ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আল্লাহ জানেন মানুষ জানে না

আল্লাহু ইয়া’লামু অআনতুম লা তা’লামুন। আল্লাহই জানেন আর তোমরা জান না। (আল-কোরআনুল কারীম-২.২১৬, ২.২৩২, ৩.৬৬, ২৪.১৯) মহাশূন্যে সন্তরণশীল পৃথিবী নামক এই অনন্য গ্রহে প্রথম মানবের বিচরণ কত আগে শুরু হয়েছিল তার সঠিক দিনক্ষণ আসমান-জমিন আর আদিমানব আদমের স্রষ্টা রহমানুর রাহীম এক আল্লাহ্ই বলতে পারেন। একই পিতার (৪.১, ৬.৯৮, ৭.১৮৯, ৩৯.৬, ৪৯.১৩) শতকোটি সন্তান সহস্র রূপে পৃথিবীর প্রতি প্রান্তে আজ ঐক্যের বিপরীতে সীমাহীন বিভাজনই ঘোষণা করছে। অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী এরই মধ্যে সময়ের স্রোত পেরিয়ে বিস্মৃত অতীতে পরিণত হয়েছে। অনেক সমপ্রদায় আর সভ্যতাকে ধ্বংস করা হয়েছে। মানবসমাজের মূলোত্পাটনের বহুমাত্রিক বিবরণ কোরআনের পরতে পরতে বিবৃত হয়েছে।

মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ প্রশ্ন করেন : তুমি তাদের কাউকে দেখতে পাও কি? অথবা তাদের কোন মৃদু শব্দ শুনিতে পাও কি? ফাহাল তারা লাহুম মিম বাক্বিয়া (৬৯.৮)-সুতরাং তাদের কাউকে তুমি অবশিষ্ট দেখতে পাও কি? সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে এইসব অসংখ্য ধ্বংসযজ্ঞের পুনঃ পুনঃ উল্লেখ করে একমাত্র স্থায়ী সত্তা ‘যিল জালালী ওয়াল ইকরাম’ (৫৫.২৭) আমাদের কাছে জানতে চান : ফাহাল মিম্ মুদ্দাকির (৫৪.৫১)ু এগুলো নিয়ে ভাববার কেউ আছে কি?

আমি ‘কালো’র সামনে বসা জনৈক ‘সাদা’ আদম সন্তানটি কোন এক দূর অতীতে যে একই যোগসূত্রে বাঁধা ছিল তা মনে করবার কোন তাগিদই আজ আমরা আর বোধ করি না। বিজ্ঞানের যাদুদণ্ড দিয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড় ঘেঁটে সত্যের কতটুকুইবা উদ্ধার করা যায়। যিনি অগ্রপশ্চাত্ সকল জ্ঞানকে, আর সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন সেই আল্লাহ বলেন : অল্লাজিনা মিম্ বা’দিহিম, লা ইয়া’লামুহুম ইল্লাল্লাহ্ (১৪.৯)ু “এবং তাদের (নূহ সমপ্রদায়, আ’দ ও সামুদ জাতি) পর যারা ছিল, তাদেরকে আল্লাহ্ ভিন্ন কেউই জানে না”। আরও বলা হয়েছে : তোমাদের পূর্বে যারা ছিল আমি তাদেরকে জানি, আর তোমাদের পরে যারা আসবে তাদেরকেও আমি জানি। (১৫.২৪)

আমাদের ভ্রান্তিবিলাস তখনও কাটে না যখন জীবন সায়াহ্নে এসে ভাবি : ‘সাগর তীরে নুড়ি কুড়াইতেছি’। আমরা নো-ম্যানস্ ল্যান্ডের ক্ষণিক নিরাপদ অবস্থানে গিয়ে উপনীত হই যখন এই উপলব্ধির উন্মেষ ঘটে যে, ‘শুধু এতটুকুই জানি যে, আমি কিছুই জানি না’, বা কারও এহেন আফসোস তৈরি হয় : ‘মা’লুম হুয়া কেহ্ কুছ না মা’লুম হুয়া’। এমন অনেক বিষয় রয়েছে যে সম্পর্কে আমাদের মোটেই জ্ঞান নেই কিন্তু আমরা তর্কবিতর্ক করে থাকি (ফালিমা তুহাজ্জুনা ফিহা লাইসা লাকুম বিহি ইলমুন; অল্লাহু ইয়া’লামু অআনতুম লাতা’লামুন-৩.৬৬; ২৪.১৯)।

তিনি মানুষকে ওই সব বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। সেই সমান্তরালে অবস্থান নিয়ে আমরা যখন বলি আমাদের জানাজানি ঠিক ততটুকুই যা তিনি তাঁর নবী-রাসুলগণের মাধ্যমে আসমানি কিতাব দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন, তখন স্বস্তি আর নিরাপদ বোধ করি। তখনই প্রশান্তি লাভ ঘটে।

কে আছে এমন যে দাবি করতে পারে, সে মানুষ আর আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছে? দ্বিতীয় কে আছে এমন যে ঘোষণা করতে পারে : আমিই জীবন দান করি, মৃত্যু ঘটাই আর আমারই দিকে সকলের প্রত্যাবর্তন-৫০.৪৩।
বিগত কয়েক শতাব্দীতে বিশ্বের ‘মুক্তবুদ্ধির’ প্রবক্তারা যে মহাগ্রন্থ কোরআনের মহাবিস্ময়কর আলোটাকে গ্রহণ করতে পারল না সেটা এক বড় দীনতা। হয়তো মহাকালের বিচারে এসময়টুকু এতটা পর্যাপ্ত নয়। শিল্প বিপ্লবোত্তর ইউরোপে সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে কেউ কেউ উদ্যোগী হয়েছেন, তরী তীরে ভেড়াতে পারেননি। পার্থিব এটিকেট শেষ পর্যন্ত বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেভাবে ঘটেছিল পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও ব্যক্তিবিশেষের জন্য। ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্ছনা’ উচ্চারণ করেও কি শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই সত্যকে মেনে নেই?

কে আছে তারচে’ অধিক নির্বোধ আর নিজ সত্তার ওউপর সর্বাধিক জুলুমকারী (১৮.৫৭, ৩৯.৩২) যে সেই মহান, মহাবিজ্ঞানময় আল্লাহর শরণ নেয় না একমাত্র যিনি বলতে পারেন, তিনিই জানেন। তারচে’ বড় হঠকারী আর কূপমণ্ডুক কে আছে যে এই জমিনে কোরআনের সত্য প্রকাশিত হবার পর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে-(বাল কায্যাবু বিল হাক্বি লাম্মা জায়াহুম ফাহুম ফি আমরিম্ মারিজ- ৬.৫, ১০.৭৭, ১৮.৫৭, ২৯.৬৮, ৩৪.৪৩, ৪৬.৭, ৫০.৫)? সত্যের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে না- আর সে অহংকারী ও বিমুখ হয়, হক্বের ব্যাপারে স্বেচ্ছা নীরবতা অবলম্বন করে আত্মতুষ্টির রসদ ফেরি করে (২.১৩০, ২.১৩৭, ৩.২০, ৩.৩২, ৪.৮০, ৫.৪৯, ৫.৯২, ৬.৪৬, ৯.৩, ৯৬.১৩; আরও বহু)। স্রষ্টা প্রদত্ত মেধা দিয়ে প্রাপ্ত যশ, খ্যাতি আর পুরস্কারের ভিড়ে চাপা দিয়ে রাখে আপন প্রভুকেই, আর তাঁর বাণীকে।

আমি ‘মহাজ্ঞানী’, কিন্তু আমার জ্ঞান যদি সকল মহাজ্ঞানীর যিনি অভিভাবক তাঁর বয়ান-বিবৃতি থেকে বিসদৃশ হয়, তখন আমার সেই যাবতীয় অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। এ সম্পর্কে কোরআনে উপমা ব্যবহার করেও বলা হয়েছে : “যারা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গেথ কুফরি করে, তাদের কর্মসমূহ ছাইভস্মের মতো যার ওপর দিয়ে ঝড়ের দিনে প্রবল বায়ু বয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করেছিল তার কোন অংশই তাদের কাজে আসে না। এটাই ঘোরতর বিভ্রান্তি”—১৪.১৮।

আল্লাহ্ তাঁর রাসুলকে বলেন : “তুমি বলে দাও, আমি কি তোমাদেরকে তাদের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ঐসব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বিফল হয়েছে, অথচ তারা মনে করে যে, তারা উত্তম কাজ করেছে। তারা এমন লোক, যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলি এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয় অস্বীকার করে। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। অতএব কিয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোন ওজনই দাঁড় করব না। জাহান্নামই তাদের প্রতিফল; যেহেতু তারা কাফের হয়েছে এবং আমার নিদর্শনাবলি ও রাসুলগণকে বিদ্রূপের বিষয় রূপে গ্রহণ করেছে”- ১৮.১০৩-১০৬।

তাই ‘বর্ণাঢ্য ও কর্মময়’ জীবনের অধিকারী ‘প্রগতিশীল’ চিন্তা-চেতনায় তাড়িতদের হুশিয়ার হবার সময় এসেছে।কোরআনের শ্বাশত বাণীকে বর্জন করে ‘আলোকিত মানুষ’ হবার চেষ্টা সূর্যের আলোকে অস্বীকার করে ৬০ অথবা ১০০ পাওয়ারের বালভের আলোয় আলোকিত হবার সাথেই তুল্য হতে পারে। এই কোরআন-বর্জনই এক সময় আমাদের জন্য খেদ আর বিলাপের কারন হয়ে দাঁড়াবে (৬৯.৫১)।

ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণে যেমন এক পিতার সন্তানদের মধ্যে বৈরিতা আর বিভক্তি চলে আসে, তখন তারা তাদের প্রভুকেও খণ্ডিত করে ছাড়ে। বাংলায় প্রবাদ চালু আছে : দশচক্রে ভগবান ভূত। সেই একই পারস্পরিক বিদ্বেষ (বাগইয়াম বাইনাহুম-২.২১৩, ৩.১৯, ৪২.১৪, ৪৫.১৭) মানবজাতিকে আর তার ধর্মাদর্শকে শতধা বিচ্ছিন্ন করেছে।

আল্লাহ যদি চাইতেন, এই বিভক্তিকে মিটিয়ে দিতে পারতেন, সবাইকে এক উম্মতের (উম্মাতাও অহিদাতা- ৫.৪৮, ১১.১১৮, ১৬.৯৩, ৪২.৮) অঙ্গীভূত হতে বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু প্রত্যেকে যাতে তার স্বাধীন ইচ্ছার প্রয়োগ করে নিজেই স্রষ্টার পক্ষ থেকে সেই কাজটি সম্পন্ন করে তাই সেটা তিনি করবেন না, কেননা ‘লা ইকরহা ফিদ্ দ্বীন’ (২.২৫৬)- ধর্মে কোন জবরদস্তি নেই।

অবিশ্বাসে পাথরের টুকরোগুলো আর কতকাল আর্তনাদ করবে? প্রতিনিধিত্বের সুমহান দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েও এই আমাদের দ্বারা তার কোনোই হক্ব আদায় হলো না। আর কতকাল মানবসভ্যতা মিথ্যার ঘানি টেনে যাবে? আর কতকাল, কত শতাব্দী? কত সহস্র প্রজন্মকে জাহান্নামের বিনিময়ে তাগুতের দাসত্ব করে যেতে হবে (২.২৫৭, ৪.৫১-৫২, ৪.৬০, ৪.৭৬, ৫.৬০, ১৬.৩৬, ৩৯.১৭)?

আর কত সহস্র বছরের মেয়াদ পেরোলে পৃথিবী আর তার অধিবাসীদের বুদ্ধির এই পরিপক্বতা অর্জিত হবে যে, শেষ পর্যন্ত ‘বহুর’ দাসত্ব করতেই হয়, অতএব শত সহস্র মিথ্যার দাসত্ব না করে এক আল্লাহর দাসত্ব করাই বেহতর। এবার পাষাণহৃদয়গুলো বিগলিত হোক—যিনি চেয়ে আছেন অপার স্নেহে তাঁর জন্য। আমাদের এবার নাম লিখাবার সময় হয়েছে। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্নতার কতকাল পেরিয়ে গেল। “শান্ত সন্ধ্যা, স্তব্ধ কোলাহল, নিভাও বাসনা বহ্নি নয়নের নিড়ে, চল ধীরে ঘরে ফিরে যাই”।

‘সিটিবয়’ আর ‘হাজার বছরের ঐতিহ্যের’ ঠুনকো অহমিকাকে বিসর্জন দিয়ে আমরা সবাই মহাকাল আর মহাবিশ্বের মহানাগরিক হই। কোরআনকে ধারণ করে স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে উঠি। কোরআন বারবার পঠিত হবার গ্রন্থ। সবাই মিলে, সকল সময়। আমাদের সকলের শেষ আশ্রয়স্থল মহান আল্লাহ তা’য়ালাই (৫৩.৪২)। এখন সময় এসেছে কোরআনকে পূর্ণরূপে উপলব্ধির, পুরো আসমানী গ্রন্থকে ধারণের। তার জন্য মানসিক ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি গ্রহণের। তাই সংকীর্ণতা পরিহার করে মানবজাতির প্রতিটি সদস্য সত্যকে আঁকড়ে ধরুক—সত্যের সঙ্গে হোক সকলের সন্ধি।