ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন

ধৈর্য মানুষের এমন এক গুণ, যা কখনো ব্যর্থ হয় না। এমন এক তীর, যা ল্যভ্রষ্ট হয় না। এমন বিজয়ী সৈনিক, যে কখনো পরাজিত হয় না। এমন সুরতি দুর্গ, যা কখনো ধ্বংস হয় না। ধৈর্য আর বিজয় দুই সহোদরের মতো। মানুষ তার দুনিয়া ও আখিরাতের বিষয়ে সবরের মতো এমন কোনো অস্ত্রে সজ্জিত হয় না, যা তার নফস ও শয়তানকে নিশ্চিতভাবে হারিয়ে দেয়। সেই বান্দার কোনো শক্তিই নেই, যার গুণাবলির তালিকায় ধৈর্য নেই। সেই বান্দা বিজয়ও ছিনিয়ে আনতে পারে না, যে ধৈর্যশীল নয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো এবং ধৈর্যে অটল থাকো’ (আলে-ইমরান : ২০০)।

যে ব্যক্তি সবর করে, বিপদে ধৈর্য ধরে, সে ভাগ্যবান। পৃথিবীতে যারা সৌভাগ্যবান তারা সবর ও ধৈর্য গুণেই ভাগ্যবান। দুঃসময় এলে তারা ধৈর্য ধরেন, আর সুসময় এলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এভাবে তারা জান্নাতের নিয়ামতের অধিকারী হন। সত্যিই তারা সৌভাগ্যবান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আর আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল।’ (হাদিদ : ২১)

ধৈর্য আল্লাহর পরিপূর্ণ মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ যাকে এই গুণ দেন; কেবল সেই এ গুণের মুকুটে শোভিত হয়। আল্লাহ নবী-রাসূল আ:-দের এই বিরল গুণে ভূষিত করেছিলেন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ: বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন। ভেবে দেখুন ধৈর্য কত গুরুত্বপূর্ণ! নানাভাবে আল্লাহ সবরের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। যেমন : ইরশাদ হয়েছে বলো, ‘হে আমার মুমিন বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যারা এ দুনিয়ায় ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর জমিন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।’ (জুমার : ১০)

আল্লাহ বলেছেন, তিনি ধৈর্যশীলদের জন্য হেদায়েত ও সুস্পষ্ট বিজয় নিয়ে তাদের সাথেই আছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা ধৈর্য ধরো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’ (আনফাল : ৪৬)।
আল্লাহ ধৈর্য ও ইয়াকিন তথা ধৈর্য ও ঈমানের বদৌলতে মানুষকে নেতৃত্ব দেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস রাখত’ (আস-সাজদাহ : ২৪)।
আল্লাহ দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ধৈর্যই মানুষের জন্য কল্যাণকর। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা ধৈর্য ধরো, তবে তাই ধৈর্যধারণকারীদের জন্য উত্তম’ (নাহল : ১২৬)।

আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন, কারো সাথে যদি ধৈর্য থাকে, তাহলে যত বড় শত্র“ই হোক তাকে হারাতে পারবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা ধৈর্য ধরো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছু তি করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে, তা পরিবেষ্টনকারী’ (আলে-ইমরান : ১২০)।
বিজয় ও সফলতার শর্ত ধৈর্য ও তাকওয়া অবলম্বন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো ও ধৈর্যে অটল থাকো এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হও’ (আলে-ইমরান : ২০০)।

ধৈর্যশীলকে তিনি ভালোবাসেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? ইরশাদ হয়েছে, ‘আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহ-ওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন’ (আলে-ইমরান : ১৪৬)।

ধৈর্যশীলদের তিনটি বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন, যার প্রতিটি পাওয়ার জন্য দুনিয়াবাসী একে অপরের সাথে ঈর্ষা করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের প থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত’ (বাকারা : ১৫৫-১৫৭)।
ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন জান্নাত লাভের কামিয়াবি আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির সাফল্য। ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হলো সফলকাম’ (মুমিনুন : ১১১)।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনের চার চারটি স্থানে উল্লেখ করেছেন, তাঁর নিদর্শনাবলি থেকে ধৈর্যশীল ও শুকরগোজার বান্দারাই উপকৃত হয় এবং এরাই সৌভাগ্যবান বটে। যেমন সূরা লুকমানে ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি কি দেখনি যে, নৌযানগুলো আল্লাহর অনুগ্রহে সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তাঁর কিছু নিদর্শন তোমাদের দেখাতে পারেন। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে’ (আয়াত : ৩১)।

সূরা ইবরাহিমে ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছি যে, ‘তুমি তোমার কওমকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো এবং আল্লাহর দিবসসমূহ তাদের স্মরণ করিয়ে দাও’। নিশ্চয় এতে প্রতিটি ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন’ (আয়াত : ৫)।

সূরা সাবায় ইরশাদ করেছেন, ‘কিন্তু তারা বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদের সফরের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিন।’ আর তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করল। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনী বানালাম এবং তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (আয়াত : ১৯)।

সূরা শূরায় ইরশাদ করেছেন, ‘তিনি যদি চান বাতাসকে থামিয়ে দিতে পারেন। ফলে জাহাজগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠে গতিহীন হয়ে পড়বে। নিশ্চয় এতে পরম ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে’ (আয়াত : ৩৩)।

সবর কী?
সবরের আভিধানিক অর্থ বাধা দেয়া বা বিরত রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় সবর বলা হয় অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেঁড়া থেকে বিরত রাখা। কারো কারো মতে, এটি মানুষের অন্তরগত একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে। এটি মানুষের একটি অন্তর্গত শক্তি, যা দিয়ে সে নিজেকে সুস্থ ও সুরতি রাখে।

সবরের প্রকার : আমরা যে সবরের কথা আলোচনা করছি তা কিন্তু তিন প্রকারের। যথা : প্রথমত, আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগি আদায়ে ধৈর্য ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর নিষেধ ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ না করায় ধৈর্য ধরা। এবং তৃতীয়ত, তাকদির ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে ধৈর্য ধরা।
এই তিন প্রকার সম্পর্কেই শায়খ আবদুল কাদির জিলানি রহ: তদীয় গ্রন্থ ‘ফুতুহুল গায়ব’ গ্রন্থে বলেন, ‘একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্য ও স্থৈর্যের পরিচয় দিতে হবে : কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং তাকদিরের ওপর।’

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত লুকমান আলাইহিস সালামের বিখ্যাত উপদেশেও এ তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম করো, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধরো। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সঙ্কল্পের কাজ’ (লুকমান : ১৭)।

একজন প্রকৃত মুমিন সর্বাবস্থায় দৃঢভাবে এ কথা বিশ্বাস করে, সে যে অবস্থায়ই আছে, তাতেই কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরিফে ছুহাইব বিন সিনান রা: থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ‘মুমিনের অবস্থা কতই না চমৎকার! তার সব অবস্থায়তেই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থায়ই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।’

সবরের ফজিলত
সবরের কোনো বিকল্প নেই। আলাহর বান্দা মাত্রেই ধৈর্য ধরতে হবে। কেননা কখনো আল্লাহর আদেশ মানতে হবে, তাঁর নির্দেশিত কাজ করতে হবে। আবার কখনো তাঁর নিষেধ মেনে চলতে হবে। বিরত থাকতে হবে তা করা থেকে। আবার কখনো অকস্মাৎ তকদিরের কোনো ফয়সালা এসে পড়বে। এভাবে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে মুমিনের জীবন এগিয়ে যায়। সুতরাং মৃত্যু পর্যন্ত এই ধৈর্যকে সাথে নিয়েই চলতে হবে। তাই তো কুরআনের মতো সুন্নাহেও সবরের অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

যেমন :
ক. উম্মে সালামা রা: বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন অর্থাৎ ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়বে এবং বলবে, হে আল্লাহ, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর স্থলে উত্তম কিছু দান করুন। আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। উম্মে সালাম বলেন, আবু সালামা মারা গেল। আবু সালামার চেয়ে উত্তম মুসলমান আর কে হতে পারে? তার ঘরেই রাসূলুল্লাহ সা: সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন। (আমি মনে মনে এ কথা ভাবলাম আর আল্লাহ আমাকে স্বয়ং রাসূল সা:-কেই স্বামী হিসেবে দান করলেন!)

খ. আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘আল্লাহ যার ভালো চান, তাকে বিপদ দেন।’

গ. আয়েশা রা: বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, মুমিনকে যেকোনো বিপদই স্পর্শ করুক না কেন, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। এমনকি (চলতি পথে) পায়ে যে কাঁটা বিঁধে (তার বিনিময়েও গুনাহ মাফ করা হয়।)

ঘ. আবু মুসা আশআরি রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফর করে, তার জন্য সে সুস্থ ও ঘরে থাকতে যেরূপ নেকি কামাই করত, অনুরূপ নেকি লেখা হয়।

ঙ. এক বুজুর্গ বলেন, যদি দুনিয়ার বিপদাপদ না থাকত, তাহলে আখিরাতে আমরা রিক্ত অবস্থায় উপনীত হতাম।

জ. উমর বিন আবদুল আজিজ রহ: বলেন, যাকে আল্লাহ কোনো নেয়ামত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং তার স্থলে তাকে ধৈর্য দান করেছেন, তো এই ব্যক্তি থেকে যা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তার চেয়ে সেটাই উত্তম, যা তাকে দান করা হয়েছে।

অতএব জীবনের প্রতিটি স্তরে আমাদেরকে সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে প্রতিবেশীর আচরণে। আত্মীয়দের আচরণে দেখাতে হবে মহানুভবতা। তাদের অনাকাক্সিত আচরণগুলোকে দেখতে হবে মাসুন্দর দৃষ্টিতে। আরো ধৈর্য ধরতে হবে নিজের অধীনস্থদের কর্মকাণ্ডে। স্ত্রীর অনাকাক্সিত ভুলচুকেও ধৈর্য ধরতে হবে। তদ্রƒপ স্ত্রীকেও স্বামীর আচরণে সবর করতে হবে। ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। ধৈর্য ধরতে হবে আর নেকির প্রত্যাশায় থাকতে হবে।