ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মৃত্যুকে স্মরণ : জীবনকে আলোকিত করে

ইহকাল মানবজীবনের শেষ নয়। মৃত্যুর পরও মানুষের জন্য রয়েছে এক অনন্ত জীবন। প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে মানুষ মারা যাচ্ছে। এভাবে একদিন আমাদেরও মরতে হবে এবং দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা আম্বিয়া : ৩৫ নং আয়াত)।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষা হচ্ছে যে, যে মরে গেল তার আমল করার সুযোগ চিরতরে শেষ হয়ে গেল। মৃত্যু আমাদের জীবনে যে কোনো সময় চলে আসতে পারে কোনো নোটিশ ছাড়াই। এ কঠিন সত্যটাকে যেন আমরা ভুলে না যাই। এ সম্পর্কে হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমরা যাবতীয় স্বাদ বিনষ্টকারী বিষয়টিকে বেশি বেশি করে স্মরণ কর। সেটা হচ্ছে মৃত্যু।’ (তিরমিজি)

মৃত্যু ও আখিরাতকে ভুলে যাওয়া আর দুনিয়ার ধোঁকাবাজিতে পড়ে থাকা চরম বোকামি ছাড়া কিছু নয়। প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিনদের মধ্যে সর্বাধিক বুদ্ধিমান কে?’ তিনি ইরশাদ করলেন, ‘যে সর্বাধিক পরিমাণ মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সদা সচেষ্ট, এ ধরনের লোকেরাই প্রকৃত বুদ্ধিমান।’ (ইবনে মাজাহ)

আমরা সাধারণত কথাবার্তা ও আলোচনায় মৃত্যু বিষয়টিকে সাবধানতার সঙ্গে এড়িয়ে যাই। এমন ভীতিজনক বিষয় মুখে উচ্চারণ করতে চাই না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করে নসিহত হাসিল করা দরকার। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে রাসুল (সা.)-এর উপস্থিতিতে আলোচনা হচ্ছিল। তার বহুবিদ সুকর্মের প্রশংসা করা হচ্ছিল। তা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেই লোকটি কি মউতের কথা স্মরণ করতো?’ তারা বললেন, ‘মৃত্যু সম্পর্কে তিনি আলোচনা করেছেন বলে কখনও শুনিনি।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সে সেথায় নেই।’ অর্থাত্ মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতন না থাকলে, কোনো ব্যক্তি কল্যাণ অর্জন অব্যাহত রেখেছে এমন চিন্তার অবকাশ নেই। কিছু কিছু সময় আমরা মৃত্যুর কথা আলোচনা করেও থাকি। কিন্তু গাফেল হৃদয়করণ থেকে আসার কারণে তা হৃদয়ে কার্যকর প্রভাব ফেলে না। সাহাবি হজরত আবু দারদা (রা.) সে বিষয়টিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘মৃতদের কথা আলোচনা হলে, তুমি নিজেকে তাদের মধ্যে গণনা কর।’

কিন্তু ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রবল আকর্ষণ চারদিক থেকে আমাদের এমনভাবে ঘেরাও করে ফেলেছে যে, মৃত্যু এবং আখিরাত সম্পর্কে ভুলে গেছি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন, ‘এ পার্থিব জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়, পরকালীন জীবনই হলো প্রকৃত জীবন।’ এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে বিষয়টি শঙ্কিত, সেটা হচ্ছে নফসের খায়েশ আর লম্বা লম্বা আশা। নফসের খায়েশ মানুষকে হক থেকে গোমরাহ করে ফেলে। আর লম্বা লম্বা আশা-আকাঙ্ক্ষা মানুষকে আখিরাত থেকে ভুলিয়ে দেয়। (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।

অপর হাদিসে আছে, নবী করিম (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের সবাই জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও?’ তারা বললেন, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে আশা-আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দাও। মৃত্যুকে তোমাদের চোখের সামনে রাখ। আর আল্লাহর সামনে সঠিকভাবে লজ্জিত হয়ে ( গোনাহসমূহ থেকে দূরে) থাক।’ মৃত্যুর পরবর্তী জীবনই আখিরাত বা পরকাল। আর এ জীবনই প্রকৃত জীবন। দুনিয়াতে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা দুটি কারণে হয়ে থাকে। প্রথমত, দুনিয়ার প্রতি মোহ অর্থাত্ পার্থিব জীবনের সম্পদ, আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ।

আখিরাতকে ধোঁকা দিয়ে বলতে থাকে, এত সকাল আখিরাত সম্পর্কে চিন্তা করার দরকার নেই। জীবনে অনেক সময় রয়েছে, বয়স্ক হলে এসব চিন্তা করা যাবে। এভাবে একটি ঝামেলা শেষ হওয়ার আগেই আর একটি ঝামেলা এসে পড়ে, আর এভাবেই একদিন মৃত্যুর পরওয়ানা হাজির হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, অনেকেই ধোঁকায় পড়ে যায় যে, আমি তো এখনও বুড়ো হইনি। কাজেই এ মুহূর্তে মৃত্যুর সম্ভাবনা নেই। প্রত্যেক মানুষের মনে আশা এমন যে, এত তাড়াতাড়ি কি মরে যাব? যদিও অনেক মানুষ বৃদ্ধ হয়ে মারা যায়, কিন্তু বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিশোর-যুবক থাকাবস্থায় কি অসংখ্য লোকের মৃত্যু ঘটছে না? এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন তুমি সকাল করবে, সন্ধ্যাবস্থা পর্যন্ত নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকবে, এমন আশা করো না। আর যখন সন্ধ্যা করবে, সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে—এমন নিশ্চিত আশা করে থেকো না।’ (বোখারি)।

তাই মৃত্যুকে সবসময় স্মরণে রেখে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সহিহ ঈমান ও নেক কাজ করার তাওফিক চাই। মৃত্যুর স্মরণ ও পরকালের প্রস্তুতি আমাদের জীবনকে সুশোভিত ও আলোকিত করে। মানুষের পার্থিব জীবনের কৃতকর্মের যথাযথ পরিপূর্ণ ফল ভোগ করার জন্য একটি অনন্ত জীবন রয়েছে, আর সেটাই হচ্ছে আখিরাত। মৃত্যুর পর আমরা সে অন্তহীন জীবনেই প্রবেশ করব।

Category: ঈমান