ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আমাদের উচিত প্রকৃত মুমিনের চরিত্র অর্জন করা

‘তোমরা আল্লাহর রঙে রঙিন হও। আর কে আছে এমন যে, আল্লাহর চেয়ে অধিক রঙিন (সুরা বাকারা ১৩৮)। আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়া অর্থাত্ আল্লাহর গুণের অধিকারী হওয়া। নবী করিম (সা.) এভাবে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হও। অর্থাত্ আল্লাহ রহিম ও দয়াবান; আমরাও অসহায় ও দুর্গতদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করব। আল্লাহ রাজ্জাক বা রিজিকদাতা, আমরাও অনাহারীর মুখে অন্ন তুলে দেব।

মা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, মুমিন বান্দারা উন্নত চরিত্রের দ্বারা গোটা রাত নামাজ আদায়কারী এবং সারা বছর রোজা পালনকারীর মর্যাদায় অতি সহজে পৌঁছে যেতে পারে (আবু দাউদ শরীফ)। দয়া, ক্ষমা, সবর, বিনয়, সত্ স্বভাব, সুন্দর আচরণ মানব চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই উত্তম চরিত্রবানই উত্তম ঈমানদার।

উত্তম চরিত্র বা আখলাক তিন প্রকার

১. আখলাকে হাসানা : কেউ জুলুম করলে সমপরিমাণ বদলা নেয়ার আখলাক।

২. আখলাকে কারিমা : আখলাকে কারিমা হচ্ছে জুলুম করলে তা মাফ করে দেয়া।

৩. আখলাকে আমিমা : জালেমের জুলুম মাফ করে দেয়ার পর তার প্রতি ইহসান বা উপকার করা। উত্তম চরিত্রবান আল্লাহর রেজামন্দির বাসনায় রাগ গিলে ফেলে, সত্ কর্মশীল লোকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, মানুষের সঙ্গে কটুবাক্য ব্যবহার করে না।

‘আল্লাহর কাছে সবচাইতে নিকৃষ্ট ওই ব্যক্তি, যার কটুবাক্যের ভয়ে মানুষ তাকে কিছু বলে না (বোখারি)। চরিত্র যার উত্তম, সে সবসময়ই নীতিবান, মিথ্যাকে সে অন্তর থেকে ঘৃণা করে। অন্তরে পাপ, মুখে তার মধু নয়। সে বিনয়ী, সহিষ্ণু, ভদ্র, সত্যবাদী, সহজ ও সরল।

রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম চরিত্রবানই উত্তম ব্যক্তি (বেদায়াহ)। উত্তম চরিত্রের অর্থ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারী নয়, অন্যায়কে সমর্থনকারী নয়, মানুষের হক নষ্টকারী নয় এবং শুধু মানুষের প্রশংসা লাভের সাধনাও নয়। এমন চরিত্রের মানুষ ঈমান-আমলেও দুর্বল, আল্লাহর কাছে ঘৃণিত ব্যক্তি। মূলত আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হয় উত্তম চরিত্রবানরাই। যারা আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্যই ইবাদত ও নেক আমল করে।

চরিত্র এক মহামূল্যবান সম্পদ। এই পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গেই এর তুলনা হয় না। গোটা বিশ্বের বিনিময়ে তা ক্রয় করা যায় না। চরিত্র খারাপ হলে বিদ্যারও কোনো মূল্য নেই। হোক না সে বিদ্যাপতি। মনীষী বলেছেন, ‘চরিত্রহীন বিদ্বানের চেয়ে চরিত্রবান মূর্খও উত্তম।’

নৈতিকতা ও চরিত্রকে সুন্দর এবং মার্জিত করার বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যার নৈতিকতা ও চরিত্র ভালো, সে আল্লাহর রঙে রঙিন। সে তাকওয়ার অধিকারী। আল্লাহর ভয়ে তার অন্তর কম্পমান। উত্তম চরিত্রই মানুষকে উত্তম ঈমানদার করে। তার মৃত্যুর পর সে মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকে, অমর হয়ে থাকে।

একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ নৈতিক চরিত্রের এবং সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হতে হলে তাকে ছোটকাল থেকেই ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী হতে হবে। মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তার বিধিবিধান ‘আল-কোরআন’ পড়তে হবে, বুঝতে হবে, গবেষণা করে কাজে প্রয়োগ করতে হবে। মানব চরিত্রে যতগুলো মহত্ গুণ থাকতে পারে।

সুন্দর ও মহত্ যা কিছু মানুষ কল্পনা করতে পারে, আমাদের মহানবী (সা.)-এর চরিত্রে এর সবক;টিই অপূর্ব সমাবেশ ও পরিপূর্ণতা দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন আল্লাহর গুণে গুণান্বিত, আল্লাহর রঙে রঙিন। মানুষের মধ্যে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ, যা আমাদের অনুসরণ-অনুকরণ করা অত্যাবশ্যকীয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা আল্লাহর দেয়া বিধিবিধান ও নবীর আদর্শকে কাজে লাগাই না। এ জন্যই আমরা নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি ধর্মীয় আচার অনেকেই পালন করে থাকি, কিন্তু উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে পারি না। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর রঙে রঙিন হই না। ‘নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয়’ (সুরা আলা-১৪)।

একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহপাক যে আদর্শ চরিত্র গঠনের আদেশ দিয়েছেন তার বিন্দুমাত্র আমরা পালন করি না। তাই যদি হতো, তবে আজ আমাদের দেশের এবং বিশ্বের মুসলমানদের এত দুর্দশায় পতিত হতে হতো না। অবাধ যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মারামারি, হানাহানি, অশ্লীলতা, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, হিংসা-বিদ্বেষ এতখানি ছেয়ে যেত না!

কাজেই আমাদের এখন উচিত আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে প্রকৃত মুসলিমের চরিত্র অর্জন করা, নৈতিকতার ভিত্তি ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া। প্রতিটি মানুষ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হলেই কেবল সুনাগরিক হতে পারবে। সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং দেশ গঠন সম্ভব হবে। আল্লাহ তায়ালাও আমাদের ওপর রাজি-খুশি হয়ে যাবেন। আর তখনই আমরা মুক্তচিত্তে ভাবতে পারব, আল্লাহ আমার ‘রব’ রবই আমার সব।