ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলামে মেহমান ও মেজবান

ইসলাম সব কিছুর আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছে। ইসলামে মেহমান ও মেজবানেরও কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে। যারা বেড়াতে যান তারা মেহমান, আর যাদের বাড়িতে যান তারা মেজবান। দাওয়াত খাওয়া ও খাওয়ানো দু’টিই সুন্নত। আন্তরিকতাপূর্ণ অনাড়ম্বর দাওয়াতের কথা ইসলাম বলেছে। দাওয়াত দিলে সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও দামি খাবার খাওয়াতে হবে অথবা অবশ্যই উপহার নিয়ে যেতে হবে- এটা জরুরি নয়।

এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘উপস্থিত খাবারকে তুচ্ছ মনে করা মেহমানদের জন্য বিপজ্জনক। আর ঘরে যা আছে মেহমানের সামনে পেশ করতে লজ্জা পাওয়া মেজবানের জন্যও বিপজ্জনক’ (শুআবুল ঈমান)।
মেহমানের করণীয় হলো, কোনো ওজর-সমস্যা না থাকলে দাওয়াত কবুল করা। ধনী-গরিব সবার দাওয়াত সমান চোখে দেখা। নিজ থেকে খাবারের কোনো পদ ঠিক করে না দেয়া। যদি মেহমান নিজেই দুই-তিন ধরনের মধ্যে কোনোটি নির্বাচন করতে বলে তাহলে সবচেয়ে সহজটি গ্রহণ করা। মেহমানের অনুমতি ছাড়া অতিরিক্ত কাউকে সাথে না নেয়া। যে খাবার উপস্থিত হয় শুকরিয়ার সাথে খাওয়া। খাবারের দোষ না ধরে যথাসম্ভব প্রশংসা করা। মেজবানের জন্য দোয়া করা। যাওয়ার সময়ের ব্যাপারে বিবেচনাপ্রসূত হওয়া, সময়টা আগেই জানিয়ে দেয়া। উপঢৌকন নিয়ে যাওয়া। পুরুষশূন্য বাড়িতে একা না যাওয়া। অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা। মেজবানকে দাওয়াত দেয়া। সৌজন্যতার সাথে কথাবার্তা বলা। তিন দিনের বেশি অবস্থান না করা। এর অতিরিক্ত যা হবে তা মেজবানের পক্ষ থেকে সদকাস্বরূপ। রাতযাপনের ইচ্ছা থাকলে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ও জিনিসপত্র সাথে নেয়া প্রভৃতি।

আর মেজবানের করণীয় হলো, আন্তরিকতার সাথে দাওয়াত দেয়া। লোক দেখানোর জন্য দাওয়াত না দেয়া। মেহমান এলে খাবার দিতে দেরি না করা। মেহমান ‘খাবো না’ বললে সাথে সাথে খাবার তুলে না নেয়া, এতে আন্তরিকতার ঘাটতি বোঝায়। সুফিয়ান সাওরি রহ: বলেন, ‘কেউ তোমার কাছে বেড়াতে গেলে খাবেন কি না প্রশ্ন করো না। খাবার সামনে হাজির করবে। তিনি খেলে তো খেলেন; না খেলে তুলে নেবে’ (আদাবুজ জিয়াফা)। ফলজাতীয় খাবার আগে ও ভারী খাবার পরে পরিবেশন করা। সূরা ওয়াকিয়ার এক জায়গায় বেহেশতিদের খাবারের বর্ণনায় প্রথম ফল, তারপর গোশতের কথা এসেছে।

পরিচিত আত্মীয়-স্বজন এলে তাদের যথাযথ আপ্যায়ন, আদর-যতœ করা মুসলমান হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর মেহমান চলে যাওয়ার সময় তাকে এগিয়ে দিয়ে আসা সুন্নত। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মেহমানের সাথে (বিদায়কালীন) বাড়ির দরজা পর্যন্ত সঙ্গ দেয়া সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত (মিশকাত)। দূর পথের যাত্রী মেহমান সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন মেহমানকে সম্মান করে, তাকে ‘জাইযা’ দেয়। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘জাইযা’ কী? তিনি বললেন, এক দিন ও এক রাতের সম্বল সাথে দিয়ে দেয়া।

মেহমানদারি মানবীয় গুণাবলির অন্যতম একটি। মেহমান এলে বাড়ির লোকজন সবাই একভাবে নেয় না। সৌদি আরবসহ মরুভূমির সফর খুব কষ্টকর হওয়ায় সেখানকার লোকজন খুব অতিথিপরায়ণ হয়ে থাকে। মেহমানদারি মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: এবং পরবর্তী নবীদের সুন্নত। যারা হজ করতে যান তারা আল্লাহর মেহমান। ইবরাহিম আ:-এর কাছে প্রতি রাতে তিন থেকে দশ পর্যন্ত, কখনো এক শ’জন পর্যন্ত মেহমানের সমাগম থাকত। একটি রাতও মেহমান ছাড়া হতো না।

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন অতিথিপরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক সময় মেহমানদারি করতে গিয়ে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে অনাহারে থাকতে হতো। মেহমানের কোনো অযতœ যেন না হয় সেদিকে তিনি খেয়াল রাখতেন। এক সাহাবি ঘরে খাবার কম থাকার কারণে মেহমানকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়ানোর জন্য চেরাগের সলতে ঠিক করার অজুহাতে তা নিভিয়ে মেহমানদারি করেছিলেন। এতে রাসূলুল্লাহ সা: খুব খুশি হন এবং আল্লাহতায়ালা আয়াত নাজিল করেন, ‘এবং তারা নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যদিওবা নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকে। আর যারা স্বভাবজাত লোভ-লালসা এবং কামনা থেকে রক্ষা পেয়েছে, তারাই সফলকাম’ (সূরা হাশর, আয়াত-৯)।

আসুন আমরা মেহমান ও মেজবানের দায়িত্ব-কর্তব্যগুলো পালন করে অজস্র নেকি অর্জন করি।