ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

জবানের হেফাজত করা জরুরি

আল্লাহর অপরিমেয় নিয়ামতের অন্যতম একটি হলো ‘জিহ্বা’। আরবিতে জিহ্বাকে লিসান বলে। ফারসিতে জবান। জবান মানুষের মূল স্পিড বা শক্তি। অন্যান্য প্রাণী থেকে ব্যবধানকারী। এর দ্বারা মানুষের শত সহস্র শুকরিয়া আদায় হয়। এর মাধ্যমে মানুষ পৌঁছে যায় মুত্তাকির উচ্চপর্যায়ে। জবানের সঠিক ব্যবহারে মানুষ যেমন পায় আল্লাহর নৈকট্য তেমনি এর অপব্যবহারে মানুষ পৌঁছে যায় নরকের গহিন অন্ধকারে।
হাদিস শরিফে হজরত সাহল ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কাছে ওয়াদা করবে যে, সে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তু (জবান) ও দুই রানের মধ্যে অবস্থিত বস্তুর (লজ্জাস্থান) নিরাপত্তা করবে, আমি তার জন্য বেহেশতের জামিন হবো।’

কত বড় কথা, জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের যে সঠিক ব্যবহারের দায়িত্ব নেবে রাসূলুল্লাহ তাঁর জান্নাতের দায়িত্ব নেবেন। এর কারণ কী? কারণ হলো জিহ্বা যদিও একটি মাংসপিণ্ডের নাম, তবে এটা হৃদয়ের দরজা। এটা হৃদয়ের সংবাদ সরবরাহ করে। এর ক্ষমতা প্রবল। প্রতাপশালী রাজার চেয়ে বেশি। এটা মানুষকে সম্মানের সর্বোচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে আবার ধ্বংসের অতলেও ডুবাতে পারে। ভালোর আদেশ, মন্দের নিষেধ, কুরআন হাদিস-ফিকাহ অধ্যায়ন, দ্বীনের দাওয়াত এগুলো জিহ্বার ভালো কাজ। ঝগড়া-বিবাদ-তিরস্কার, নিন্দা, তোষামোদ, মুনাফিকি পরনিন্দা এসব পাপকর্ম জিহ্বার কাজ।

জবানের অনর্থ কাজগুলোর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রাখে না এ কারণে যে, এর খারাপ দিক সূর্যের মতো স্পষ্ট। যেমন জবানের অনর্থ কাজের একটি হলো ‘গিবত’। গিবত এমন এক পাপ! কুরআন ও হাদিসে জানা যায় যে, এর মাধ্যমে নিজের আমল অন্যের আমলে চলে যায়। গিবতকারী ব্যক্তির আমলনামায় গিবতকারীর কৃত আমল চলে যায়। এ কারণে ইমাম বোখারি বলেন, ‘যে দিন থেকে আমি জানলাম যে, গিবত আমলকে ট্রান্সফার করে দেয় সেদিন থেকে আমি কারো গিবত করি না। যদি করি তাহলে আমার মায়ের গিবত করি। যেন আমার আমল আমার মায়ের আমলে চলে যায়।’

গিবত সম্পর্কে কুরআনে ভয়াবহ সতর্কবাণী এসেছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বাঁচো। নিশ্চয় কতেক ধারণা গোনাহ এবং কারো গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারো অনুপস্থিতিতে নিন্দা (গিবত) না করে। তোমাদের কেউ তাদের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? নিশ্চয় না, তোমরা ঘৃণা করবে। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।’ (সূরা হুজুরাত : ১২)

গিবত শুধু জবানের একটি দিক। এ রকমভাবে মিথ্যা বলা, অপবাদ দেয়া ও গালি দেয়া। জবানের সম্পর্কে রাসূল সা: আরো বলেন, বান্দা কখনো কখনো এমন কথা বলে যার ফলে আল্লাহ খুশি হয়ে যায় এবং এ জন্য আল্লাহ তার পদমর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। অথচ বান্দা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। আবার কখনো বান্দা এমন কথা বলে যার ফলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে যান এবং এ কথা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। অথচ বান্দা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। বোখারি বর্ণিত হাদিসে জবানের দু’টি এমন ব্যবহার দেখানো হয়েছে যার দ্বারা আল্লাহ কখনো খুশি হয়ে যান আবার কখনো রাগ হয়ে যান অথচ বান্দা নিজেই তার জবানের এই পরিণতি জানে না।

অন্যত্র বর্ণিত আছে, ‘তোমরা কিয়ামত দিবসে সবচেয়ে খারাপ তাকে পাবে যে জবানের দ্বিমুখী ব্যবহার করেছে। সে একমুখ নিয়ে এদের কাছে যায় অন্য মুখ নিয়ে অন্যদের কাছে যায়।’ (বোখারি মুসলিম)
জবানের আরেকটি মন্দ ব্যবহার হচ্ছে কারো ব্যাপারে অতি মাত্রায় প্রশংসা করা। যতটুকু প্রশংসার যোগ্য নয় তার দ্বিগুণ প্রশংসা করা। হজরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা: হতে বর্ণিত। রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘যখন তোমরা প্রশংসায় বাড়াবাড়িকারীদের দেখবে। তখন তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করবে।’ (মুসলিম)

জবানের অনর্থ ব্যবহারের আরো ক্ষতিকারক দিক রয়েছে। ভদ্র-অভদ্রের পরিচায়ক বলা হয় জবানকে। নবী-রাসূল তাঁদের অনুসারী মুমিনদের থেকে সদাসর্বদা বেঁচে থাকতেন। এবং এর অনর্থ ব্যবহারে খুব ভয় পেতেন। যথাসম্ভব জবানকে সংযত রাখতেন। জবানের সংযত রাখাটাই বিরাট সফলতা। যার সংযত রাখার শক্তি নেই তার জন্য শ্রেয় হলো চুপ থাকা। জবানকে বন্ধ রাখা তথা চুপ থাকা বেহিসাব ফায়দামান। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি চুপ রয়েছে সে নাজাত পেয়েছে।’ যদি কেউ এমন অনর্থ কথা বলে যা হয় মিথ্যা ও বানোয়াট এবং এর মাধ্যমে মানুষকে হাসানো উদ্দেশ্য হয়। রাসূল বলেন, ‘তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।’