ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

পরহেজগার মানুষের সংস্পর্শ

আলেম সম্প্রদায় উচ্চমর্যাদার অধিকারী। সূরা তাওবার ১২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বিশ্বাসীদের সকলের একসাথে অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়, ওদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বহির্গত হয় না কেন, যাতে তারা দ্বীন (ধর্ম) সম্বন্ধে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং ওদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তদের নিকট ফিরে আসবে যাতে তারা সতর্ক হয়।’

কুরআন মজিদে আল্লাহ দ্বীনের বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য কিছু ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করতে আদেশ প্রদান করেছেন। এতেই বোঝা যায় আলেমদের গুরুত্ব মুসলমান সমাজে কত বেশি। আলেম সমাজকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করা হলে আল্লাহকেই আক্রমণ করা হবে। তবে গঠনমূলক সমালোচনা বা এখতেলাফি মতামত অন্য কথা।

পাশ্চাত্য যখন এক এক করে প্রায় সব মুসলিম এলাকা দখল করে নিলো, তখন অনেকেই তাদের গোলামি করল। আলেমরা এই কঠিন দুঃসময়ে বৈরী পরিবেশেও ইসলামের নিভু নিভু বাতি টিম টিম করে হলেও জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। শ্বেত জামড়াওয়ালাদের ভয়ে যখন অন্যরা হয় অন্দর মহলে স্থান নিলো, না হয় গোলামির লেবাস পরল, তখন আলেমরাই কলমের সাথে সাথে তলোয়ার হাতে নিয়েছিলেন।

পলাশী থেকে ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহ পর্যন্ত আলেমরাই দ্বীন ও স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলিত রাখেন। এটি ঐতিহাসিক সত্য। স্বাধীনতা-উত্তর ৪৩ বছরে বাংলাদেশে ৪০ হাজার কওমি মাদরাসা, ৬৭৮২টি এবতেদায়ি মাদরাসা, ৯২২১টি দাখিল মাদরাসা, ২৬৮৮টি আলিম মাদরাসা, ৮৬০টি ফাজিল মাদরাসা, ১৩৮টি কামিল মাদরাসা রয়েছে। আর পাঁচ লাখেরও বেশি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব, খানকা, তাবলিগের মারকাজ ও ধর্মীয় শিাপ্রতিষ্ঠানের উন্নতি-অগ্রগতি এবং নির্মাণ-বিনির্মাণের উদ্যোগী ভূমিকায় রয়েছেন আলেমসমাজ। প্রধান সহযোগিতায় রয়েছেন দেশের সর্বস্তরের জনগণ।

নানামুখী প্রতিকূলতা, অভাব-অনটন, অব্যবস্থাপনা মাটিচাপা দিয়ে আলেমরা অবিরাম এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। দেশের ৮০ ভাগ মসজিদের দায়িত্বশীল ইমাম-খতিব, মুয়াজ্জিন কওমি মাদরাসার সন্তান। মুসলিম বিশ্বে হাফেজে কুরআনের সংখ্যায় শীর্ষে বাংলাদেশ। এককভাবে পৃথিবীতে আর কোনো রাষ্ট্রে এত কুরআনে হাফেজ নেই। এবারো সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনতে অসংখ্য পথভ্রষ্টের হাতে তাসবিহ উঠেছে। 

১৬ কোটি মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাস-বিধান, সংস্কৃতি লালন-পালন ও যাপনের েেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আলেমসমাজ। আলেমরা পুরো জাতিকে আন্তরিক, মানবিক ও নৈতিকতার পাঠদানেও নিরলসভাবে কাজ করছেন। গ্রন্থের পর গ্রন্থ রচনা করে হাওর বিল পার হয়ে ঝড়তুফান উপো করে দিনরাত অবিরাম ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় আলোচনা করে তাদের দাওয়াতি অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। এসব আয়োজনের কেন্দ্রভূমি আলেমদের মাঝ থেকে তৈরি হওয়া কিছু ইসলামিব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো থেকেই আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিস, শিক, হাফেজ-কারি, পীর, দায়ি-মুবালিগ, ওয়ায়েজ, লেখক, সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বহুমুখী প্রতিভার সৃষ্টি হচ্ছে। আলেমরা নানা ভাষায় ইসলামের মাহাত্ম্য নিয়ে বইপুস্তক লেখায় সাধারণ মুসলমানদের ধর্মচেতনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশী ভাষা থেকে বিপুল ইসলামি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করে এবং মৌলিক বই লিখে তাঁরা ইসলামের তাত্ত্বিক অবস্থানকে এ দেশে দৃঢ় করেছেন। মোট কথা জন্ম, বিবাহ, মৃত্যুসর্বত্র তাঁদের প্রয়োজন। কিভাবে তাহলে তাঁদের অবদান, মর্যাদা ও সেবাকে খাটো করা যায়? গ্রামের মানুষ তো সুখে-দুঃখে ব্যথাবেদনায় আলেম, তালবে এলেমকেই প্রথমে ডাকে। আলেম, তালবে এলেম, হাফেজ, কারি, ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন, মোদারেস-তারাই বাংলার মুসলমান ঘরে প্রাথমিক আশার আলো। দোয়া, মুনাজাত, তাবিজ, পানিপড়া, কুরআনখানি, মিলাদ ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদের মনোবলকে চাঙ্গা করে রাখেন তাঁরা। নইলে এ হতাশা-বিক্ষুব্ধ ভুবনে বাংলার গরিব মুসলমানেরা ভেঙে পড়ত ঝড়ঝঞ্ঝায়। আলেমরাই গ্রামের মুসলমানদের মনোবল। সামান্য কিছু শহুরে বাবু আলেমদের ঘৃণা করলেও, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আলেমদের শ্রদ্ধা করেন।

আলেম সম্প্রদায় বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক জীবনে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিছু কিছু প্রসঙ্গ দুঃখজনক বটে। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে তা আসা উচিত। আলেম সম্প্রদায় ইসলামের জ্ঞানের বাতি জ্বলিয়ে রাখলেও তাঁদের অনেকেই ইসলামের বাইরের আধুনিক সাধারণ জ্ঞান থেকে একটু দূরে নানা কারণে। ফলে অনৈসলামি কলাকৌশল সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাবে বৈরী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের শিকার হন তাঁদের অনেকে। কেহ কেহ কোনো কোনো জগদ্বিখ্যাত আলেমের মাদরাসার সার্টিফিকেট নেই বলে ব্যঙ্গ করে নিজেদের সার্টিফিকেটের অহঙ্কার প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন না যে প্রতিভা-হিকমত হলো আল্লাহর দান।

কুরআন বলে, ‘তিনি (আল্লাহ) যাকে ইচ্ছা হিকমত (জ্ঞান) দান করেন। আর যাকে হিকমত দেয়া হয় তাকে তো প্রচুর কল্যাণ দান করা হয়। আসলে, কেবল বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।’ ছোট-বড় সমস্যার পার্থক্য নির্ধারণে আলেম সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে এ ভুলের খেসারত দিতে হবে। শয়তানের শক্তি কোনো কোনো আলেমদের ওপর এ ধরনের বিভ্রান্তিরপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করছে ইসলামের বাতিকেই সম্পূর্ণভাবে নির্বাপিত করতে। তাই ইহকাল ও পরকালের সফলতার জন্য ইসলামি ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শ অপরিহার্য, সে কারণে আমলকারী আলেম ও সৎ দায়িদের মজলিসে বসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে এবং তাদের সাথে চলে নিজের গোপন দোষক্রটির ব্যাপারে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। এ পথের অনুসরণ করার ব্যাপারে নবী করীম সা: থেকে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমরা জান্নাতের টুকরার পাশ দিয়ে যাবে, তখন তা থেকে কিছু আহরণ করে নিয়ো। তারা বললেন, জান্নাতের বাগিচা কোনটি? তিনি বললেন, ইলমের মজলিস।’ আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘লোকমান হাকিম তাঁর ছেলেকে বলেন, হে বৎস! তুমি আলেম-ওলামাদের মজলিসে বসবে, জ্ঞানীদের কাছে থেকে হিকমতের কথা শুনবে। মহান আল্লাহ হিকমতের আলোতে মৃত অন্তরকে পুনর্জীবিত করেন। যেমন বৃষ্টির পানিতে মাটি পুনর্জীবিত হয়ে থাকে।’

ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কোন মসলিস সবচেয়ে কল্যাণকর? তিনি বললেন, ‘যাদের দেখলে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ হবে, যাদের কথা তোমাদের জ্ঞানের পরিধিকে বৃদ্ধি করবে এবং যার আমল তোমাদের পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’ তাই একজন দ্বীনদার পরহেজগার, সত্যবাদী ইসলামি ব্যক্তিত্বকে সাথী বানিয়ে নিতে হবে যে তাকে তার ভুল ধরিয়ে দেবে, বিপদে সাহায্য করবে, ভুলে গেলে স্মরণ করিয়ে দেবে। আর এটি হলো ইসলামি ভ্রাতৃত্বেরই বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি।

আবু সাঈদ খুদরি রা: রাসূলুল্লাহ সা:-কে বলতে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তুমি কেবল দ্বীনদার ব্যক্তির সঙ্গ গ্রহণ করবে, আর তোমার খাবার যেন খোদাভীরু লোকেই কেবল খায়। একজন ইসলামিব্যক্তিত্ব পারেন লক্ষ কোটি প্রাণ আলোকিত করতে। তাই তো এক কবি বলেছেন

যুগ যমানা পাল্টে দিতে চাই না অনেক জন 

এক মানুষই আনতে পারে জাতির জাগরণ। 

এক মানুষই বিপদ কালে বাঁচায় কাফেলায় 

ুদ্র ডিঙ্গা বাঁচায় জাহাজ অসীম দরিয়ায়।

অমনি করে চলছে হেথায় রাত্রি দিন ও মান 

একটি বাতি জ্বালতে পারে হাজার বাতির প্রাণ। 

এই একটি বাতি শতাব্দীতে খুব কমই তৈরি হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যেভাবে ইসলামি ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছিল বর্তমানে আমাদের মাঝে সে ধরনের ব্যক্তিত্ব পর্যাপ্ত সংখ্যক নেই, এর পরও কিছু ইসলামিব্যক্তিত্ব রয়েছে। যারা ইসলামকে নিজেদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন। যাদের দেখলে নেক মানুষ বলে মনে হয়।

যেমন রাসূল সা: বলেছেন, ‘ঈমান কোনো কামনা বাসনা বা পোশাক বা পরিচ্ছদের নাম নয়; বরং ঈমান হলো যা অন্তরে গাঁথা হয়েছে এবং বাস্তবে আমলে পরিণত হয়েছে।’ এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে ব্যক্তি ইসলামি রঙে নিজেকে রঞ্জিত করবে সেই হচ্ছে ইাসলামিব্যক্তিত্ব। যাকে দুনিয়া কোনো বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারবে না। কারণ আল্লাহ বলেন : ‘দুনিয়া হলো ক্ষণস্থায়ী, তারা কাজ করবে আখিরাতের জন্য যেটি হচ্ছে চিরস্থায়ী। নিশ্চয়ই দুনিয়ার জীবন খেলতামাশা ও নিজেদের মধ্যে গর্ব-অহঙ্কারের বিষয়। ইসলামি-ব্যক্তিত্ব আগে যে রকম ছিল বর্তমানে তেমন নেই। তাদের মধ্যে পরহেজগারিতার অভাব লক্ষ করা যায়। দুনিয়ার প্রতি টান লক্ষ করা যায়। দুনিয়াপ্রীতি লক্ষ করা যায়।

জীবন ও জীবিকা হারানো এবং তা থেকে বঞ্চনার ভীতি প্রাথমিক যুগের মুসলমানেরা হক কথা বলতে গিয়ে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করত না। আল্লাহর কাজে কারো নিন্দা ও সমালোচনার তোয়াক্কা করত না। সত্য বলতে, সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে জীবন ও জীবিকার ভায়ে পিছপা হতো না।

রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তখন সে যেন কেবল মানুষের ভয়ে তা বলা থেকে বিরত না হয়। কেননা এটি তাকে কোনো জীবিকা থেকে বঞ্চিত করবে না এবং মৃত্যু বা মুসিবতেরও নিকটবর্তী করবে না।’ ‘কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে জাপটে ধরবে। সে বলবে, কী ব্যাপার তোমাকে তো আমি চিনি না। তুমি আমাকে জাপটে ধরেছ কেন? সে বলবে, তুমি দুনিয়ায় আমাকে অন্যায় কাজ করতে দেখতে অথচ নিষেধ করতে না কেন? জবাব দাও।’

ইবনে মাসউদ রা: বলেন, এমন একসময় আসবে যখন মানুষের অন্তঃকরণের মিষ্টতা লবণাক্ততায় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। সেই দিন আলেমের ইলম কোনো উপকারে আসবে না এবং তার ছাত্রও উপকৃত হবে না। আলেমগণ হবেন শুষ্ক ময়দানের মতো। বৃষ্টি নামলেও সেখানে কোনো ফসল উৎপাদন হবে না। এটি হবে সে সময়, যখন জ্ঞানবানদের অন্তঃকরণ দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বে এবং তারা একে হিকমত বা প্রজ্ঞাকে উঠিয়ে নেবেন এবং হেদায়েতের প্রদীপ নিভিয়ে দেবেন। আপনি সেই সময়কার কোনো আলেমের সাথে দেখা করলে সে আপনাকে বলবে যে, সে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে অথচ তার বাহ্যিক চালচলনেই ফুটে উঠবে আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি ও অবাধ্যতা। সেই দিনের বক্তব্য কাজে আসবে না। অন্তঃকরণে নম্রতা থাকবে না। সেই আল্লাহর শপথ! যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। এর একমাত্র কারণ হলো আলেমগণ জ্ঞান শিখেছেন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে আর ছাত্ররাও শিখছে ভিন্ন উদ্দেশ্য লক্ষ্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি কারো উদ্দেশ্য নয়। 

লেখক : মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী, মোফাচ্ছেরে কুরআন ও খতিব, ঢাকা

Category: ঈমান