ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আল্লাহর অপূর্ব নেয়ামত ভাষা

banglaহৃদয় নিঃসৃত সুপ্ত আবেগ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ‘মাতৃভাষা’। মাতৃভাষায় আমরা দৈনন্দিন জীবনে মনের ভাব প্রকাশ করি। পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্রই আমাদের প্রধান হাতিয়ার প্রিয় ‘মাতৃভাষা’। প্রতিটি মানুষের কাছে মাতৃভাষা সর্বাধিক প্রিয়। মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ-শ্রদ্ধা থাকে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার মতোই। অকৃত্রিম-খাঁটি ভালোবাসা থাকে মাতৃভাষার প্রতি। ‘বাংলা’ আমাদের মাতৃভাষা। জন্মের পর থেকে আবেগ-উচ্ছ্বাস, প্রেম-ভক্তি, আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে আসছি প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায়। মহান প্রভুর কাছে নীরবে নিভৃতে প্রার্থনা ও অন্তরের নিবেদন প্রকাশ করি বাংলায়। বাংলা আমাদের কাছে মায়ের মতো শ্রদ্ধাস্পদ। মাতৃভাষা বাংলাকে যথোচিত মর্যাদা দেয়া আমাদের কর্তব্য। এ ভাষার ওপরই নির্ভর করে আমাদের গোটা অস্তিত্ব।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাতৃভাষার মর্যাদা অনুপাতে বাংলাভাষা উপেক্ষাযোগ্য বা অবজ্ঞার বিষয় নয়। বিশ্বের মানুষ যেন শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয় সেজন্য আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল (আঃ) প্রেরণ করেছেন। এসব প্রেরিত নবী-রাসূল (আঃ) স্বজাতির ভাষাভাষী হয়েই প্রেরিত হয়েছিলেন। কেননা এতে মানুষ সে নবীর ভাষা না বোঝার দরুন বিভ্রান্তিতে নিপতিত হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি যত রাসূলকে প্রেরণ করেছি তা স্বজাতির (তথা স্বগোত্রীয়) ভাষা দিয়েই প্রেরণ করেছি। যেন সে তাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে।’—সূরা ইব্রাহীম-আয়াত-৪-এ মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাত্পর্য উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, দ্বীনের পথে তথা তাওহীদের পথে দাওয়াত দেয়ার জন্য মাতৃভাষায় পারঙ্গম হওয়া আবশ্যক।

কোনো জাতির হেদায়েতের জন্য দায়ী তথা মুবাল্লিগকে অবশ্যই সে জাতির ভাষায় দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। সাবলীল ও স্বচ্ছ সাহিত্যমণ্ডিত ভাষায় মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) আরব গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছেন। আরবি ভাষা ছিল তাঁর ‘মাতৃভাষা’। মাতৃভাষায় হজরত (সা.)-এর দক্ষ তা ও ছিল। কোনো জাগতিক শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থী না হয়েও তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্যে সর্বাধিক নৈপুণ্যের অধিকারী ছিলেন। এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, হুজুর (সা.) ইরশাদ করেন—‘আমি সবচেয়ে বিশুদ্ধ আরবি ভাষী।’

এভাবে প্রিয় নবী (সা.)-র ওপর নাযিলকৃত আল কোরআনের ভাষাও স্বগোত্রীয় আরবি ভাষায়। তদানীন্তন আরবে ভাষা ও সাহিত্যে কার কতটুকু দক্ষতা তা নির্ণয়ের প্রতিযোগিতা চলত। হজরত
(সা.)-র ওপর অবতীর্ণ গ্রন্থের ভাষার প্রাঞ্জলতা দেখে তদানীন্তন সব সাহিত্যিক-কবি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে কুরআনের ভাষার নৈপুণ্য দেখে ইসলামের ছায়াতলে এসে প্রশান্ত হন।

প্রিয় নবী (সা.)-এর মাতৃভাষা যেহেতু আরবি ছিল তাই ধর্মীয় গ্রন্থও আল্লাহতায়ালা মাতৃভাষায় ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে প্রেরণ করেছেন। যাতে সহজেই আরব জাতি একত্মবাদ স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করে। এখানে একটি সূক্ষ্ম তত্ত্ব এই যে, মাতৃভাষায় নবী ও তার ওপর প্রেরিত গ্রন্থ অবতীর্ণ না করলে সে জাতি বুঝবে না। তাই উল্লেখিত আয়াতে আমরা বাংলা ভাষারও গুরুত্ব ও তাত্পর্য বুঝতে পারলাম। কেননা যদি বাংলাদেশে কোনো নবী ও আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করা হতো তবে তা বাংলা ভাষাতেই হতো। সুতরাং মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা ও তাত্পর্য ব্যাপক এবং ধর্মীয় দাওয়াতি মিশন সফল করার জন্য এ ভাষাতে নৈপুণ্য অর্জন পুণ্য বলেও বিবেচিত হবে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও আমাদের কাছে তা অপাঙেক্তয় হয়ে আছে। ভাষার প্রতি আমাদের উন্নাসিকতা বড়ই বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি বাংলা তার যথোচিত মর্যাদা অনুভব করেনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বাংলাকে রক্ষা করতে গিয়ে বীর সন্তানরা বুকের তাজা রক্ত বাংলা বিরোধীদের উপহার দিয়ে ভাষা স্বাধীনতা এনেছিল। সেসব শহীদের অমর ত্যাগে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে আছে। আজ বাংলাকে রক্ষা করার জন্য সালাম, জব্বার, রফিকের মতো তাজা খুন বিসর্জন দেয়ার প্রয়োজন নেই; শুধু প্রয়োজন মমতা দিয়ে গ্রহণ করার এবং শুদ্ধভাবে তা প্রয়োগ করার।

বাংলা ভাষা আমাদের জন্য খোদার নেয়ামতস্বরূপ। তাই খোদার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাতে নৈপুণ্য আনয়ন ও দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। তাহলেই নেয়ামতের প্রতি যথোচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হবে। আমাদের মাঝে এমন অনেকে আছি যারা বাঙালি হয়েও বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞার বিষয় মনে করি। বিষয়টি দরিদ্র পিতামাতাকে তাদের অনুপস্থিতিতে অস্বীকার করারই নামান্তর। সমাজে আমরা অনেকে দু’চার ছত্র ইংরেজি বলে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করি এবং নিজেকে ধন্য মনে করি। দেশের শিক্ষিত সমাজের অর্ধেক অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে অভ্যস্ত। ইংরেজিতে দুর্লভ গবেষণা করেন তুখোড় হাতে। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় তাদের সক্রিয় ভূমিকা নেই বললেই চলে।

নিজের সন্তানদের ভিন ভাষায় পারদর্শী করে তুলতে আমরা স্বপ্রণোদিত কিন্তু বাংলা ভাষা তাকে শুদ্ধরূপে শেখাতে পকেটের টাকা বের হয় না। ভিন ভাষা জ্ঞানার্জনের জন্য শিখতে কোনো বাধা নেই এবং তাতে বাধা দেয়াও যৌক্তিকতাহীন। কিন্তু তাই বলে তো মাতৃভাষাকে জীবন্ত কবর দেয়া যাবে না। আমরা একটু সুস্থ মানসিকতা নিয়ে চিন্তা করলে বিষয়টি কত ভয়াবহ তা উপলব্ধি করতে পারব।

আমাদের আশপাশের বিভিন্ন শ্রেণীর লোক ইংরেজিতে কথা বলাকে সভ্যতা মনে করে, রাস্তার রিকশাচালকও দু’শব্দ ইংরেজিতে বলে গর্ববোধ করে। অফিস-আদালতে পুরোদমে চলে ভিন্ন ভাষার দাপট। এই যদি হয় বাংলার প্রতি আমাদের কৃত্রিম ভালোবাসার নমুনা তাহলে বাহান্নর শহীদানের ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রয়োজনই বা কি ছিল? এ জন্যই কি তাজা খুনে রাজপথ তারা রাঙায়িত করেছিল? আমাদের জাতীয় বিপর্যয় ও বাংলা ভাষার করুণ মর্সিয়া বেশ বেদনাদায়ক ও শোকাবহ। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা মর্যাদাশীল ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সর্বস্তরের মানুষের বিশেষত শিক্ষিত সমাজের উন্নাসিকতা তাকে ব্যাপক মর্মাহত করেছে।

দেশের ধর্মীয় চিন্তাবিদরা এই বাংলা ভূমিকে নিজেদের প্রাণকেন্দ্র বলে জানেন। ইসলামী তাহযীব-তমদ্দুন ও ধর্মীয় বিধান প্রচারকল্পে তারা মুখ্য ভূমিকা রাখেন। বাংলা ভাষীদের কাছে দ্বীনি দাওয়াত সুষ্ঠুভাবে পৌঁছানোর জন্য তাদের মাতৃভাষা বাংলায় পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। মাতৃভাষাকে কোনো যুক্তির বিনিময়ে অবজ্ঞা করার অধিকার নেই। আমাদের আলিম সমাজের অনেকেই মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অনীহা প্রকাশ করি। যুক্তির কষ্টিপাথরে পর্যালোচনা করলে তা নিতান্তই ভুল বলে বিবেচিত হবে। আলেম সমাজের অনেকেই মাতৃভাষা বাংলায় দক্ষতা অর্জনে অনুত্সাহিত হয়ে পড়ি এবং বাংলার প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করি। অথচ তা দ্বীন প্রচারে বাধা সৃষ্টি করে। মুসলিম বিশ্বের অহঙ্কার, ইসলামী শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র.) বাংলাদেশের এক উলামা সেমিনারে বলেন যে, আমার কথা আপনারা লিখে রাখুন। দীর্ঘ জীবনের লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন কিংবা বিমাতাসুলভ আচরণ এদেশের আলেম সমাজের জন্য জাতীয় আত্মহত্যারই নামান্তর হবে।

বাংলা ভাষাকে অন্তরের মমতা দিয়ে গ্রহণ করুন এবং মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বাংলা সাহিত্য চর্চা করুন। কে বলেছে, এটা অস্পৃশ্য ভাষা? কে বলেছে এটা হিন্দুদের ভাষা? বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় পুণ্য নেই, পুণ্য শুধু আরবিতে-উর্দুতে, কোথায় পেয়েছেন এ ফতোয়া? এ ভ্রান্ত ও আত্মঘাতী ধারণা বর্জন করুন। এটা অজ্ঞতা ও মূর্খতা। আগামী দিনের জন্য এর পরিণতি বড় ভয়াবহ। (১৯৮৪ সালের ৪ মার্চ প্রদত্ত ভাষণ) বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের উদাসীনতা দেখে আল্লামা নদভী (র.) আবেগমাখা কণ্ঠে এ কথাগুলো বলে আমাদের সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। জানি না আমাদের বোধোদয় কবে হবে।

বাংলা ভাষার করুণ মর্সিয়া-আহাজারি আজ আমাদের কর্ণ কুহরে প্রবেশ করছে না। এ ভয়াবহ উন্নাসিক মনোভাব শিগগিরই পরিত্যাগ করতে হবে এবং মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বাংলা সাহিত্য চর্চা করতে হবে। ধর্মীয় কর্ণধারদের এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। দ্বীনের প্রসারকল্পে ভাষা নৈপুণ্যের উপকারিতা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই মায়ের মতো অকৃত্রিম ভালোবাসার বাস্তব রূপ দিয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ ও তাতে নৈপুণ্য আনয়নে নবোদ্যমী ও সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদা অনুধাবন করার তাওফিক দান করুন।