ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আমাদের মানবতাবোধ

আজ সর্বত্র কীসের সঙ্কট চলছে? পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বস্তুটি কী? দোহাই আল্লাহর! একটু ভেবে দেখুন— কোন জিনিসটি বর্তমানে পৃথিবীর নাগালে নেই?  জবাব সংক্ষিপ্তই। সদিচ্ছা নেই। মানুষের মর্যাদা নেই। মানবতা ও মানবাধিকারের মর্যাদা নেই। সে বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে আমাদের মাথা ব্যথাও নেই। দুর্যোগের ঘনঘটা আমাদের মাথার উপর ঘুরপাক খাচ্ছে। এ বিষয়ে সবাই যেন বেপরোয়া। নিজের ভালো-মন্দের চিন্তা তো সবারই আছে কিন্তু সাধারণ মানুষ বা মানবতার ভাবনা কাউকে ভাবায় না।

যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় পৃথিবীজুড়ে কীরূপ বিপর্যয় নেমে আসবে—অনেককেই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা যায়; অথচ প্রকৃতপক্ষে এর ফলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে বাস্তব দরদ অন্তরে অনুপস্থিত। এ ব্যাপারে যারা কিছু একটা করতে পারে, পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে তারাই এসব ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র সবচেয়ে বেশি তৈরি করছে। একটি নতুন মহাযুদ্ধের জন্য পৃথিবীর সব প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হাতিয়ারে শাণ দিচ্ছে। অনাচার ও মন্দ কিছুতে কারও বিরাগ-বিতৃষ্ণা নেই। মানবতার সর্বনাশে কারও যেন কোনোই মাথা ব্যথা নেই।

সন্তানের জন্য বাবার, ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের যে প্রকৃত মমত্ববোধ ও দরদ মানবতার জন্য তেমনি দরদের ভীষণ অভাব পরিদৃষ্ট হয়। মুখের বুলি ও মেকি মমতায় কোনো ঘাটতি নেই। আপনি প্রতীচ্যে আমেরিকা প্রাচ্যে এশিয়ার শেষ সীমানায় গিয়ে দেখুন, সর্বত্র সুন্দর সুন্দর কথামালা পাবেন। যা ভেতর থেকে আন্তরিকতাশূন্য—ফাঁপা। মানবতার জন্য হৃদয়ের কাতরতা কোথাও পাবেন না।

এখানে পুরো জায়গাটিজুড়ে আছে যুক্তি, বুদ্ধি, প্রতিভার একচ্ছত্র আধিপত্য। যেন বিষয়টিকে কোনো ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে আর বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকরা তার ব্যবচ্ছেদ করে চলেছেন। কেউ প্রাণজুড়ানো কথার তুবড়ি ছোটাবে, কেউ বা তারিয়ে তারিয়ে বর্ণনা করবে চমকপ্রদ কোনো কথা! ঘুরেফিরে সবার দৌড় কথার শিল্প পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেছে। কারণ মানবতার সঙ্গে প্রকৃত কারও হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক নেই, সবই বুলি কপচানোর কারবার, মস্তিষ্কের দেন-দরবার।

আজ পৃথিবীর সব চাওয়া পূরণ হয়েছে। কোনো প্রাপ্তির ঘাটতি নেই। যেকোনো চাহিদা পূরণ করার সবরকম উপায়-উপকরণ, প্রযুক্তি-অবলম্বন আমাদের আছে। আমরা যদি ভালো হতে চাই, আমরা যদি মানুষের সেবা করতে চাই, মানুষকে বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে চাই, পৃথিবীর উত্তর কিংবা দক্ষিণ মেরুতে অবস্থানকারী কোনো মানুষের উপকারও করতে চাই—তবে আল্লাহ আমাদের সেই উপায় দিয়েছেন। আমরা তা করতে পারি সহজেই।

মনুষ্যত্ব চর্চা, ভালো চিন্তা, ভালো কাজ, সুপথ অনুসরণ, পরোপকার সর্বোপরি পৃথিবীতে বেহেশতি পরিবেশ তৈরির যে সুযোগ-সুবিধা এখন আমাদের হাতের কাছে—বর্তমান অতীতে তা ছিল না। দুর্ভাগ্যের বিষয় মানুষ আজ সবকিছু করতে পারে কিন্তু করার ইচ্ছে রাখে না। কেন তার সে ইচ্ছে জাগে না? কারণ এ কাজের উপকারিতা সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। উপকারিতা তার সামনে কেন নেই? কারণ সে বিশ্বাস তার নেই।

আছে কেবল নিজের আরাম-আয়েশ, যথেচ্ছ ভোগবিলাস, ইন্দ্রীয় সেবা, সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনের জন্য সুযোগ-সুবিধা অর্জন ও সমৃদ্ধি চিন্তা। হয়তো সে ভয়ানক সময়টি বেশি দূরে নয় যেদিন এই আত্মকেন্দ্রিক মানুষটি নিজের সন্তানকেও ভুলে যাবে! এই আত্মকেন্দ্রিকতা চর্চায় মানুষের এমন ‘অগ্রযাত্রা’ যদি অব্যাহত থাকে তবে এক সময় মানুষ নিজের মা-বাবা ও সন্তান-সন্ততিকেও ভুলে যাবে। সে কেবলই নিজের উদরপূর্তি ও নিজের সুখ-শান্তির কথা ভাববে। তার সামনে মা-বাবা ও সন্তান-সন্ততির ক্ষুিপপাসায় কাতরতা তাকে স্পর্শ করবে না।

কোরআনের ভাষায়—তারা আল্লাহ ভুলে যাওয়াতে আল্লাহ তাদের আত্মবিস্মৃতির পথে ঠেলে দিয়েছেন। চূড়ান্ত পরিণতিতে সবার জন্য শিক্ষণীয় দৃশ্যপট হাজির হয়েছে তা হলো, মানুষ নিজের উদরপূর্তির ব্যাপারে সজাগ থাকছে কিন্তু নিজের ব্যাপারেও তার হুঁশ নেই। সারকথা দাঁড়ালো, মানুষের বিষয়াশয় তার মনকে ঘিরে আবর্তিত হয়। মনকে কেন্দ্র করে যা কিছু ঘটছে সবই মানুষের সদিচ্ছার ব্যাপার। যদি এ জিনিসটি গড়ে নেয়া যায়, সত্ মনোবৃত্তি ও সদিচ্ছাকে শক্তিশালী করা সম্ভব হয় আর কোনো দুর্ভাবনাই থাকে না। বাদ-বাকি সবকিছুই মাধ্যম আর উপলক্ষ। যার সবই সেই সদিচ্ছার অনুগামী। যা আল্লাহ প্রদত্ত শক্তিতে মানুষ নিজের মধ্যে তৈরি করে নিতে পারে।