ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

একদা মুসলিম অধ্যুষিত স্পেন, বসনিয়া ও তুরস্কের ইতিহাস আমাদের সামনে রয়েছে

ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য নিয়ে মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকাটাই তো তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কের ১৯২১-২৩ সালের ইতিহাস বড়ই করুণ। একসময় সেখানে খেলাফতে উসমানিয়া ছিল। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তুর্কি কলঙ্ক কামাল পাশার নেতৃত্বে খেলাফতে উসমানিয়াকে উত্খাত করা হলো। ৬ মাসের মধ্যে আরবি ভাষাকে নির্মূল করে দেয়া হয়েছিল, আরবিতে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কোরআন পাঠ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যত মাদরাসা ছিল সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, প্রতীকীস্বরূপ কিছু মসজিদ রেখে সব মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। মুসলিম মহিলাদেরকে হিজাব খুলে রেখে বাইরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

কোনো কোনো মহলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিভিন্ন সময় ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণের কোনো ঘটনা ঘটলে একশ্রেণীর লোক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘ইসলাম গেল, ইসলাম গেল’ বলে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে থাকে। পাবলিক সেন্টিমেন্ট অনুকূলে নিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই মূলত এ কাজটি করা হয়ে থাকে। আসলে কোনো আঘাতেই ইসলামের কোনো ক্ষতি হয় না। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?

যারা এ ধরনের কথা বলে থাকে তারা এক ধরনের সুযোগসন্ধানী। স্বার্থান্বেষী মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই তারা আলেমদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত হয় বলে আমি মনে করি। নায়েবে রাসুল হিসেবে আলেম সমাজ আবেগ এবং বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডা দুনিয়ার বুকে উঁচু করে রাখার জন্যই দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও আদর্শকে তাঁরা পাহারা দিয়ে সমুন্নত রেখেছেন। যুগে যুগে দ্বীনে ইসলামের বিরুদ্ধে যখনই কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছে আলেম সমাজ তাঁদের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, সংগ্রাম করেছেন, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। তাছাড়া কোনো আঘাতেই ইসলামের কোনো ক্ষতি হয় না—একথা মোটেও সঠিক নয়।

আমরা একটু পেছনে ফিরে তাকাতে পারি। একদা মুসলিম অধ্যুষিত দেশ স্পেন, বসনিয়া ও তুরস্কের হৃদয়বিদারক ইতিহাস তো আমাদের সামনেই রয়েছে। স্পেন, তুরস্ক, রোম, চেচনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এসব দেশে কি একসময় ইসলামের জয়জয়কার ছিল না? আজ কোথায় সেসব দেশের ইসলামি শাসন এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস? একের পর এক ষড়যন্ত্রের কালো থাবায় আক্রান্ত হয়েছে মুসলিম অধ্যুষিত এসব দেশ। ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য নিয়ে মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকাটাই তো তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তুরস্কের ১৯২১-২৩ সালের ইতিহাস বড়ই করুণ। একসময় সেখানে খেলাফতে উসমানিয়া ছিল। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তুর্কি কলঙ্ক কামাল পাশার নেতৃত্বে খেলাফতে উসমানিয়াকে উত্খাত করা হলো। ৬ মাসের মধ্যে আরবি ভাষাকে নির্মূল করে দেয়া হয়েছিল, আরবিতে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কোরআন পাঠ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যত মাদরাসা ছিল সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, প্রতীকীস্বরূপ কিছু মসজিদ রেখে সব মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। মুসলিম মহিলাদেরকে হিজাব খুলে রেখে বাইরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এরা মুসলমানদের ওপর এভাবেই অত্যাচার নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল।

এসব কর্মকাণ্ড কি প্রমাণ করে না যে, ইসলামি বিধি-বিধান, ইসলামি কৃষ্টি-কালচার ধ্বংস করার প্রক্রিয়ারই একটি অংশ ছিল সে ষড়যন্ত্র? সুতরাং ইসলামের বিরুদ্ধে আঘাত আসতে পারে না—একথা একেবারেই সঠিক নয়। এইতো পয়লা এপ্রিল গেল। হাজার বছর আগে কী ঘটেছিল সেদিন, এই ইতিহাস কি আমাদের নতুন প্রজন্ম জানে? মুসলমানদেরকে বলা হলো যে, তোমরা মসজিদে থাক, সেখানে থাকলে তোমরা নিরাপদে থাকবে। কিন্তু কী পৈশাচিক আচরণ করা হলো তাদের সঙ্গে! মসজিদগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়া হলো। এর ভেতরে থাকা সব মুসলমানকে পুড়িয়ে মারা হলো। মুসলমানদেরকে স্পেন থেকে নির্মূল করা হলো। তারপরও ইসলামের ওপর আক্রমণ নিয়ে কোনো আশঙ্কা ব্যক্ত করা অপরাধ হয়ে যাবে?

একটি মুসলিমপ্রধান দেশে এ ধরনের অপতত্পরতা বন্ধে সুদূরপ্রসারী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

আমি মনে করি আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের থেকে শুরু করে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামি বিধি-বিধান সংবলিত পাঠ্যপুস্তক সিলেবাসে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি যে কোনো ধর্মবিশ্বাসে আঘাতের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের আপস বা কোনো ধরনের উদাসীনতা মেনে নেয়া যাবে না।

ইসলামবিদ্বেষী চক্রের উগ্র ইসলামবিদ্বেষ ও ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জাতিকে সচেতন করার একটি প্রধান দায়িত্ব সম্মানিত ইমাম-খতিবদের। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, এ দায়িত্ব পালন থেকে তাদের বাধা দিচ্ছে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কিছু লোকসহ খোদ মসজিদ কমিটির কিছু লোক। এ বিষয়ে আপনি কিছু বলবেন?

দেখুন, মসজিদের ইমাম-খতিবরা হলেন নায়েবে রাসুল, দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী, আমাদের মাথার তাজ। দ্বীনে ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত হলে ইমাম-খতিবরা জনসাধারণকে এ বিষয়ে সতর্ক করবেন, সঠিক দিক-নির্দেশনা দেবেন। ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে অজ্ঞ কোনো ব্যক্তি তাদেরকে সবক দিতে পারেন না। সেই অধিকার তাদের নেই। প্রশাসনের আইন মসজিদের ভেতরে চলে না। মসজিদের ভেতরে আইন চলবে শুধু আল্লাহর। আমি মনে করি ইমাম-খতিব সাহেবদের দায়িত্ব পালনে যারা বাধা সৃষ্টি করছেন, তারা এই ঘৃণ্য কাজটি না করে বরং ইমাম সাহেবদের মসল্লায় গিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের লোকেরাই যদি ইমাম হয়ে যান তাহলে আলাদা করে আর কোনো ইমামের দরকার হবে না। নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে চাপ প্রয়োগেরও প্রয়োজন হবে না।

অভিযোগ উঠেছে, কোনো কোনো মসজিদ কমিটিতে জায়গা পাওয়া ধর্মনিরপেক্ষ ও বিভ্রান্ত লোকেরা ইমাম-খতিবদের দায়িত্ব পালনে বাধা দিচ্ছে। মসজিদ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ধর্মপরায়ণতা, শুদ্ধ ঈমান-আকিদা ও নৈতিক চরিত্রের কিছু শর্ত থাকা দরকার বলে আপনি মনে করেন কিনা?

চমত্কার একটি প্রশ্ন করেছেন। দেখুন, যারা দ্বীনকে ভালোবাসেন, আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে মহব্বত করেন, দ্বীনের ওপর চলেন, চলার চেষ্টা করেন তাদেরই তো মসজিদ কমিটিতে আসা উচিত। এর বাইরে থেকে যদি কেউ আসতেই চান তাদের নিজেদের শুধরে আসা উচিত। কারণ এটি আল্লাহর ঘর। এর পরিচালনায় পরিশুদ্ধ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী লোকদেরই আসা যুক্তিসঙ্গত। আল্লাহর ঘর মসজিদ পরিচালনায় ধর্মবিমুখ এবং শুদ্ধ ঈমান-আকিদা পরিপন্থী লোকদের অন্তর্ভুক্তি বড় বেশি বেমানান। এজন্য দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, মসজিদ কমিটিতে তাদেরকেই অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা নৈতিক চরিত্রের অধিকারী এবং দ্বীনের পথে চলেন, চলার চেষ্টা করেন এবং সহীহ ঈমান আকিদা পোষণ করেন।

হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে উগ্র নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হচ্ছে তার ভবিষ্যত্ এবং এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ আল্লামা আহমাদ শফী সাহেব সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলবেন কি?

আল্লামা আহমাদ শফী মাদ্দাজিল্লুহুল আলী (আল্লাহ তাঁর হায়াত আরও দীর্ঘায়িত করুন) তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে আন্দোলনের যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, এর দ্বারা মুসলমানের ঈমান জাগ্রত হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে যে ১৩ দফা দাবি নিয়ে এই আন্দোলন অগ্রসর হচ্ছে জনগণের সরকার হলে তা’ তারা শতভাগ পূরণে আন্তরিক হবে। সুতরাং এই আন্দোলনের ভবিষ্যত্ অত্যন্ত উজ্জ্বল বলেই আমি মনে করি। আর আল্লামা আহমাদ শফী দামাত বারাকাতুহুম তো হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও দীর্ঘ কারাভোগকারী উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ হযরাতুল আল্লাম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.)-এর সুযোগ্য শাগরেদ এবং উত্তরসূরি। অল্প বয়সেই তিনি তাঁর খেলাফতপ্রাপ্ত হয়েছেন। সেই সুযোগ্য উস্তাদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেই আজ আমরা তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে যেতে দেখছি। তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপস করার কোনো উপাদান আমরা খুঁজে পাই না।

ড. হাফেজ মাওলানা এবিএম হিজবুল্লাহ। গবেষক ও আলেমে দ্বীন। অধ্যাপক, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যায়, কুষ্টিয়া।

ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান নানা ষড়যন্ত্র এবং সম্প্রতি আলোচিত কিছু বিষয়ে আমার দেশ-এর ‘ধর্ম ও জীবন’ বিভাগকে তিনি একটি সাক্ষাত্কার দেন। সে সাক্ষাত্কারের নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন—মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ।

Category: ঈমান