছে লাইলাতুল কদর, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এ গ্রন্থটি (আল কুরআন) নাজিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে, (হে নবী!) আপনি কি জানেন এ মর্যাদাপূর্ণ রাতটি কী ? মর্যাদাপূর্ণ এ রাতটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, এ রাতে ফেরেশতা ও তাঁদের সর্দার ‘রূহ’ তাঁদের মালিকের সব ধরনের আদেশ ও বার্তা নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন, সে আদেশ বার্তাটি হচ্ছে চিরন্তন প্রশান্তি, তা ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত অব্যাহত থাকে’ (সূরা আল কদর)।

হজরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদর এ আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে জাগরণ করে, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মা করে দেন’ (বুখারি-১১৬৪ ও তিরমিজি-৬৩৫)। কুরআন ও হাদিসে লাইলাতুল কদর ব্যতীত আর কোনো রাতের এত গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যে রাতের মর্যাদা কমপে হাজার মাসের চেয়ে অর্থাৎ ৮৩ বছরেরও অধিক অথবা হাজার হাজার মাসের অধিক। ইতেকাফ রমজান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসূল সা: রমজান মাসে শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন। হজরত আয়েশা রা: বলেন, যখন রমজানের শেষ ১০ দিন আগমন করত, রাসূল সা: পরিধানের কাপড় মজবুত করে বাঁধতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারের লোকদেরকেও জাগাতেন (বুখারি-১১৭৭)।

রাসূল সা: কখনো ঘরে আর কখনো মসজিদে ইতেকাফ করতেন। কোনো কারণে রাসূল সা:-এর রামজান মাসের ইতেকাফ ছুটে গেলে তিনি শাওয়ালের ১০ দিন ইতেকাফ করেছেন (বুখারি-১১৭৮)। রাসূল সা: তাঁর ওফাতের বছর ২০ দিন ইতেকাফ করেছেন (বুখারি-১১৮০)। সিয়ামের সাথে সম্পর্কিত আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ঈদুল ফিতর বা সাদকাতুল ফিতর। ঈদ আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে আনন্দ, খুশি অথবা মুসলমানদের খুশির দিন। ফিতর আর একটি আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নিয়ম ভঙ্গ করা বা খোলা। সিয়াম ভঙ্গের দিনকে হাদিসের ভাষায় বলা হয় ইয়াওমাল ফিতর বা সিয়াম ভঙ্গের দিন অথবা ইয়াওমুল ঈদ বা আনন্দের দিন বা খুশির দিন অথবা ঈদুল ফিতর বা সিয়াম ভঙ্গের আনন্দের দিন।

আরবি সদাকাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দান, উদারতা, সদকাহ বা জাকাত। সদকাহ শব্দের অর্থ জাকাত ধরা হলে তা হবে বাধ্যতামূলক দান বা আদায়যোগ্য দান। আর সদকাহ শব্দের অর্থ দান খয়রাত ভিা, উদারতা বা সদকাহ ধরা হলে তা হবে স্বেচ্ছায় দান। অর্থাৎ জাকাত হচ্ছে বাধ্যতামূলক দান বা আদায়যোগ্য দান আর সদকাহ হচ্ছে স্বেচ্ছায় দান। তবে কেহ যদি কোনো কারণে সদকার নিয়ত করে তাহলে সে সদকাহ অবশ্যই আদায় করতেই হবে। এখানে ঈদুল ফিতর বা সাদাকাতুল ফিতর সম্পূর্ণ আলাদা। রমজান মাসের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর রাসূল সা: মক্কার অলিতে-গলিতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা করে দেন যে, সাবধান সাদকায়ে ফিতর প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, আজাদ গোলাম, ছোট-বড় সবার ওপর ওয়াজিব (তিরমিজি)।

হজরত ইবনে ওমর রা: বলেন, রাসূল সা: সাদাকায়ে ফিতর ফরজ বলেছেন এবং তা হলো প্রত্যেক নর-নারী, আজাদ গোলাম, ছোট-বড় সবার জন্য এক সা খেজুর বা এক সা যব আর এ হুকুমও দিয়েছেন যে, ঈদগাহে যাবার আগে সাদাকায়ে ফিতর পরিশোধ করে দিতে হবে। রমজান মাসের সিয়াম আমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের শিা দেয়। এ মাসে কিয়াম বা তারাবি ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার আইন বা বিধিবিধান জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়। মিথ্যা পরিত্যাগের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের শিা লাভ করা যায়।

অনাহারে বা অর্ধাহারে যারা জীবনযাপন করে তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। সিয়াম পালনের মাধ্যমে ধনী-গরিব একই সময়ে সেহরি ও ইফতার করার কারণে একই অনুভূতি সৃষ্টি হয়, যা অন্য সময় ধনী লোকেরা উপলব্ধি করতে বা ভাবতেও পারে না। গুনাহ মাফের সর্বোত্তম সুযোগ হচ্ছে সিয়ামের সাথে কিয়াম বা তারাবি ও লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর হচ্ছে একজনের সারা জীবনের নেকি অর্জনের চেয়েও বেশি নেকি অর্জনের সুযোগ। সবশেষে ঈদুল ফিতর এ সাদাকাতুল ফিতরের মাধ্যমে ধনী-গরিব সবাই নিজেদের নতুন পোশাকে সাজিয়ে, রঙ-বেরঙে নিজেদের রাঙিয়ে এক অনাবিল আনন্দ বয়ে আনে। সিয়ামের এ শিাকে বছরের বাকি মাসগুলোতে আমরা যদি কাজে লাগাতে পারি তাহলে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ লাভ করা সম্ভব হবে।

Category: রোজা