ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আখিরাত বা মরণোত্তর জীবন

মানুষ এ পৃথিবীর জীবনে যা কিছু কাজ করছে, সব কিছুর রেকর্ড সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে এবং বিচারের দিন তা পেশ করা হবে। এ পৃথিবীতেও এর প্রমাণ আজ আমরা পাচ্ছি। আগেকার দিনে মানুষ মনে করত, যে আওয়াজ মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, বাতাসের ওপর তা কিছুটা তরঙ্গ সৃষ্টি করে শূন্যে মিলিয়ে যায়। কিন’ আজকের দিনে গবেষকেরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কী করে অতীতে একজন মানুষ যেসব কথাবার্তা বলেছে, তা পুনরুদ্ধার বা শনাক্ত করা যায়।

তারা এ কাজে সফলতার দিকেও এগিয়ে যাচ্ছেন। কম্পিউটার আবিষ্কারের পর এসব কাজ আরো সহজতর হয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ বলার পর তা ওই স’ানে সি’র থাকে না। তা অদৃশ্য হয়ে যায় এবং বিশ্বময় বায়ু তরঙ্গের সাথে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ‘জড় ও শক্তির অবিনশ্বরতা তত্ত্ব’ অনুযায়ী তা অক্ষয় থাকে। এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অতীত শব্দগুলোকে পুনরুদ্ধার বা শনাক্ত করা বৈজ্ঞানিকভাবে পুনরুত্থান এবং আমাদের সম্পূর্ণ আমলানামা যে সংরক্ষিত হয়ে আছে এবং তা যে পুনরায় হাজির করা সম্ভব তা প্রমাণ করে।

আল্লাহ তায়ালা হাশরের দিন আদালত বসাবেন, ন্যায়নীতি অনুযায়ী আমাদের ভালো-মন্দ কাজের পুরস্কার ও শাস্তি বিধান করবেন। এটাকে কে অসম্ভব বলতে পারে? এর মধ্যে কোন কথাটি যুক্তিবিরোধী? যুক্তির দাবিই তো হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইনসাফের আদালতে ন্যায়নীতি অনুযায়ী সব কিছুর সিদ্ধান্ত দেবেন।

জীবনের ওপর আখিরাতে বিশ্বাসের প্রভাব : আখিরাত সম্পর্কে ইসলামী মতবাদ মানুষের পার্থিব জীবনের কল্যাণের জন্য খুবই জরুরি। এতে কোনোরূপ অকল্যাণ নেই। তবে অন্যান্য বিষয়ের মতো একত্রেও যদি বাড়াবাড়ি হয়, তাহলেই দেখা দেয় বিপত্তি। বাড়াবাড়ি, গোঁড়ামি ও কুসংস্কার না থাকলে আখিরাতের মতবাদ পৃথিবীতে মানুষকে ভালো কাজের প্রেরণা জোগায় ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।

বিশ্ব প্রকৃতির স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী সব কিছুরই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। প্রতিটি বস’র বৈশিষ্ট্য ও পরিণতি রয়েছে। এখানে এমন কিছু নেই, যার কোনো প্রভাব ও পরিণতি নেই। এ পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু করে সব কিছুরই প্রভাব ও পরিণতি রয়েছে। ভালো কাজের ভালো ফলকে সওয়াব বা পুণ্য এবং মন্দ কাজের মন্দ ফলকে পাপ বা গুনাহ বলা হয়। বিষয়টাকে সহজবোধ্য করা হয়েছে বেহেশত ও দোজখের ধারণার মাধ্যমে। বেহেশতে পুণ্যবানদের জন্য অজস্র নিয়ামত রাখা হয়েছে, যা কোনো দিন শেষ হবে না, অনন্তকাল ধরে চলবে। আর দোজখে পাপীষ্ঠদের জন্য রাখা হয়েছে যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি, যা পাপের পরিধি অনুযায়ী দীর্ঘায়িত হবে।

প্রকৃতিতে আল্লাহ তায়ালা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, সবই এক মহাপরিকল্পনার আওতায় একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের সৃষ্টিও এর বাইরে নয়। আগুনের সৃষ্টি যেমন দাহ করার জন্য, মানুষের সৃষ্টি তেমন স্রষ্টার আনুগত্য করার জন্য। তখন এই আনুগত্য যদি কোনো মানুষের কাছ থেকে পাওয়া না যায়, তাহলে নিশ্চয়ই তার একটি পরিণাম বা প্রতিফলন থাক জরুরি। এটা এ জন্য নয় যে, এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা নিজ ক্রোধ প্রশমিত করেন। বরং এ জন্য যে, এর দ্বারা ইনসাফ বা আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন স্রষ্টার আনুগত্য করল, আরেকজন করল না, নিশ্চয়ই তাদের ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য থাকা ইনসাফের জন্য জরুরি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন : ‘যে ব্যক্তি পুণ্য কাজ করল, সে নিজের স্বার্থে করল এবং যে খারাপ কাজ করল, এর দুর্ভোগ সে নিজেই ভোগ করবে এবং তোমার প্রতিপালক নিজ বান্দার ওপর জুলুম করেন না।’ (৪১ : ৪৬)।

মন্দ কাজের প্রতিফলকে আল্লাহ তায়ালার গজব, ক্রোধ বা প্রতিশোধ ভাবতে গিয়ে মানুষ সব সময় ভুল করেছে। প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপকে প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে মানুষ এটাকে আল্লাহ তায়ালার গুণের সাথে একাকার করে আল্লাহ তায়ালাকে ভয়াবহরূপে কল্পনা করতে শিখে ফেলে। যিনি মানুষকে একটি যথাযথ ও অনুপম কাঠামো দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, লালন-পালন করছেন এবং প্রতিনিয়ত রহমত বর্ষণ করছেন, তাদের ওপর তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে প্রতিশোধ নেবেন, তাতে কোনো জ্ঞান-বুদ্ধিই সায় দেয় না। এটা একটা অযৌক্তিক ভাবনা বৈ কিছু নয়।

প্রকৃতির রীতিনীতি প্রত্যক্ষ করলে সহজেই দেখা যায়, মন্দ কাজের প্রতিফল কোনো প্রতিশোধ নয়, ইনসাফ। আর এই ইনসাফও বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কিছু নয়। যদি বিশ্ব প্রকৃতির প্রতিফল দানের ব্যবস’া না হতো কিংবা সুন্দররূপে গড়ে তোলার জন্য ভাঙার ব্যবস’া না থাকত, তাহলে ইনসাফের অস্তিত্ব থাকত না। গোটা বিশ্ব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত।
আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির এই বিশাল কারখানাটি টিকে থাকার জন্য রবুবিয়াত (প্রতিপালন), রহমত (দয়া) ও আদালতের (ইনসাফ) মুখাপেক্ষী। এ তিনটি হলো সৃষ্টি জগতের মৌলিক ভিত্তি! আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টিস্পৃহা ও ক্ষমতা থেকে নিখিল সৃষ্টিজগৎকে রূপদান করেছেন। আর তাঁর প্রতিপালন স্পৃহা প্রতিটি সৃষ্টির পালিত ও বর্ধিত হওয়ার সব ব্যবস’া সুসম্পন্ন করে চলেছে। এই প্রতিপালনের প্রয়োজনীয় সব বস’ এমন অসাধারণ শৃঙ্খলার সাথে সরবরাহ করা হচ্ছে যে, প্রতিটি সত্তার জীবন ধারণ ও পরিপোষণের জন্য যখন যা প্রয়োজন, তখনই তা মিলছে। যেন তিলে তিলে সব কিছু হিসাব করে রাখা হয়েছে।

মানুষ যদি সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাহলে দেখতে পাবে, নিখিল জগৎব্যাপী সুষম সৃষ্টির একক বিধান। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস’র গঠন কৌশল অত্যন্ত সুষম, বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে, বিশেষ এক নিয়ম-নীতির অধীনে এগুলোকে গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো বস’ই উদ্দেশ্যবিহীন নয়, কল্যাণ ছাড়া নয়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে : ‘আল্লাহ মহাকাশ ও পৃথিবীকে সুকৌশলে কল্যাণকর করে সৃষ্টি করেছেন। এর ভেতর নিশ্চয়ই মুমিনদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’

সৃষ্টি জগতের সব বস’রই একটি লক্ষ্য ও শেষ পরিণতি রয়েছে। সুতরাং মানুষেরও একটা উদ্দেশ্য ও শেষ পরিণতি রয়েছে। আর তা হচ্ছে- আখিরাতের জীবন। এমনটা তো হতে পারে না যে, সৃষ্টিজগতের সেরা সৃষ্টি মানুষ শুধু জন্ম নেবে, পানাহার করবে, কিছু দিন পর মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, কোনো পরিণতি ব্যতিরেকে ছেড়ে দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে : ‘তোমরা কি মনে করেছ যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? নিখিল জগতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ উদ্দেশ্যহীনভাবে কিছু করার স্তর হতে অনেক ঊর্ধ্বে। পবিত্র আরশের অধিপতি মহান প্রভু ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই’ (২৩ : ১১৫-১১৬)।

প্রকৃতিতে যা কিছু হচ্ছে, সব কিছুই যথাযথ ও সুন্দরভাবে হচ্ছে। কোনো ত্রুটি বা অসঙ্গতি নেই। কারণ সৃষ্টির প্রকৃতির ভেতরে স্রষ্টার দয়া বা রহমত কাজ করছে। আর রহমতের দাবি হলো সুন্দর, কদর্য নয়। গভীর মনোযোগের সাথে প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রকৃতির সব কিছুতেই একটি সুশৃঙ্খল অবস’া বিরাজ করছে এবং একই সাথে কল্যাণকর কার্যকারিতার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। এতে মনে হয় যেন সমগ্র সৃষ্টিজগৎটি মানুষের কল্যাণ দানের ও যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস’ই কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং কোনো না কোনো প্রভাব সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে, যা মানুষের কোনো না কোনো প্রয়োজনে আসে। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, বাতাস, বৃষ্টি, নদী, সাগর, পাহাড়, মাটি, মাটির ভেতরের খনিজসম্পদ সব কিছুরই বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা রয়েছে, যা মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের উপকরণ দান করে।

রহমতের বদৌলতে সৃষ্ট এই সেরা সুন্দর মানুষের স’ায়িত্ব কেবল দুনিয়ার কয়েকটি দিনের জন্য তা জ্ঞান ও যুক্তি বিচারে টিকে না। জ্ঞান ও যুক্তিই মানুষকে অনন্তকালের দিকে টেনে নিয়ে যায়, যা ইসলামের মরণোত্তর জীবন তথা আখিরাতের ধারণায় পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজিদে বর্ণিত হয়েছে : ‘তারা কি লক্ষ করেনি যে, আল্লাহ যিনি মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অনুরূপ (মানুষ দ্বিতীয়বার) সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন? তিনি যে তাদের জন্য আয়ুষ্কালও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এত সব সত্ত্বেও সীমালঙ্ঘনকারীরা সত্যকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কোনো পথ গ্রহণ করতে অস্বীকার করল’ (১৭ : ৯৯)।

জড় জগতের সব কিছুরই এক অবস’া থেকে অন্য অবস’ায় পরিণতি লাভ করতে বিশেষ এক সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ঠিক সেভাবেই প্রতিটি কাজের পরিণতি দেখা দেওয়ার জন্যও বিশেষ সময় নির্ধারিত রয়েছে। ব্যক্তিজীবনের ভালো বা মন্দ কাজের ফল যে পার্থিব জীবনের সাথে না জড়িয়ে পরকালের জীবনের জন্য রেখে দেয়া হয়েছে, তা আল্লাহর রহমতের কারণে।

রহমত ব্যক্তি জীবনকে দুভাগে ভাগ করে দিয়েছে। একটি পার্থিব জীবন, যেখানে ব্যক্তিকে কর্মের পুরোপুরি সুযোগ দেয়া হয়েছে। অপরটি আখিরাতের জীবন, যেখানে সব কর্মের ফল দেয়া হবে। প্রকৃতির সব কিছুতেই আদালত বা ইনসাফ বিরাজ করছে। সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুতেই যদি বিন্দুমাত্র অসামঞ্জস্য দেখা দিতো, তাহলে কোনো সন’ই রূপলাভ করত না।

মহাবিশ্ব ও সৌর জগতের সব কিছুই যথানিয়ম বজায় রেখে আবর্তিত হচ্ছে। সামান্য এ দিক-সে দিক হলে কক্ষচ্যুত হয়ে গোটা সৌরজগতে প্রলয়কাণ্ড সৃষ্টি হতো। প্রকৃতির সব কিছুর মতো মানুষের কর্মফল দানও আল্লাহ তায়ালার আদালত বা ইনসাফ। দুনিয়ার-জীবন যেহেতু ক্ষণস’ায়ী, সেহেতু কর্মফল এই ক্ষণস’ায়ী জীবনে না দিয়ে মৃত্যু-পরবর্তী চিরস’ায়ী জীবনে দেয়াটাও মানুষের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অসীম রহমত। এভাবে আখিরাতের ধারণাটিও মানুষের প্রতি আল্লাহ তায়ালার রহমত। আখিরাতের ধারণা মানুষকে পশু থেকে পৃথক করেছে, পূত-পবিত্র পার্থিব জীবন দান করেছে।

লেখক : মাওলানা এম. আবদুর রব, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন