ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কিছু দোয়া

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হলো : এক. আবদিয়াতের পূর্ণতা। দুই. নবুয়তের ব্যাপকতা।
তার আবদিয়াতের প্রকাশ ঘটেছে দোয়ায়। আর নবুয়তের প্রকাশ ঘটেছে দাওয়াতে। সুতরাং উম্মত হিসেবে আমাদের অবশ্যকর্তব্য দোয়া ও দাওয়াতকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা। দোয়াতে এ বিশ্বাস রাখা জরুরি যে, আল্লাহ তায়ালা সর্বাবস্থায় দিতে পারেন এবং দেয়ার জন্য তার কাছে সব কিছু রয়েছে এবং এই একিনও রাখতে হবে, তার দরজা ছাড়া অন্য কোনো দরজা নেই এবং তিনি স্বয়ং দিতে চান।

বান্দা নিয়ে যত বেশি খুশি হয় আল্লাহ দিয়ে তার চেয়ে বেশি খুশি হন। আবার এ বিশ্বাস রাখতে হবে, মাখলুক সম্পূর্ণ অসহায়। সে আপাদমস্তক আল্লাহর মুখাপেক্ষী। সুতরাং মাখলুকের কাছে কিছুই চাওয়া যাবে না। এ বিশ্বাসও রাখতে হবে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মাখলুক এবং দুনিয়ার সব বস্তু, এমনকি তাদের শাহরগ থেকে ও অধিক নিকটবর্তী। তিনি সবার কথা শোনেন এবং প্রত্যেককে তার অবস্থায় সাহায্য করেন। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বঞ্চিত মানবতাকে দোয়ার সম্পদ দান করেছেন এবং আল্লাহর সঙ্গে তাদের তায়াল্লুক জুড়ে দিয়েছেন।

কোরআন ও হাদিসে বিভিন্ন দোয়া বর্ণিত হয়েছে। কিছু দোয়া আছে পার্থিব ও পরকালীন। কিছু আত্মিক ও শারীরিক। কিছু ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত নেয়ামত ও কল্যাণ চাওয়া হয়েছে। এগুলো ছাড়া আরও কিছু দোয়া রয়েছে যেগুলোর মধ্যে কোনো কল্যাণ ও নেয়ামত এবং কোনো ইতিবাচক প্রয়োজন ছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো অনিষ্ট থেকে এবং কোনো বিপদ-মুসিবত থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে এবং এ থেকে হেফাজত থাকার কথা বলা হয়েছে। কোরআন মজিদের শেষ দুই সুরায় আশ্রয় চাওয়ার জন্যই নাজিল করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
এক : (হে রাসুল) আপনি বলুন : আমি প্রভাতের প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় চাচ্ছি, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অপকারিতা থেকে; আর রাত যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তখন তার ক্ষতি থেকেও, গিরায় ফুঁ দানকারিণী নারীদের অনিষ্ট থেকে, আর হিংসুক যখন হিংসা করে তখন তার অপকারিতা থেকেও।—সুরা ফালাক (১১৩) : ১, ২, ৩, ৪, ৫।

দুই : (হে রাসুল) আপনি বলুন : আমি মানুষের প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় চাচ্ছি, যিনি মানবজাতির অধিপতি। যিনি মানবজাতির একমাত্র মাবুদ। আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণার অপকারিতা থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জিন ও মানবজাতির মধ্য থেকে।—সুরা নাস (১১৪) : ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬।

তিন : যখন আপনি কোরআন তেলাওয়াত করবেন, তখন আপনি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করবেন।—সুরা নাহল (১৬) : ৯৮

চার : হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার কাছে পানাহ চাই শয়তানের প্ররোচনা থেকে। হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার কাছে আরও আশ্রয় চাই তারা যেন আমার কাছে হাজির হতে না পারে।—সুরা মুমিন (২৩) : ৯৭, ৯৮

হাদিস শরিফে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন
এক : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আশ্রয় চাও বিপদের নির্মমতা থেকে, দুর্ভাগ্যে পেয়ে বসা থেকে, মন্দভাগ্য লিখন থেকে এবং শত্রুদের বিদ্রূপ থেকে।—সহিহ বুখারি হাদিস : ৬২৪২; সহিহ মুসলিম হাদিস : ৭৩৯২

দুই : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই পারস্পরিক প্রচণ্ড মতবিরোধ থেকে, মুনাফেকি ও মন্দ চরিত্র থেকে।—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৬

তিন : হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচটি জিনিস থেকে আশ্রয় চাইতেন—ভীরুতা, কৃপণতা, খারাপ জীবন, অভ্যন্তরীণ ফিতনা থেকে এবং কবরের আজাব থেকে।—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৯; সুনানে ইবনে মাযাহ, হাদিস : ৩৮৪৪

চার : হজরত যায়েদ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পানাহ চাই এমন ইলম থেকে যা উপকার করে না, এমন অন্তর থেকে যা বিনয়ী হয় না, এমন আত্মা থেকে যা পরিতৃপ্ত হয়না এবং এমন দোয়া থেকে যা কবুল হয়না ।—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২২

পাঁচ : হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার ক্রোধ থেকে তোমার সন্তুষ্টির আশ্রয় চাই, তোমার শাস্তি থেকে তোমার ক্ষমার আশ্রয় চাই, তোমার পাকড়াও থেকে তোমার আশ্রয় চাই। আমি তোমার প্রশংসা করে শেষ করতে পারব না। (কেবল এতটুকু বলতে পারি যে) তুমি তেমনই যেমন তুমি নিজের সম্পর্কে বলেছো।—জামে তিরমিযি, হাদিস নং : ৩৪৯৩; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ২৮৮৩

ছয় : হজরত শাকাল ইবনে হুমাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আমার কান, চক্ষু, অন্তর, জবান এবং বীর্যের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।’—জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৪৯২; সুনানে আবু দাউদ হাদিস : ১৫৪৬; আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬৬০
সাত : হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি—ধবল থেকে এবং মস্তিষ্ক বিকৃতি থেকে এবং কুষ্ঠরোগ থেকে এবং সব মন্দ রোগ থেকে।—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৯

আট : হজরত যিয়াদ ইবনে এয়লাকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই—যাবতীয় মন্দ চরিত্র, মন্দ কর্ম এবং মন্দ প্রবৃত্তি থেকে।’—জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৫৯১

নয় : হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নামের ফিতনা থেকে, জাহান্নামের আজাব থেকে এবং প্রাচুর্য ও দ্রারিদ্যের অনিষ্ট থেকে।’—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৩; জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৪৯৫

দশ : হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা থেকে, অকর্মণ্য হয়ে থাকা ও অলসতা থেকে, ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে। আরও আশ্রয় চাই ঋণের প্রবল চাপ ও মানুষের চাপ থেকে।’—জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৪৮৪; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬৭২

এগারো : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য ও স্বল্পতা থেকে আশ্রই চাই। আরও আশ্রয় চাই—জালেম হওয়া থেকে এবং মজলুম হওয়া থেকে।’—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৯; আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬৮৩

বারো : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চাই। কেননা তা খারাপ কল্পনা। আর আমি আশ্রয় চাই খেয়ানত থেকে। কেননা তা অভ্যন্তরীণ বীজ।’—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪২

তেরো : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার দেওয়া সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চলে যাওয়া এবং আপনার দেয়া আকস্মিক আজাব এবং আপনার অসন্তুষ্টি থেকে।’—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৩৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪০

চৌদ্দ : হজরত আবু ইউসর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় নিচ্ছি (আমার ওপর কোনো ইমারত অথবা দেয়াল) চাপা পড়া থেকে, কোনো উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া থেকে, পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে, আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকে, চরম বার্ধক্য থেকে এবং আরও আশ্রয় নিচ্ছি মৃত্যুর সময় শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হওয়া থেকে এবং তোমার রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে পলায়নরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা থেকে। আরও আশ্রয় নিচ্ছি কোনো বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মারা যাওয়া থেকে।’—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৭

পনেরো : হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় নিচ্ছি অলসতা ও অতিবার্ধক্য থেকে। আরও আশ্রয় নিচ্ছি ঋণের বোঝা ও পাপের বোঝা থেকে। ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় নিচ্ছি জাহান্নামের আজাব থেকে ও জাহান্নামের ফিতনা থেকে।

আরও আশ্রয় নিচ্ছি কবরের ফিতনা থেকে ও কবরের আজাব থেকে। আরও আশ্রয় নিচ্ছি প্রাচুর্যের ফিতনার অনিষ্ট থেকে। দরিদ্র ফিতনার অনিষ্ট থেকে এবং দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে। ইয়া আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো ধুয়ে দাও শিলা ও বরফের পানি দিয়ে এবং আমার অন্তরকে এমন পরিষ্কার কর, যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয় এবং আমার মাঝে ও আমাদের গুনাহের মাঝে এমন দূরত্ব সৃষ্টি কর, যেমন দূরত্ব সৃষ্টি করেছো পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে।’—সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৬৮; জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৪৯৫

ষোলো : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার কাছে জাহান্নামের আজাব, কবরের আজাব থেকে, দাজ্জালের ফিতনা থেকে এবং জীবন-মরণের সব ফিতনা থেকে আশ্রয় নিচ্ছি।—জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৪৯৪

সতেরো : হজরত মাকিল ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ইয়া আল্লাহ! জ্ঞাতসারে তোমার সঙ্গে শিরক করা থেকে আমি তোমার দরবারে আশ্রয় নিচ্ছি এবং যা আমার অজ্ঞাত, তা থেকেও তোমার দরবারে ক্ষমা চাচ্ছি।’—আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৭১৬

আঠারো : হজরত আমর ইবনে মাইমুনা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক নামাজের পর আশ্রয় চাইতেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ভীরুতা থেকে আশ্রয় চাই, নিকৃষ্ট জীবন পৌঁছা থেকে আশ্রয় কামনা করি, দুনিয়ার ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই এবং কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই।’—সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৭৪; জামে তিরমিযি, হাদিস : ৩৫৬২