ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলামে শারীরিক পবিত্রতা

ইসলামে শারীরিক পবিত্রতাপবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বহু বিধান পালনে পবিত্রতা পূর্বশর্ত। পবিত্রতা অর্জন ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। কুরআন ও সুন্নাহে পবিত্রতার যথেষ্ট তাগিদ রয়েছে। সিয়া সিত্তাসহ অন্যান্য প্রায় সব হাদিসগ্রন্থে ‘কিতাবুত তাহারাত’ বা পবিত্রতা অধ্যায়টি শুরুতেই সন্নিবেশিত হয়েছে। কেননা ইসলামে পবিত্রতার গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু তাই নয়, পবিত্রতা অর্জন করাকে আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা লাভের উপায় বলে কুরআন মজিদে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীকে ভালোবাসেন।’ (সূরা বাকারা : ২২২)।

মনে রাখতে হবে, শরীর নাপাক (অপবিত্র) হলেই পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। পবিত্রতা সম্বন্ধে জানতে হলে প্রথমে নাপাক বা নাজাসাত বিষয়ে ধারণা নেয়া জরুরি। এ নাজাসাতের নানান রকমফের রয়েছে। নাজাসাত প্রথমত দুই ধরনের নাজাসাতে হাকিকি ও নাজাসাতে হুকমি। নাজাসাতে হাকিকি আবার দুই ধরনের নাজাসাতে গলিজা ও নাজাসাতে খফিফা। মানুষের মলমূত্র, রক্ত, মুখভর্তি বমি, বীর্য, পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে নির্গত যেকোনো তরল বস্তু, মদ, হারাম পশুর পেশাব-পায়খানা ও দুধ, শূকরের গোশত, পশম, হাড়সহ সব কিছু, হালাল পশুর পায়খানা এবং হাঁস, মুরগি, পানকৌড়ি ও তিতিরের পায়খানা, তস্থান থেকে নির্গত পুঁজ অথবা অন্য কোনো তরল পদার্থ ও মৃত পশুর গোশত, চর্বিসহ যাবতীয় তরল নাজাসাতে গলিজা শরীর বা কাপড়ে লাগলে তা এক দিরহাম তথা হাতের তালুর পরিমাণ মাফ।

আর গাঢ় হলে ওজনে সাড়ে চার মাশা তথা ছয় আনা পরিমাণ মাফ। যদিও নাজাসাতে খফিফার বিষয়টি তুলনামূলক হালকা ও লঘু। এ নাপাক লাগলে শরীর বা কাপড়ের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ পর্যন্ত মাফ। জেনে রাখা ভালো, শরীরে নাপাক তেল অথবা অন্য কোনো তৈলাক্ত কিছু মালিশ করার পর শুধু তিনবার ধুয়ে ফেললেই শরীর পবিত্র হয়ে যাবে। তৈলাক্ততা দূর করা জরুরি নয়।

যদি নাপাক রঙে শরীর বা চুল রাঙানো হয়, তাহলে এতটুকু ধুয়ে ফেললে যথেষ্ট হবেÑ যাতে পরিষ্কার পানি বের হয়। রঙ তুলে ফেলার দরকার নেই। নাজাসাতে হুকমি দুই ধরনের। এক. হাদসে আসগরÑ যা অজু করলেই পাক হয়ে যায়। পানি পাওয়া না গেলে অথবা পানির ব্যবহার তিকারক হলে তায়াম্মুম দ্বারাও পবিত্র হওয়া যায়। এ অবস্থায় নামাজ পড়া ও কুরআন স্পর্শ করা না গেলেও মৌখিক কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে।

দুই. হাদসে আকবর যাতে গোসল ফরজ হয়। এ অবস্থায় নামাজ আদায় করা, কুরআন স্পর্শ করা ও মসজিদে প্রবেশ করা এমনকি মৌখিকভাবেও তেলাওয়াত করা যাবে না। স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পর উভয়ে যতণ না গোসল করবে ততণ পবিত্র হবে না। ওই অবস্থায় নামাজও আদায় করতে পারবে না। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা অপবিত্র থাকো তবে পবিত্র হয়ে নাও।’ যদি পানি না-ই মেলে ভিন্ন উপায়ে হলেও পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। একই আয়াতের একটু পরের দিকে বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীর সাথে মিলিত হও অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও এবং তা দ্বারা তোমাদের মুখে ও হাতে মাসেহ করে নাও। (সূরা মায়েদা : ৬)।

গোসলখানায় প্রস্রাব করা সমীচীন নয়। তেমনি প্রস্রাব-পায়খানার সময় তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। কেউ কেউ প্রস্রাব শেষে তাড়াহুড়ো করে উঠে যায়, এ েেত্র ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব পড়ে তার শরীর ও কাপড় অপবিত্র হয়ে যেতে পারে। এ জন্য ধীরে-সুস্থে প্রস্রাব করে ঢিলা নিয়ে সামান্য সময় হাঁটাহাঁটি করা অথবা পেশাব করার স্থানে কিছুণ দাঁড়িয়ে থেকে পেশাবের রাস্তা থেকে পেশাব পরিপূর্ণ পরিষ্কার করা উচিত। প্রস্রাব-পায়খানা ত্যাগ করার পর ঢিলা-কুলুখ বা পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে। শুধু ঢিলা-কুলুখ বা শুধু পানি দিয়েও এ পবিত্রতা অর্জন করা যায়। তবে গোবর, হাড়, কয়লা, সোনা, রূপা, তামা, পিতল ও কাচ ইত্যাদি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না।

আজকাল আল্ট্রামডার্ন টাইপের কমোড বাথরুমগুলোতে চেয়ারের মতো বসেই প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার সিস্টেম চালু হয়েছে। এতে যথেষ্ট বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। যদি কেউ প্যানের উপরিভাগে সামান্য প্রস্রাব লাগিয়ে আসে আর পরবর্তী ব্যক্তি তা ব্যবহার করে এতে ওই ব্যক্তি যত সুন্দর করেই শৌচক্রিয়া সম্পন্ন করুক না কেন, সে তার অজান্তেই অপবিত্র হয়ে যাবে। এ ধরনের কিছু পেশাবখানাও তৈরি হচ্ছে যাতে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে বাধ্য হতে হয়। অথচ একান্ত ওজর ছাড়া এমনটি করা ঠিক নয়। যেখানে বসে প্রস্রাব করলে ময়লা লাগার কিংবা প্রস্রাবের ছিটা লাগার সন্দেহ থাকে এমন স্থান ছাড়া রাসূলুল্লাহ সা: দাঁড়িয়ে পেশাব করা থেকে বারণ করেছেন।

সব ধরনের নাপাক থেকে পবিত্রতা অর্জনে পানির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। পায়খানা ও প্রস্রাবের পর ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার করার পর পানি ব্যবহার করে ময়লার স্থান ভালোভাবে ধুয়ে নিলে অপবিত্রতার চিহ্ন পর্যন্ত থাকে না। কুলুখ ব্যবহারের পর নবী করিম সা: পানি দিয়ে শৌচ করেছেন। এটাই ছিল তাঁর নিত্য অভ্যাস। এর কল্যাণকর বহু দিকও রয়েছে। এর দ্বারা নানা রোগবালাই থেকে রা পাওয়া যায়। লন্ডনের হার্ড স্টেটের বিশিষ্ট ডাক্তার কেনন ডেভিসের মতে, পায়খানা ও পেশাবের পর পানি ব্যবহার না করার ফলে লিঙ্গ ক্যান্সার, ত, ভগন্দর, চর্ম ইনফেকশন ও ফুসফুসের রোগ হয়।

অতএব রোগব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য এবং পূর্ণভাবে পবিত্রতা হাসিলের জন্য পানি ব্যবহারের বিকল্প নেই। এটিও রাসূলুল্লাহ সা:-এর একটি মহান সুন্নত। পবিত্রতার ফজিলত ও উপকারিতা অনেক। হাদিসে এসেছে মহানবী সা: ইরশাদ করেন, ‘যখন কোনো মুসলিম অথবা মুমিন বান্দা অজু করে আর সে তার মুখ ধোয় তখন অজুর পানি অথবা অজুর পানির শেষ ফোঁটার সাথে সাথে তার চেহারা থেকে সব গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে তার দু’চোখ দিয়ে করেছিল। যখন সে তার দু’হাত ধোয় তখন অজুর পানি অথবা অজুর পানির শেষ ফোঁটার সাথে সাথে তার উভয় হাত থেকে সব গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে হাত দিয়ে করেছিল। শেষ পর্যন্ত সে তার গুনাহ থেকে পাক হয়ে যায়।’ (তিরমিজি)।

পবিত্রতার বাস্তব উপকারিতা সম্পর্কে প্রখ্যাত বুজুর্গ হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ: বলেন, পবিত্রতার বদৌলতে মানুষ মহান মর্যাদার অধিকারী হয়। মানুষের অন্তরাত্মা পশুত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে ঈমানি আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এতে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল হয়। পবিত্রতা মানুষকে শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে এবং কবরের আজাব থেকে রা করে। এতে দেহ ও শরীর সজীব এবং সতেজ হয়। হৃদয়ে প্রফুলতা আসে। ইবাদতের স্বাদ অনুভূত হয়।