ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইন্টারনেটে আল্লাহর পথে দাওয়াত

​ বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মুহূর্তেই চিঠি আদান-প্রদান, ভিডিও কনফারেন্সসহ কত কী! বাংলা ইংরেজি আরবিসহ বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের তাফসির পড়া যাচ্ছে। দুর্লভ যেসব কিতাব সংগ্রহ করা অনেক কষ্টসাধ্য সেসব কিতাব এখন মাউসের এক কিকেই এসে যাচ্ছে। হাজার হাজার কিতাবের মাকতাবাতুশ শামেলা একটি ছোট্ট মেমোরিতেই রাখা যাচ্ছে। সবই সম্ভব হচ্ছে বিজ্ঞানের চরম উন্নতির ফলে। বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক ও সর্বাধিক ক্রিয়াশীল বিস্ময়কর আবিষ্কারই ইন্টারনেট।

বর্তমানে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে ইন্টারনেট। ঘরে ঘরে কম্পিউটার ঠাঁই করে নিচ্ছে। তারই ওপর ভিত্তি করে যোগাযোগের নতুন এই মাধ্যম সর্বত্র ঢুকে পড়ছে। প্রথমে কম্পিউটার-ভিত্তিক থাকলেও এর বিবর্তন ঘটেছে দ্রুত। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে ক্রমেই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকাগুলোর নেট সংস্করণে ঢুকে দেখছেন আপডেট খবরগুলো। আজ জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রিন্ট ভার্সনের চেয়ে ইন্টারনেট ভার্সনের পাঠক প্রায় দ্বিগুণ। জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্যাটেলাইট, এফএম রেডিও এবং অনলাইন গণমাধ্যম।

কিন্তু গণযোগাযোগের এই জনপ্রিয় মাধ্যমটিতে উপেক্ষিত ইসলাম। আলেম সমাজের একটি বিশাল অংশ বরাবরই নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের বিরুদ্ধে কতটা মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে এর খবরও তাদের নেই। যখন ইহুদিরা ‘ইনোসেন্স অব মুসলিম’ রচনা করে বিশ্বনবীর সাথে চরম বেয়াদবি করল; তখন আমরা শুধু মিছিল মিটিংয়ের মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করেই দায় সেরেছি। এর জবাবে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ তো দূরের কথা, এর প্রয়োজনও আমরা অনুভব করিনি। ব্লগারদের বিদ্রƒপের জবাব ব্লগের মাধ্যমে দেয়া তো দূরের কথা ব্লগাররা কী মারাত্মক ভাষায় বিদ্রƒপ করেছে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দৈনিক আমার দেশের ওপরই ছেড়ে দিয়েছি। 

সরলপ্রাণ ওলামায়ে কেরামের এ মিডিয়া বিমুখতাকে অপূর্ব সুযোগ হিসেবে নিয়েছে ইসলামবিরোধী চক্র। এক দিকে ‘গেরিলার’ মতো বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, ‘রাজাকার’ মানেই দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক (!), মাওলানারাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা, গণধর্ষণ আর লুণ্ঠনের মূল হোতা (?)। ঘেটুপুত্র কমলার মাধ্যমে উসকে দেয়া হয়েছে সমকামিতাকে। অন্য দিকে অজস্র্র ব্লগ ও পেজ খুলে প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই লিখে যাচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। মনের অজান্তেই অনেকে ইসলামবিরোধীদের মিত্রে পরিণত হয়ে নাস্তিকের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন ‘রাজীব হায়দার’। ইসলামের বিরুদ্ধে ঘটিয়ে দিচ্ছে অঘোষিত ইন্টারনেট বিপ্লব। ইউটিউবে হাজারো বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিদ্রƒপ করছে নীরবে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে সন্ত্রাসী আছে শুধু তা প্রমাণ করলেই হবে না; বরং মুসলমানদের প্রতিটি ইউনিট অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমানই আজন্ম সন্ত্রাসী, ‘প্রত্যেক মুসলমানের রক্তেই রয়েছে সন্ত্রাসের বীজ’Ñ তা প্রমাণ করাকেই আজ তারা প্রধান কর্তব্য এবং বৈধ মনে করছে। কারণ, তা করা গেলেই মুসলমানদের ওপর আক্রমণ বৈধ হবে। 

বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। পৃথিবীর এমন কোনো সংবাদপত্র, রেডিও সেন্টার, টিভি সেন্টার নেই যারা রয়টার্স থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে না। বর্তমান বিশ্বের প্রধান দু’টি প্রচারমাধ্যম বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকাও প্রায় নব্বই ভাগ সংবাদ রয়টার থেকে সংগ্রহ করে থাকে। ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত এ সংবাদ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস রয়টার্সের জন্ম ১৮১৬ সালে জার্মানির এক ইহুদি পরিবারে।

রয়টার্সের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ইহুদিদের। টাইম, নিউজউইকের মতো বহুল প্রচলিত পত্রিকাগুলোর প্রভাবশালী সাংবাদিক ও কলামিস্ট তারাই। তাই ফিলিস্তিনের নির্যাতিত শিশুদের আর্তনাদ কখনো উঠে আসে না আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। মুসলমানেরা কতটুকু নির্যাতিত তা জানতে পারে না বিশ্বমানবতা। পূর্বতিমুরের যোদ্ধাদেরকে উপস্থাপন করা হয় স্বাধীনতাকামী হিসেবে আর আরাকান কিংবা কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী নির্যাতিতদের নামের সাথে জুড়ে দেয়া হয় ‘জঙ্গি’ অথবা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শব্দ। শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মার্টিন লুথার কিং কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার আন্দোলন উপস্থাপিত হলেও দেড় হাজার বছর আগে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের তফাত ঘুচিয়ে তাদের অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠাতা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর অবদান উঠে আসে না আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। যে কারণে মুসলমানেরাই আজ ভুলে গেছে যে, পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে তারাই দেড় হাজার বছর আগে বিশ্বমানবতার কাছে পেশ করেছিল মানবাধিকারের প্রথম সবক। প্রতিষ্ঠা করেছিল শাশ্বত মানবাধিকার।

নতুন প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ, যাদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি, তাদের ইতোমধ্যেই তারা কাবু করে ফেলেছে। শুধু তাই নয় ইসলামের কথা বলে কাদিয়ানী, দেওয়ানবাগীর মতো কিছু সুযোগসন্ধানী বিপথগামী গোষ্ঠীও ইন্টারনেটের মাধ্যমে ধর্মভীরু মুসলমানদের মগজ ধোলাইয়ে ব্যস্ত।

ইসলামী চেতনাসম্পন্ন একঝাঁক তরুণের ইন্টারনেটে পদচারণা হতাশার মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে; কিন্তু যখনই নিকষ আঁধারে সম্ভাবনার সূর্যোদয় হলো, তখনই ইসলাম বিদ্বেষীদের ঘুম হারাম! ইন্টারনেটে ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী কিছু তরুণের আগমনকে হুমকি হিসেবে দেখছে ইসলামবিরোধীরা। সত্যপ্রচারে ব্রতী মিডিয়াগুলোর কণ্ঠরোধের পর সত্য প্রচারের কিছু সৈনিকই তাদের মাথাব্যথার কারণ। উন্মুক্ত প্রচারমাধ্যম ইন্টারনেটেও সত্য প্রচার বন্ধ করতে চান তারা। 

মসজিদের মিম্বার, বইপুস্তক, ওয়াজ মাহফিল, পত্রপত্রিকার মতো ইন্টারনেটও দ্বীনি দাওয়াতের এক অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। অনেক ফ্যামিলি আছে যারা আধুনিকতার নামে তাদের সন্তানদের ইসলামকে জানার সুযোগ দেয়নি; আল্লাহ, রাসূল সা: এবং পরকাল সম্পর্কে দেয়নি ইতিবাচক ধারণা। এ প্রজন্মের বেশির ভাগ এমন যে, সারা দিন ইন্টারনেটেই পড়ে থাকে। সেই প্রজন্মের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে ইন্টারনেটই সবচেয়ে সহজ। 

আর্বানাইজেশনের এই যুগে তৈরি হচ্ছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। একেকটি অট্টালিকার একেকটি তলায় বাস করছে তিন-চারটি পরিবার। লোকসংখ্যার বিচারে এ রকম একটি অট্টালিকাই যেন একটি গ্রাম। নিরাপত্তার কারণে সেসব ফ্যাটে প্রবেশ সম্পূর্ণই দুরূহ। তাই, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সুযোগ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। যার অর্থ, হাজার হাজার গ্রামে আমরা দাওয়াত পৌঁছাতে পারছি না। তাহলে কি তারা দ্বীনের দাওয়াত থেকে বঞ্চিত হবে? তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর সহজতর মাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেট।

বাতিল যেভাবে আসে তার প্রতিরোধের চেষ্টাও হতে হবে সে পথেই। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ড. মাহাথির মুহাম্মদ বলেছেন, ‘আমরা ইন্টারনেটের মোকাবেলা করতে পারি ইন্টারনেটের সাহায্যে। কম্পিউটারের মোকাবেলায় কম্পিউটার এবং কলমের মোকাবেলা করতে পারি কলমের সাহায্যে। আমরা উটের পিঠে চড়ে ল্যান্ডক্রুজারের সাথে প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারি না।’ 

অনেকের ধারণা, ইন্টারনেটে অশ্লীলতার চর্চা হয় তাই আমাদের এর থেকে দূরে থাকাই ভালো; কিন্তু ইন্টারনেট একটি নিরীহ মাধ্যম মাত্র। ইউজার (ব্যবহারকারী) তাকে যেভাবে ব্যবহার করবে সে নির্র্দ্বিধায় সেভাবে ব্যবহৃত হতে বাধ্য। এ বিবেচনায় ইন্টারনেটকে নিরপেক্ষ বললেও যথার্থ হবে বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন অসুন্দরের প্রচারের আগেই সুন্দরের প্রচার করিনি? 

গ্লোবাল ভিলেজের এ সময়ে ইন্টারনেটকে একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বললেও ভুল হবে বলে মনে হয় না। একজন সাধারণ মানুষ থেকে বিদগ্ধ গবেষকও ইন্টারনেটেই মেটাচ্ছেন জ্ঞানপিপাসা। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের অ্যাড্রেস জানারও প্রয়োজন হয় না, ইংরেজি কিংবা আরবি ভাষায় প্রয়োজনীয় তথ্যের একটি সম্ভাব্য শব্দ দিয়ে গুগলে সার্চ দিলেই শত শত প্রবন্ধ এবং বইয়ের (লিংক) অ্যাড্রেস এসে হাজির। সেই তুলনায় বাংলা ভাষায় ইসলামী বইপুস্তক আজো অপ্রতুল। ইন্টারনেটে বাংলা ভাষায় ইসলামী বইপুস্তক ও প্রবন্ধের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে, ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে আপনাকেও আমাকেই ব্রতী হতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে ইসলামের ব্যাপারে মানুষের কৌতূহল বাড়ছে। দেশে দেশে অমুসলিম যুবশ্রেণী আগ্রহী হচ্ছে ইসলামের অমিয় সৌন্দর্যের প্রতি। ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী হচ্ছে ফরাসি সঙ্গীতশিল্পী দিয়ামসের মতো হাজরো তরুণ-তরুণী। ইন্টারনেট হোক তাদের কৌতূহল মেটানোর মাধ্যম। হোক ইসলামী বিপ্লবের পথে সহায়ক।