ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

উম্মতে মুহাম্মাদির বৈশিষ্ট্য

মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদিকে বিশেষ কিছু গুণে ভূষিত করেছেন। এ জাতিকে তার গুণগুলোর যথাযথ ভাবার্থ অনুধাবনপূর্বক বাস্তব জীবনে তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বিশ্বের সামনে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে। নতুবা পূর্ববর্তী উম্মতদের মতো তাদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় নিপতিত হতে হবে।

আল কুরআনের বাণী, ‘আমি তোমাদের ভারসাম্যপূর্ণ জাতি করেছি’ (সূরা আল-বাকারাহ ১৪৩)। এ আয়াতের ওয়াসাত্তা শব্দটি উচ্চারণ ও লেখায় একটি সাধারণ শব্দ হলেও তাৎপর্যের দিক দিয়ে কোনো জাতি অথবা ব্যক্তির মধ্যে যত পরাকাষ্ঠা থাকা সম্ভব, সেগুলো পরিব্যাপ্ত করেছে। আয়াতে মুসলিম জাতিকে মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ বলে অভিহিত করে বলা হয়েছে, মানবীয় মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাদের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান।

যে উদ্দেশ্যসাধনের ল্েয নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের যাবতীয় কর্মধারা অব্যাহত রয়েছে এবং পয়গম্বর ও আসমানী গ্রন্থগুলো প্রেরিত হয়েছে, তাতে এ সম্প্রদায় অপরাপর সম্প্রদায় থেকে স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী ও শ্রেষ্ঠ। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মুসলিম জাতির এই শ্রেষ্ঠত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা আল আ’রাফের শেষ ভাগে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা সৎপথ প্রদর্শন করে এবং তদনুযায়ী ন্যায়বিচার করে’। এতে মুসলিমদের আত্মিক ও চারিত্রিক ভারসাম্য বিধৃত হয়েছে যে, তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে আসমানী গ্রন্থের নির্দেশ অনুযায়ী নিজেরাও চলে এবং অন্যদেরও চালানোর চেষ্টা করে। কোনো ব্যাপারে কলহবিবাদ সৃষ্টি হলে তার মীমাংসাও তারা গ্রন্থের সাহায্যেই করে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের স্বার্থপরতার কোনো আশঙ্কা নেই।

সূরা আলে ইমরানে মুসলিম জাতির আত্মিক ভারসাম্য এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরাই সেই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান রাখবে।’ অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদি যেমন সব পয়গম্বরের শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বরপ্রাপ্ত হয়েছে, সব গ্রন্থের সর্বাধিক পরিব্যাপ্ত ও পূর্ণতর গ্রন্থ লাভ করেছে, তেমনি সব সম্প্রদায়ের মধ্যে সুস্থ মেজাজ ও ভারসাম্যও সর্বাধিক পরিমাণে প্রাপ্ত হয়েছে। ফলে তারাই সব সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ সম্প্রদায় সাব্যস্ত হয়েছে। তাদের সামনে জ্ঞানবিজ্ঞান ও তত্ত্ব-রহস্যের দ্বার উন্মুক্ত করা হয়েছে।

ঈমান-আমল ও আল্লাহভীতির সব শাখাপ্রশাখা তাদের ত্যাগের বদৌলতে সজীব ও সতেজ হয়ে উঠবে। তারা কোনো বিশেষ দেশ ও ভৌগোলিক সীমার বন্ধনে থাকবে না। তাদের কর্মত্রে হবে সমগ্র বিশ্ব এবং জীবনের সব শাখায় পরিব্যাপ্ত। তাদের অস্তিত্বই অন্যের হিতাকাক্সা ও তাদের বেহেশতের দ্বারে উপনীত করার কাজে নিবেদিত। উপরি উক্ত আয়াতের ‘উখরিজাত লিন্নাসে’ বাক্যাংশে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এই সম্প্রদায় গণমানুষের হিতাকাক্সা ও উপকারের নিমিত্তেই সৃষ্ট। তাদের অভীষ্ট কর্তব্য ও জাতীয় পরিচয় এই যে, তারা মানুষকে সৎকাজের দিকে পথ দেখাবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে।

বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভারসাম্যপূর্ণ হওয়ার প্রমাণ নিম্নে নমুনাস্বরূপ কিছু বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছে :
বিশ্বাসের ভারসাম্য : পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের মধ্যে এক দিকে দেখা যায়, তারা পয়গম্বরগণকে আল্লাহর পুত্র মনে করে তাদের উপাসনা ও আরাধনা করতে শুরু করেছে। যেমন এক আয়াতে রয়েছে, ‘ইয়াহুদিরা বলেছে, ওজায়ের আল্লাহর পুত্র এবং খ্রিষ্টানরা বলেছে, মসিহ আল্লাহর পুত্র’ (সূরা আত-তাওবাহ ৩০। অপর দিকে এসব সম্প্রদায়েরই অনেকে পয়গম্বরের উপর্যুপরি মুজিজা দেখা সত্ত্বেও তাদের পয়গম্বর যখন তাদের কোনো ন্যায়যুদ্ধে আহ্বান করেছেন, তখন পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ‘আপনি এবং আপনার পালনকর্তাই গিয়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানেই বসে থাকব।’ (সূরা আল মায়িদাহ ২৪)। আবার কোথাও পয়গম্বরগণকে স্বয়ং তাদের অনুসারীদের হাতেই নির্যাতিতও হতে দেখা গেছে।

পান্তরে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থা তা নয়। তারা এক দিকে রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রতি এমন আনুগত্য ভালোবাসা পোষণ করে যে, এর সামনে জানমাল, সন্তান-সন্ততি, ইজ্জত-আবরু সব কিছু বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। অপর দিকে রাসূল সা:-কে রাসূল ও আল্লাহকে আল্লাহই মনে করে। এত সব পরাকাষ্ঠা ও শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও রাসূল সা:কে তারা আল্লাহর দাস ও রাসূল বলেই বিশ্বাস করে এবং মুখে প্রকাশ করে। তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতে গিয়েও তারা একটা সীমার ভেতরে থাকে।

কর্ম ও ইবাদতের ভারসাম্য : বিশ্বাসের পরই শুরু হয় আমল ও ইবাদতের পালা। এ েেত্র পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এক দিকে দেখা যায়, তারা শরিয়তের বিধিবিধানকে কানাকড়ির বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়, ঘুষ-উৎকোচ নিয়ে আসমানী গ্রন্থকে পরিবর্তন করে অথবা মিথ্যা ফতোয়া দেয়, বাহানা ও অপকৌশলের মাধ্যমে ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করে এবং ইবাদত থেকে গা বাঁচিয়ে চলে। অপর দিকে তাদের উপসনালয়গুলোতে এমন লোকও দেখা যায়, সংসারধর্ম ত্যাগ করে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছে। তারা আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামত থেকেও নিজেদের বঞ্চিত রাখে এবং কষ্ট সহ্য করাকেই সওয়াব ও ইবাদত বলে মনে করে।
পান্তরে মুসলিম সম্প্রদায় এক দিকে বৈরাগ্যতাকে মানবতার প্রতি জুলুম বলে মনে করে এবং অপর দিকে আল্লাহ ও রাসূলের বিধিবিধানের জন্য জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে না। তারা রোম ও পারস্য সম্রাটের সিংহাসনের অধিপতি ও মালিক হয়েও বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ধর্মনীতি ও রাজনীতির মধ্যে কোনো বৈরিতা নেই এবং ধর্ম মসজিদ ও খানকায় আবদ্ধ থাকার জন্য আসেনি; বরং হাট-ঘাট, মাঠ-ময়দান, অফিস-আদালত এবং মন্ত্রণালয়গুলোতে এর সাম্রাজ্য অপ্রতিহত। তাঁরা বাদশাহীর মাঝে ফকিরি এবং ফকিরির মাঝে বাদশাহী শিা দিয়েছেন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য : এরপর সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি ল করলে দেখা যায়, পূববর্তী উম্মতগুলোর মধ্যে এক দিকে দেখা যায়, তারা মানবাধিকারের প্রতি পরোয়াও করেনি; ন্যায়-অন্যায়ের তো কোনো কথাই নেই। নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাউকে যেতে দেখলে তাকে নিপীড়ন, হত্যা ও লুণ্ঠন করাকেই বড় কৃতিত্ব মনে করেছে। ছোটখাটো বিষয়কে নিয়ে শতাব্দীব্যাপী যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে গিয়েছিল। মহিলাদের মানবাধিকার দান করা তো দূরের কথা, তাদের জীবিত থাকার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হতো না।
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের শরিয়ত এসব ভারসাম্যহীনতার অবসান ঘটিয়েছে। তারা এক দিকে মানুষের সামনে মানবাধিকারকে তুলে ধরেছে। শুধু শান্তি ও সন্ধির সময়ই নয়, যুদ্ধেেত্রও শত্রুর অধিকার সংরণে সচেতনতা শিা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক ভারসাম্য : অর্থনীতি বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ েেত্রও অপরাপর সম্প্রদায়ের মধ্যে বিস্তর ভারসাম্যহীনতা পরিলতি হয়। এক দিকে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। এতে হালাল-হারাম এবং অপরের সুখ-শান্তি ও দুঃখ-দুরবস্থা থেকে চু বন্ধ করে অধিকতর ধনসম্পদ সঞ্চয় করাকেই সর্ববৃহৎ মানবিক সাফল্য বলে গণ্য করা হয়। অপর দিকে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা। এতে ব্যক্তি মালিকানাকেই অপরাধ মনে করা হয়। কিন্তু চিন্তা করলে বোঝা যায়, উভয় অর্থব্যবস্থার সারমর্মই হচ্ছে ধনসম্পদের উপাসনা, ধনসম্পদকেই জীবনের একমাত্র ল্য ও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান করা এবং এরই জন্য যাবতীয় চেষ্টাসাধনা নিয়োজিত করা।

মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের শরিয়ত এ েেত্রও ভারসাম্যপূর্ণ অভিনব অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। ইসলামি শরিয়ত এক দিকে ধনসম্পদকে জীবনের ল্য মনে করতে বারণ করেছে এবং সম্মান, ইজ্জত ও কোনো পদমর্যাদা লাভকে এর ওপর নির্ভরশীল রাখেনি; অপর দিকে সম্পদ বণ্টনের নিষ্কলুষ নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছে, যাতে কোনো মানুষ জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত না থাকে এবং কেউ সমগ্র সম্পদ কুগিত করে না বসে। এ ছাড়া সম্মিলিত মালিকানাভুক্ত বিষয়-সম্পত্তিকে যৌথ ও সাধারণ ওয়াক্ফের আওতায় রেখেছে। হালাল মালের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে এবং তা রাখার ও ব্যবহার করার পদ্ধতি শিা দিয়েছে।

উপরি উক্ত আলোচনায় সংপ্তিাকারে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভারসাম্যপূর্ণ হওয়ার কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংপ্তি বর্ণনা থেকেই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।