ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

অশালীনতার কুফল

আমাদের বর্তমান জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নারীসমাজ। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্বক্ষেত্রে ইসলাম নারীসমাজকে যথাযথ অধিকার প্রদান করলেও বর্তমান যুগে নারী অধিকারের বিষয়টি বিশ্বময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলা হয়েছে। শিল্পোন্নত পশ্চিমা দেশগুলো রয়েছে এর নেপথ্যে এবং তারা এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে যে, নারীর প্রতি ইসলামের আচরণ নিবর্তনমূলক, পর্দা প্রথা প্রগতির অন-রায়।

ইউরোপ-আমেরিকার এ নারীবাদীরা এবং দেশীয় একটি বিশেষ মহল এটাও মনে করে, ইসলামী রাষ্ট্র বা সামাজিক জীবনে ইসলামী বিধান কায়েম হলে নারী অধিকার বিপন্ন হবে, তাদের অকার্যকর করে রাখা হবে এবং জাতীয় উন্নতির পথে প্রতিবন্ধকতা গড়ে উঠবে। প্রকৃতপক্ষে কথাটি সত্য নয়; ইসলাম নারীকে গৃহবন্দী ও নিষ্ক্রিয় রাখতে চায় এমন নয়; বরং জাতীয় জীবনের উন্নতি-অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনের তাগিদ দেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম নারীকে একটি শর্তে কাজে উদ্যমী হতে উৎসাহী করে, আর তা হচ্ছে নিজের মান-সম্ভ্রম রক্ষার্থে পর্দা করে বা শালীনতা বজায় রেখে এগিয়ে যেতে।

পর্দা হচ্ছে ভিন্ন পুরুষ (যাদের সাথে দেখা দেয়া বৈধ নয়) থেকে নিজের মনের পবিত্রতা ও নৈতিকতা রক্ষা করা। পর্দা হচ্ছে যৌন জীবনকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ রাখা। পর্দা হচ্ছে নারী-পুরুষের অবাধ ও অবৈধ মেলামেশার দ্বার রুদ্ধ করা। পর্দা আরবি ‘হিজাব’ শব্দের প্রতিশব্দ। পর্দা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন একটি কল্যাণকর বিধান, যা মানুষকে পাশবিক উচ্ছৃংখলতা ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে হেফাজত করে এবং মানবিক মর্যাদার উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করে।

সমাজের মধ্যে যাতে যখন-তখন যৌন উত্তেজনা, ব্যভিচার ও কামনার ভাবধারা জাগ্রত হতে না পারে, এ জন্যই মহান আল্লাহ সমাজ সংশোধনের জন্য প্রথম পদক্ষেপ স্বয়ং মহানবী সা:-এর গৃহ থেকেই শুরু করেছেন। পরে সর্বসাধারণ মুমিন নারী-পুরুষদের সম্বোধন করেও এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবী সা:-এর ঘরে নিঃসঙ্কোচে ও অবাধে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! … তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছ থেকে কিছু চাইলে পর্দার অন-রাল হতে চাইবে।’ (সূরা আহযাব, আয়াত ৫৩)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পুরুষ ও নারীকে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণীয় করে সৃষ্টি করেছেন। এটি একটি স্বভাবগত ব্যাপার। কিন’ এ আকর্ষণকে নিয়ন্ত্রণহীন করলে তা সমাজকে কলুষিত করে ধ্বংসের গহ্বরে নিক্ষেপ করে। সমাজে জেনা-ব্যভিচার মহামারীর আকার ধারণ করে। তাই সমাজদেহকে কলুষমুক্ত রাখতে এবং অন-রকে শয়তানি চিন-াভাবনা থেকে পবিত্র রাখতে ইসলাম নারীকে পর্দার বিধান মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো কাছে তাদের আভরণ প্রকাশ না করে।’ (সূরা আন নূর, আয়াত ৩১)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টানিয়ে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না।’ (সূরা আহজাব, আয়াত ৫৯)।

ইসলামে পর্দার অর্থ চার দেয়ালের মধ্যে অবরুদ্ধ থাকা নয়। মহানবী সা:-এর আমলে মেয়েরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করত, সৈনিক পরিচালনা করত, আহতদের সেবা করত, নামাজের জামাতে হাজির হতো, হাটে-বাজারে যেত, এমনিভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে তারা অংশগ্রহণ করত, তবে তা ছিল শালীনতার মাধ্যমে। ইসলাম পর্দাকে নারীর সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ মনে করে। এর অর্থ অন্তরীণ থাকা নয়। প্রয়োজনে পর্দা তথা শালীনতার আবরণে নিজেকে যেকোনো স’ানে যাওয়ার স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘হে নবী! আপনি মুমিনদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের চোখ নিচের দিকে অবনত রাখে এবং গোপন অঙ্গের হেফাজত করে। আর মুমিন নারীদের বলে দিন, তারাও যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং গোপন অঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ছাড়া তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে, তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে।’ (সূরা আন নূর, আয়াত ৩১)।

পর্দার উপকারিতা অনেক। যে সমাজের নারীরা পর্দায় থাকে সে সমাজ আশা করতে পারে একটি নিদাগ পবিত্র বিধৌত আলোকিত মা জাতির। যে জাতি সমাজকে উপহার দেবে একটি পরিচ্ছন্ন আলোকময় নতুন প্রজন্ম। যাদের পরশে সোনা হয়ে উঠবে সমাজ সভ্যতা ও দেশ। সভ্য সতী নারী যে সমাজে নেই সভ্য প্রজন্ম সে সমাজ পাবে কোথায়? তা ছাড়া সভ্য প্রজন্ম ছাড়া কি কোনো সমাজ সভ্য হতে পারে?

পর্দা পালনের পেছনে যেমন রয়েছে শত-সহস্র সুফল, তেমনি পর্দাহীনতার কারণে দেখা দিচ্ছে হাজারো কুফল। নিম্নে এর কিছু দিক তুলে ধরা হলো- পর্দাহীনতার কারণে নেমে আসছে নারী নির্যাতন, বিঘ্নিত হচ্ছে নারীর নিরাপত্তা, যৌতুক প্রথার প্রচলন, কন্যাদায়গ্রস-তা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ইভটিজিং, স্বামী কর্তৃক স্ত্রী হত্যা, নারীদের আত্মহত্যার হিড়িক, বিবাহ বিচ্ছেদ, যৌনাচার বৃদ্ধি, নারী ধর্ষণ ও বলাৎকার, নারী অপহরণ, নারী পাচার, পতিতাবৃত্তি বৃদ্ধি, চরিত্রহীনা বৃদ্ধি, দাম্পত্য কলহ বৃদ্ধি, যুবসমাজের চরিত্রহনন, জাতির ভবিষ্যৎ বংশধরদের মেধাহীনতা, নারীদের ভোগ্যপণ্যে পরিণত করা প্রভৃতি।

পর্দাহীন জীবনব্যবস’া, অশ্লীলতা ও অবাধ মেলামেশা মানুষের ধ্যান-ধারণা, চিন-া-চেতনা ও চরিত্রের এমন এক ভয়াবহ রূপ, যা মানুষকে পশুর চেয়েও নিচে নামিয়ে দিতে পারে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি দেশের দিকে নজর বুলালে এর সত্যতার প্রমাণ মেলে। পুঁজিবাদী সভ্যতা নারীকে গৃহাভ্যন্তর থেকে টেনে এনে কাঁচামাল বানিয়ে সেক্স ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে আন-র্জাতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। আর তাই ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ইত্যাদি দেশের পর্যটন শিল্পগুলো সবই নারীকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। পর্দাহীন সভ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে ফ্যাশন, মডেলিং ও প্রস্টিটিউশন সার্ভিস আজ সারা বিশ্বে একটি শিল্প ও সম্মানজনক (?) সার্ভিস হিসেবে ক্রমান্বয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সমকামকে আইনত সিদ্ধ করা হচ্ছে ও করার জন্য জোর আন্দোলন চলছে।

তথাকথিত অধিকার শোভিত দেশ আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, নরওয়েতে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন করে নারী নির্যাতিত হচ্ছে এবং ৮ মিনেটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এসব কিছু জানার পরও আমাদের দেশের কিছু ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তি উঁচু গলায় বলে বেড়ায়, ইসলামের হিজাব বা পর্দা প্রথা মুসলিম মহিলাদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের কারণে জাতীয় উন্নয়ন ও প্রগতি বাধাগ্রস- হচ্ছে। কাজেই জাতীয় উন্নতি ও প্রগতি চাইলে মুসলিম মহিলাদের হিজাব বা পর্দা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে।

মুক্ত বিহঙ্গের মতো বন্ধু-বান্ধবীর হাত ধরে ঘুরে বেড়ানো, ফ্যাশনের নামে বেলেল্লাপনা, নাইট ক্লাবে গিয়ে ভিন্ন পুরুষের সাথে রাত কাটানো, অফিসের বসকে নিয়ে কিংবা অফিসের পিএ বা পিএসকে নিয়ে প্লেজার ট্যুরে যাওয়া- এগুলো যদি প্রগতি হয় তাহলে ইসলাম তথাকথিত এ প্রগতির ঘোর বিরোধী। আর যদি প্রগতি বলতে নারী-পুরুষ স্ব স্ব ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়া বুঝায়, আদর্শ পরিবার, আদর্শ সমাজ ও জনকল্যাণমূলক আদর্শ রাষ্ট্র বুঝায়, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ বোঝায় তাহলে ইসলাম সেই প্রগতির বিরোধী তো নয়ই বরং ইসলামই তার প্রবক্তা।

আজো যদি নারী স্বাধীনতা সত্যিকার অর্থে পেতে হয় তাহলে তার একমাত্র পথ হচ্ছে, মহানবী সা: প্রদর্শিত আদর্শ যেখানে নারীদের রয়েছে পূর্ণ মর্যাদা। প্রগতির নামে আধুনিক বিশ্বে যা চলছে তা নারী নির্যাতন ও সামাজিক ক্ষেত্রে নৈতিক অবক্ষয়েরই নামান-র। এ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হচ্ছে মহান আল্লাহ প্রদত্ত ও মহানবী সা: প্রদর্শিত শাশ্বত জীবনাদর্শ আল ইসলামের পর্দা প্রথার বাস-ব অনুসরণ।

লেখক : ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান, শিক্ষক ও প্রবন্ধকার