ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আল্লাহর ঘর মসজিদ

আল্লাহ কুরআন শরিফে মসজিদকে মাছাজেদাল্লাহ বলায় মসজিদ আল্লাহর ঘর। পুরা জগৎই আল্লাহর, তবে মসজিদকে কাবা শরিফের শাখা হিসেবে আল্লাহর ঘর আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহর নবী সা: বলেন, ‘আল মসজিদু বাইতুল্লাহ’ মানে মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে শয়তান থেকে, শয়তানি কুমন্ত্রণা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যায়। হাদিসে বলা হয়েছে, শয়তান থেকে বাঁচার ঘাঁটি তিনটি। তার একটি হলো আল্লাহর ঘর মসজিদ। শান্তি ও নিরাপত্তার স্থানও আল্লাহর ঘর মসজিদ।

দুনিয়ার জগতে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করার, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও ফরিয়াদ জানানোর, মনের গোপন কথাগুলো গোপনভাবে আল্লাহর কাছে ব্যক্ত করার স্থান হলো মসজিদ। এ কারণে মসজিদ তালাবদ্ধ করে রাখা নাজায়েজ। মসজিদে তালা দিলে আল্লাহর বান্দা আল্লাহর ঘরে এসে তার ইচ্ছা ও সুবিধামতো আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। তাই মসজিদ সব সময় খোলা থাকবে এটাই নিয়ম। কিন্তু এখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিরাপত্তার অজুহাতে দরজা বন্ধ থাকে। বন্ধ রাখতে হয়।

আল্লাহর ঘর মসজিদে অবাধে আল্লাহর ইবাদত করার সুযোগ যেমন থাকতে হবে, কুরআন-হাদিসসম্মত সব ইসলামী কথাও আল্লাহর বান্দাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর ঘর মসজিদে অবাধে বলার সুযোগও থাকতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর ঘর মসজিদ তার স্বীয় মর্যাদা হারিয়ে ফেলবে। মসজিদ যখন বান্দার ইচ্ছা স্বার্থ ও কথামতো পরিচালিত হবে তখন মসজিদ আল্লাহর ঘর থাকবে না, হয়ে যাবে বান্দার ঘর। এ রকম একটি মসজিদ মদিনায় মুনাফেকেরা তৈরি করেছিল যা আল্লাহর নবী সা: হজরত আলী রা:সহ কয়েকজন সাহাবা পাঠিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন। কারণ তারা সে মসজিদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত।

হেদায়েত ও আত্মশুদ্ধির স্থান মসজিদ : কুরআন সুন্নাহর আলোকে হেদায়েত করার ও হেদায়েত লাভ করে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার স্থান মসজিদ। যারা মসজিদে এসে আত্মশুদ্ধি ও হেদায়েত লাভ করতে পারে না তাদের ব্যাপারে আল্লাহর নবী সা: বলেন, ‘তারা কাফেরের মতো আসে কাফেরের মতোই বেরিয়ে যায়।’ আল হাদিস।

এখানে সব মুসলমান কুরআন-ভিত্তিক বয়ান শুনবে। কোনটা জায়েজ, কোনটা নাজায়েজ, কোনটি ফরজ, কোনটি হারাম জেনে নেবে। আল্লাহর কাছে তাওবা এস্তেগফার করবে। কান্নাকাটি করবে। মা চাইবে। নিজের দুঃখ-যাতনার কথা আল্লাহকে জানিয়ে প্রশান্তি লাভ করবে। নিজের ভুলত্র“টি শুধরিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করবে। এ জন্যই মসজিদ মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র। মুসলমানদের শরিয়া, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় যাবতীয় ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পরিকল্পনা ও পরামর্শ গ্রহণের স্থানও মসজিদ। সংেেপ মসজিদ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, মুনাজাত ও প্রার্থনা করার, ইবাদত বন্দেগি ও ফরিয়াদ করার স্থান।

ইসলাম, রাষ্ট্র ও সমাজ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মতবিনিময়ের স্থান মসজিদ। জনগণকে ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও মানবিক প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে হেদায়েত প্রদানের স্থান মসজিদ, এ কারণেই সাপ্তাহিক জুমার দিন সব মুসলমানের পাঞ্জেগানার জোহরের নামাজের পরিবর্তে জামে মসজিদে এসে একত্র হওয়া ফরজ এবং ইমাম সাহেবের খুতবা (ভাষণ) শোনার জন্য ওই সময়ে নামাজ পড়া বন্ধ রেখে চুপ থাকা ওয়াজিব।

প্রিয় নবীর যুগ থেকে মসজিদ এভাবেই আত্মশুদ্ধি, আত্মগঠন সমাজ গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রেখে আসছে। এ কারণেই ইসলামের দৃষ্টিতে মসজিদের এত গুরুত্ব। আল্লাহর নবী সা: বলেন, ‘যে একটি মসজিদ বানাবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর বানিয়ে দেবেন।’ আল হাদিস। মসজিদ যখন ইসলামিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে যথাযথ ভূমিকা রাখতে না পারে তখন মসজিদ, মসজিদ থাকে না। আখেরি জামানায় এসে এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখনকার রাজা-বাদশা ও শাসক শ্রেণী এবং মুসলমানেরা ইসলামবিচ্যুত হয়ে গদি রা ও স্বার্থের জন্য মসজিদের সেই সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার নষ্ট করে দেয়। তাই আল্লাহর নবী সা: বলেন, ‘এমন একটি সময় আসবে যখন মসজিদ সুন্দর সুরম্য বিল্ডিং হবে কিন্তু সেখানে হেদায়েত থাকবে না। আল হাদিস।

মসজিদে দোয়া : আল্লাহর ঘর মসজিদে নাজায়েজ ও গুনাহ হয় এমন দোয়া ছাড়া সব ধরনের দোয়াই আল্লাহর কাছে করা জায়েজ। আল্লাহ বলেন, আমি বান্দার কাছেই আছি, বান্দাহ যখনই ডাকে তখনই সাড়া দিই। আল কুরআন। দোয়া হলো ইবাদতের নির্যাস, আল্লাহর নবী সা: বলেন, দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। (আল হাদিস)। বান্দাহ আল্লাহর কাছে যতই দোয়া করে, আল্লাহ ততই খুশি হন। বান্দা যখন কাতর কণ্ঠে চোখের পানিসহ আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করে তখন আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল না করে থাকতে পারেন না। তবে শর্ত হলো বান্দাকে অন্তর থেকে দোয়া করতে হবে। দোয়া কবুল হওয়ার আস্থা নিয়ে দোয়া করতে হবে। অন্যায়, অনাচার ও সব ধরনের পাপাচার ত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তর থেকে আল্লাহর কাছে মা চাইতে হবে। তাওবা করতে হবে। তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন।

মসজিদের বয়ান : আল্লাহর ঘর মসজিদে আল্লাহর কথা, রাসূলের কথা, মানবতার কথা, মুসলমানদের কল্যাণের কথা, মুসলমান দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির কথা, স্বাধীনতার হেফাজতের কথাসহ দ্বীন-ধর্মের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক সব কথাই বলা যাবে, বলতে হবে। এক কথায় কুরআন ও হাদিসে যাদের ব্যাপারে যে বিষয়ে যত কথা আলোচনা হয়েছে তার সবই মসজিদে আলোচনা ও বয়ান করা জায়েজ। ইসলাম ও মুসলমান এবং মুসলমান দেশের কল্যাণের স্বার্থে কথা বলতে বাধা সৃষ্টি করা নাজায়েজ। ত্রেবিশেষে কবিরা গুনাহ ও হারাম। আল্লাহর ঘর মসজিদে আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের হাদিসের কথা বলতে বাধার সৃষ্টি করা শুধু নাজায়েজ ও হারামই নয় অবস্থাভেদে কুফরিও। এ জন্যই আল্লাহ বলেন, যারা কুফরি করে আল্লাহর পথে চলতে চলতে এবং আল্লাহর কথা বলতে বাধার সৃষ্টি করে তাদের সর্ব আমলই বরবাদ হবে যাবে। আল কুরআন।

মসজিদে সরকার বা কমিটির অথবা দলীয় এমন কোনো কথা বলা, বলতে বাধ্য বা উৎসাহিত করা নাজায়েজ ও হারাম, যে কথা কুরআন সুন্নাহবিরোধী। এমনকি অন্য কোনো ইমাম বা আলেম কোনো কথা বলা জায়েজ মনে করলেও সংশ্লিষ্ট মসজিদের ইমাম ও খতিব ওই বিষয়টিকে নাজায়েজ মনে করলে ওই ইমামকে সে কথা বলতে চাপ সৃষ্টি করা নাজায়েজ। কারণ তাকে তার ঈমান ও এলেম অনুযায়ীই আল্লাহর দরবারে জওয়াব দিতে হবে, অন্য কোনো ইমাম ও আলেমের ঈমান এলেম অনুযায়ী নয়। হ্যাঁ, বিষয়টি যদি দেশের বেশির ভাগ আলেমের এবং মুসল্লিদের মতের অনুকূলে হয় এবং কুরআন-হাদিসের স্পষ্টবিরোধী না হয় তাহলে ইমাম সাহেবের উচিত ওই রকম বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করা।

মসজিদের ইমামের দায়িত্ব : আল্লাহর ঘর মসজিদকে আল্লাহর ঘরের মতো করেই পরিচালনা করা ইমামের দায়িত্ব। কমিটি বা অন্য কোনো মহল মসজিদকে নাজায়েজ কোনো কাজে ব্যবহার করতে চাইলে তা সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ করা ইমামের দায়িত্ব। মসজিদ যেন জায়েজ পন্থায় দেশ, ধর্ম ও মানুষের কল্যাণে ব্যবহার হয় তার প্রতি খেয়াল রাখা ইমামের দায়িত্ব। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানোসহ মুসল্লিদের সঠিক ঈমানি ও কল্যাণময় কাজে পথ দেখানো ইমামের কাজ। ঈমান, ইসলাম, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতাবিরোধী কাজ থেকে মুসল্লি, জনগণ, সমাজ ও দেশকে রা করার ব্যাপারেও ইমাম সাহেবকে সচেতন ও সক্রিয় থাকতে হবে। মসজিদের পবিত্রতা ও নামাজের পরিবেশ রা করাও ইমামের দায়িত্ব।

দায়িত্ব পালনে ইমামের অন্তরায় : ইমাম সাহেব পরিপূর্ণ দায়িত্বানুভূতির সাথে ইমামতি ও ইসলামিক দায়িত্ব পালন করতে চাইলে তার পথে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, মুসল্লি ও কমিটির সদস্যদের ইসলাম সম্বন্ধে অজ্ঞতাই হলো বড় অন্তরায়। মুসল্লি ও মুসলমানদের ইমান ইসলামের দুর্বলতা এবং স্বার্থপর চিন্তাভাবনায়ও কম বাধা নয়। ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন গ্র“পে মুসল্লি ও মুসলমান বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণেও ইমাম সাহেব সঠিক দায়িত্ব পালনে বাধার সম্মুখীন হন। ইমাম সাহেবের কথা, কাজ ও বয়ান কুরআন হাদিসভিত্তিক ও ইসলামসম্মত হওয়ার পরও যখন তা কোনো মহলের বিপে যায় তখন তারা ইমাম সাহেবের বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এবং বিভিন্ন রকমের চক্রান্ত শুরু করে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে চরম গুনাহ এবং মারাত্মক অপরাধ। মসজিদের পবিত্র পরিবেশের সুরায় এবং ঈমানের সঠিক দায়িত্ব পালনে বড় অন্তরায়।

মসজিদে কমিটির দায়িত্ব : আল্লাহর ঘর মসজিদের দেখাশুনা করা, পবিত্রতা রা করা, পরিচালনা করা এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা, গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক ও কুরআনিক দায়িত্ব। মসজিদ গড়া ও পরিচালনা করা জান্নাতিদের চরিত্র। মসজিদ পরিচালনা করতে গিয়ে যদি কেউ অনৈসলামিক কাজকর্ম করে তার পরিণামও দুনিয়া আখেরাতে খুবই খারাপ। তাই মসজিদ কমিটির দায়িত্ব সম্পর্কে জানা কমিটির সদস্যদের জন্য ফরজ। যেন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আল্লাহর ঘর মসজিদকে নিয়েই তারা গুনাহ ও পাপে জড়িয়ে না যায়। দ্বীনদারি ঈমানদারি, নিরপেতা, সততা, যোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি ও ইসলামী জ্ঞান ছাড়াও কুরআন বর্ণিত পাঁচটি গুণ তাদের মধ্যে অবশ্যই থাকতে হবে। গুণগুলো হলো এক. আল্লাহর প্রতি দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস; দুই. আখেরাতে গভীর ভয় ও বিশ্বাস; তিন. নামাজ আদায়ে নিয়মিত ও একনিষ্ঠ; চার. জাকাত আদায়ে আন্তরিক এবং পাঁচ. আল্লাহ ছাড়া আর সব ভয় থেকে মুক্ত থাকা। আল্লাহ বলেন, মসজিদ তারাই রণাবেণ করবে যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে। নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে এবং আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না। আল কুরআন।

ইমাম সাহেব যতণ কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করতে থাকবে, ঈমানি ইসলামি কোনো দুর্বলতা যতণ তার মধ্যে পাওয়া যাবে না, ততণ তাকে সার্বিক সহযোগিতা দেয়া কমিটির দায়িত্ব। ব্যক্তিগত জিদ, অহমিকা, দলীয় স্বার্থপরতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কোন্দল অথবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে ইমাম সাহেবের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত হওয়া শুধু অপরাধই নয়, মসজিদ ও মুসল্লিদের ওপর জুলুম, যা কিছু মূর্খ আলেমের মধ্যেও দেখা যায়। তারা দলীয় লোককে মসজিদে ঢোকানোর জন্য আল্লাহ ও রাসূলের কথাও ভুলে যায়। মুসল্লিদের সুযোগ-সুবিধা ও মসজিদের পবিত্রতার প্রতি খেয়াল রাখা বড় দায়িত্ব। মসজিদ পরিচালনার ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য জানা কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব এবং এ ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য কী তা জেনেই দায়িত্ব পালন করা উচিত। নারী যেন নারীর এবং পুরুষ যেন পুরুষের সব দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারে, সে জন্যই আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমান নারী ও প্রত্যেক মুসলমান পুরুষের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। চরম দুঃখের বিষয়, আজ মুসলমান নামধারী মুসলমানেরা আল্লাহর ঘর মসজিদের ওপরও জুলুম করতে ভয় পাচ্ছে না এবং নিজেদের অজ্ঞতার কারণে মসজিদে বা মসজিদের ব্যাপারে এমন অনেক কাজ করছে যা নাজায়েজ।

লেখক :  মাওলানা আলাউদ্দিন ইমামী খতিব, বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ