ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মজলুমের বন্ধু মহানবী সা:

Hz-Muhammed-SAVসব নবীর সেরা নবী হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম সৃষ্টি। তাঁর সুমহান আদর্শকেই মানবজাতির জন্য পরিপূর্ণ আদর্শরূপে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। মহাকবি আল্লামা জামীর ভাষায় : ‘যা তাঁর পাওনা সেরূপ প্রশংসা তো সম্ভবপর নয়, সংক্ষেপে শুধু এতটুকুই বলা যায় যে, সৃষ্টিকর্তার পর তুমিই সর্বাপেক্ষা মহীয়ান, গরীয়ান।’

প্রিয় নবী সা:-এর জীবনে বহুমুখী অনন্য ও অসাধারণ গুণ-বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন। জীবনের এই অংশে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল ও স্বার্থক। কারণ আল্লাহ তাঁকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন বান্দাদেরকে যাবতীয় অন্যায় ও অপরাধ এবং অপশক্তির কবলমুক্ত করে তাদের দ্বারাই এই যমিনে ইসলাম কায়েম করার জন্য।

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি সমাজে অত্যাচারের প্রতিরোধ, মজলুমদের সুরক্ষা ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বনি হাশেম, বনি মোত্তালেব, বনি আসাদ ইবনে আব্দুল ওযযা, বনি যোহরা ইবনে কেলাব এবং বনু তাইম ইবনে মোররা গোত্রের সর্বজন শ্রদ্ধেয় কিছু ব্যক্তি নিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদয়ান তাইমির ঘরে একত্র হয়ে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকেই মহানবী সা:-এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শুভ সূচনা হয়।

প্রিয় নবী সা:-এর জীবনে রাজনীতির প্রকৃতি, গতিধারা, প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর প্রভাব আলোচনা করতে গেলেই প্রশ্ন জাগে এই ধরার বুকে মানবসমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ব কী ছিল? আল্লাহ তায়ালাই পবিত্র কুরআনে এর জবাব দিয়েছেন এভাবে, ‘তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছেন যাতে একে অন্য সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন। সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সূরা ফাতাহ : ২৮)। এ ছাড়া আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ৩৩ এবং সূরা আসসফের ৯ নম্বর আয়াতে রাসূলুল্লাহ সা:-এর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই দায়িত্বের পূর্ণতা বিধানের জন্য ৪০ বছর বয়সে আল্লাহ তাঁর হাবিবকে নবুয়তি দান করেন। তখন তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। জাগতিক উপায়-উপকরণ বলতেও তেমন কিছু তাঁর হাতে ছিল না।

এমতাবস্থায়ও ১৩ বছরের মক্কী জীবনে হজরত আবু বকর রা:, হজরত উমর রা:, হজরত উসমান রা:, হজরত আলী রা: এবং হজরত আবু যর গিফারীর রা:-এর মতো সমাজের বেশ কিছু সেরা মানুষসহ মক্কার ৪৩৫, মদিনার ২০০ এবং হাবশায় হিজরতকারী প্রায় ১০০ লোকসহ মোট সাড়ে সাত শতাধিক ব্যক্তিকে তিনি ইসলামের ছায়াতলে শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সংখ্যাই মদিনায় হিজরতের পর এক বছরের মধ্যে প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে তিন হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়।এর দ্বারাও তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বুখারি শরিফের ‘কিতাবুল জিহাদে উল্লেখ আছে যে, দ্বিতীয় হিজরিতে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রিয় নবী সা: মুসলিম জনগণের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে একটি দফতরের মধ্যে তা সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেন। সম্ভবত এটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিপিবদ্ধ আদম শুমারি। এ ছাড়া মক্কি জীবনে তাঁর কর্মকাণ্ডের সুবিধার জন্য পবিত্র কাবা শরীফের পাশেই হজরত আরকাম ইবনে আবুল আরকাম রা:-এর বাড়িতে একটা কেন্দ্রীয় দফতর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১২ রবিউল আউয়াল ৬২২ ঈসায়ী সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রিয় নবী সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটা এক দিকে ছিল যেমন ইবাদাতের ঘর, তেমনি ছিল পারস্পরিক সম্মিলন ও মিল-মুহাব্বাতেরও একটি কেন্দ্র। আল্লামা ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, ‘অতঃপর প্রিয় নবী সা: হজরত আনাস রা:-এর গৃহে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে মানব ইতিহাসে এক অসাধারণ কাজ সম্পন্ন করেন।’

আল্লামা ইমাম গাজ্জালি রহ: লিখেছেন, ‘জাহেলি যুগের রীতিনীতির অবসান, ইসলামের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার পার্থক্য মিটানোই ছিল এই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের মূল উদ্দেশ।’ পরবর্তী সময়ে আওস ও খাজরাজ গোত্রের বহু দিনের বিবাদ মিটিয়ে মদিনায় বসবাসকারী তিন শ্রেণীর মধ্যে ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মদিনার সনদ প্রণয়ন করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটাই পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বলের চতুর্থ খণ্ডে উল্লেখিত বিশিষ্ট সাহাবী হজরত রাফে ইবনে খাদিজা রা:-এর বর্ণনা অনুসারে মসৃণ পাতলা চামড়ায় লিখিত এ সনদটি দীর্ঘকাল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নেতাদের কাছে ছিল। পরে তা হাদিস গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে।

প্রিয় নবী সা:-এর ১০ বছরের মাদানি জীবন পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হবে রাষ্ট্রনেতা হিসাবেও তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। বিভিন্ন বিবদমান গোত্রগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় নিয়ে আসা, বিভিন্ন এলাকা এবং গোত্রের সর্বমোট ২০৯টি প্রতিনিধি দলকে সাক্ষাৎ দান, রাজনৈতিক লক্ষ্যে ১০০রও বেশি দূত প্রেরণ, তৎকালীন সময়ের দুই পরাশক্তি পারস্য এবং রোম সম্রাটসহ চার শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছে দাওয়াতীপত্র প্রেরণ, বিদ্রোহীদের দমন, বৈরী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা, আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর অধিকার প্রদান, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি তাঁর সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড, তিনি যে একাধারে শ্রেষ্ঠ নবী, শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রিয় নবী সা:-এর এই অনন্য-অসাধারণ রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণেই মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই মুসলিম জনসংখ্যা ৭০০ থেকে ১০ লাখে উন্নীত হয়। মাত্র ছয় বর্গমাইলের ইসলামী রাষ্ট্রের পরিধি পৌনে ১২ লাখ বর্গমাইলে বিস্তৃতি লাভ করে। বিদায় হজেই অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সংখ্যা ছিল সোয়া লাখের ওপরে।

প্রিয় নবী সা: ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ রাজনীতিবিদ, তাঁর প্রমাণ পাই আমরা তাঁকে অনুসরণকারী সাহাবীদের জীবনে। প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা হবেন দেশ ও জনগণের খাদেম তথা সেবক। প্রিয় নবী সা: তাঁর অনুসারীদের এভাবেই তৈরি করেছিলেন। ফলে প্রসাশনের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত ব্যক্তিরা নিজেদের জনগণের সেবকের ভূমিকায় উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন পারস্য সম্রাটের সদ্যবিজিত রাজধানী মাদায়েনের শাসনকর্তা হজরত হুযায়ফাতুল ইয়ামান রা:। সওয়াবের আশায় একদিন তিনি এক বিদেশীর ভারী বোঝা মাথায় নিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে পরম আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলেন। লোকেরা তাকে বাধা দিলে তিনি বললেন, আমি জনগণের খাদেম। আমাকে একজন বিপদগ্রস্ত বিদেশীর সেবা করে পুণ্য অর্জন করতে তোমরা কেন বাধা দিচ্ছ? এমনি অসংখ্য ঘটনা প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সাহাবিদের জীবনে ছড়িয়ে রয়েছে। যা ইসাবা, উসদুল গাবা, আস-সাফওয়াতুস-সাফওয়া প্রভৃতি প্রমাণ্য গ্রন্থে সযতেœ সংরক্ষিত আছে।

মহানবী সা:-এর রাজনীতি ছিল ইসলামের জন্য। দেশ ও জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য। মানুষের হৃদয় মুকুরে ধর্মীয় চেতনাকে বদ্ধমূল করে আল্লাহ ভীরু চরিত্রবান মানুষ তৈরি করাই ছিল তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য। কারণ ধর্মীয় বিধান মূল চালিকা শক্তি হিসাবে যখন কাজ করে তখনই সমাজের বর্বরতা ও নৈরাজ্য দূর করা সম্ভব। আজকের রাজনীতিবিদেরা যদি রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শে আদর্শবান হতে পারেনÑ তাহলে সমাজে শান্তি ফিরে আসবে সুনিশ্চিত। কারণ ধর্মহীন রাষ্ট্রনীতির দ্বারা মানুষের কল্যাণ হতে পারে না, এটা চরম সত্য।
আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘হোকনা রাজনীতি, রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের রূপে যদি এই রাষ্ট্রনীতি থেকে দ্বীনকে আলাদা করে দেয়া হয় তবে ওই রাজনীতিতে শুধু চেংগিজি বর্বরতাই অবশিষ্ট থাকে।