ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলামে শাস্তির বিধান

ইসলামের শাস্তি আইন একটি বাস্তবসম্মত আইন। অপরাধ দমনে এই আইনের কোনো বিকল্প নেই। তবে ইসলামের শাস্তি আইন ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোথাও প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা বড় ধরনের জুলুম। অর্থাৎ ইসলামী আইন প্রয়োগ করতে হবে ইসলামী রাষ্ট্রে, অন্য কোথাও নয়।

ইসলামী শাস্তি আইনের মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেয়া নয়; বরং অপরাধ সংঘটনের সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করা। এ কারণেই মানব রচিত আইনে যেখানে অপরাধ সংঘটনের পরেই কেবল শাস্তির ব্যবস’া রাখা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ইসলাম অপরাধ সংঘটনের আগেই এর সব উপায়-উপকরণ ও পন’া রোধ করে দেয়ার প্রতিই সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। এ রকম প্রতিবন্ধকতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস’া গ্রহণের পরও কেউ অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়লে তখন ইসলাম তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস’া গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে।

ইসলাম শুধু অপরাধ ও শাস্তি বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং প্রত্যেক অপরাধ ও শাস্তির সাথে আল্লাহভীতি ও পরকালের চেতনা উপস’াপন করে মানুষের ধ্যানধারণাকে এমন এক জগতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যার কল্পনা মানুষকে যাবতীয় অপরাধ ও গোনাহ থেকে পবিত্র করে দেয়। জনমনে আল্লাহতায়ালা ও পরকালের ভয় সৃষ্টি করা ছাড়া জগতের কোনো আইন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীই অপরাধ দমনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ইসলামের এই বিজ্ঞজনোচিত পদ্ধতিই জগতে অভূতপূর্ব বিপ্লব এনেছে এবং এমন লোকদের সমাজ গঠন করেছে, যারা পবিত্রতায় ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তার নিকটস’ অনেক ফেরেশতার চেয়েও অধিকতর সম্মানের অধিকারী।’ (ইবনে মাজাহ, [কিতাবুল ফিতান], হাদিস নং : ৩৯৪৭)

শাস্তির শ্রেণিবিন্যাস : ইসলামী আইনে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শাস্তিকে প্রধানত তিনটি প্রকারভেদে ভাগ করা হয়।

শাস্তির প্রথম প্রকারভেদ : কোনো কোনো অপরাধে বান্দার অধিকারের পরিমাণ এবং কোনো কোনো অপরাধে আল্লাহর অধিকারের পরিমাণ প্রবলভাবে ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে এবং এ প্রাবল্যের ওপর ভিত্তি করেই শাস্তিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১। যেসব শাস্তিতে আল্লাহর অধিকার বাস্তবায়নের দিকটি প্রবল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ ও সংরক্ষণ, সমাজের সামষ্টিক কল্যাণ সাধন ও সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আল্লাহর অধিকার বাস্তবায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। জেনা, চুরি ও মাদক সেবন প্রভৃতির শাস্তি এ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
২। যেসব শাস্তিতে ব্যক্তিবিশেষের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি মুখ্য। কিসাস হলো এ প্রকারের শাস্তি।
৩। যেসব শাস্তিতে আল্লাহর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ- দু’টিই প্রবল থাকে। মিথ্যা অপবাদের শাস্তি এ প্রকারের শামিল।
৪। যেসব শাস্তিতে কেবল আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণই উদ্দেশ্য। যেমন- নামাজ পরিত্যাগ করার শাস্তি এবং বিনা ওজরে রমজানে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজাভঙ্গের শাস্তি।
শাস্তির দ্বিতীয় প্রকারভেদ : প্রকৃতি ও স্বরূপ বিচারে শাস্তিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১। মৌলিক শাস্তি। জেনা, চুরি ও মাদক সেবন প্রভৃতির শাস্তি এ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
২। পরিপূরক শাস্তি। যেমন নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকার স্বত্ব থেকে হত্যাকারীকে বঞ্চিত করা।
৩। ইবাদতের আমেজমিশ্রিত শাস্তি, যাতে শাস্তির চেয়ে ইবাদতের দিকটি মুখ্য। যেমন শপথ ও হত্যার কাফ্‌ফারা।
৪। ইবাদতের আমেজমিশ্রিত শাস্তি, যাতে ইবাদতের চেয়ে শাস্তির দিকটি মুখ্য। যেমন রমজানের রোজা ভাঙার কাফ্ফারা।

শাস্তির তৃতীয় প্রকারভেদ : শাস্তি নির্ধারণের ভিত্তিতে অপরাধগুলোর শাস্তিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১। হুদুদ (সুনির্ধারিত শাস্তিগুলো) : ‘হুদুদ’ শব্দটি ‘হদ্দ’-এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ বাধাদান বা বারণ করা। সুতরাং প্রত্যেক জিনিস যা মানুষকে কোনো কিছু থেকে বারণ করে রাখে, তাকে হদ্দ বলা হয়। এ অর্থের নিরিখে আরবিতে দারোয়ান ও কারারক্ষীকে ‘হাদ্দাদ’ বলা হয়ে থাকে। কেননা তাদের একজন অপরিচিত কাউকে বাইরে যেতে বারণ করে। আর ‘হুদুদুল্লাহ’ বলতে আল্লাহতায়ালার নিষিদ্ধ বস’গুলোকে বোঝানো হয়। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ‘হুদুদ’ হলো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত বিভিন্ন অপরাধের সুনির্ধারিত শাস্তি। এ ধরনের শাস্তিতে বান্দাহর অধিকারের চেয়ে আল্লাহর অধিকারের বাস্তবায়নের দিকটি প্রবল ধরা হয়। কেননা হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধগুলোর দ্বারা সামগ্রিকভাবে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শাস্তি কার্যকর করলে সমাজ উপকৃত হয়।

শরিয়তের হদ্দগুলো হলো : চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ ও মধ্যপানের শাস্তি। তবে কোনো কোনো ফকিহ ধর্মান্তর ও রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তিকেও হদ্দ বলে উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য, কোনো কোনো হদ্দ সাধারণত অত্যন্ত কঠোর। এগুলো প্রয়োগ করার আইনও নির্মম। কোনো অবস’াতেই তা পরিবর্তন ও লঘু করা যায় না এবং কেউ ক্ষমা করারও অধিকারী নয়। কিন’ সামগ্রিক ব্যাপারে সমতা বিধানের উদ্দেশ্যে অপরাধ এবং অপরাধ প্রমাণের শর্তাবলিও অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। নির্ধারিত শর্তাবলির মধ্য থেকে যদি কোনো একটি শর্তও অনুপসি’ত থাকে, তবে হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। তদুপরি অপরাধ প্রমাণে কিংবা অপরাধের শর্তাবলির মধ্য থেকে কোনো একটিতে সন্দেহ দেখা দিলেও হদ্দ অকার্যকর হয়ে যাবে।

২। কিসাস (সদৃশ শাস্তি) : কিসাস শব্দের অর্থ একই রকম কাজ করা, পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলা। শরিয়তের পরিভাষার কিসাস হলো অপরাধীর সাথে তার বাড়াবাড়ির অনুরূপ আচরণ করা। অর্থাৎ অপরাধী কোনো ব্যক্তি যেই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতিসাধন করবে, তারও সে-ই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতিসাধন করাই হচ্ছে কিসাস। অপরাধী তাকে হত্যা করলে প্রতিশোধস্বরূপ সেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হবে এবং জখম করে থাকলে প্রতিশোধস্বরূপ তাকেও জখম করা হবে।
উল্লেখ্য, কিসাসের শাস্তিও হুদুদের মতোই কুরআন মজিদে নির্ধারিত রয়েছে। কিন’ পার্থক্য এই যে, হুদুদকে আল্লাহর অধিকার বা জনস্বার্থ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা করলেও তা ক্ষমা হবে না এবং হদ্দ অকার্যকর হবে না। কিন’ কিসাসের ব্যাপারটা এর ব্যতিক্রম। কিসাসে বান্দার অধিকার প্রবল হওয়ার কারণে হত্যা প্রমাণিত হওয়ার পর হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের ইখতিয়ারে ছেড়ে দেয়া হয়। সে ইচ্ছা করলে কিসাস হিসেবে তার মৃত্যুদণ্ডও দাবি করতে পারে। ক্ষমাও করে দিতে পারে। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা হত্যাকারীদেরকে ক্ষমা করে ছেড়ে দিলে হত্যাকারীদের সাহস বেড়ে যাবে কিংবা ব্যাপক হারে হত্যাকাণ্ডও শুরু হয়ে যাবে- এ রকম আশঙ্কা করা ঠিক নয়। কেননা হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করা ছিল নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অধিকার। তারা ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন’ অপরাপর লোকদের প্রাণরক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। তাই ইসলামী আইন মতো সরকার এ দায়িত্ব পালনের জন্য হত্যাকারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কোনো শাস্তি দিয়ে এ বিপদাশঙ্কা রোধ করতে পারে।

৩। তাজির (সাধারণ দণ্ড) : ‘তাজির’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বারণ করা ও ফিরিয়ে রাখা। তবে শব্দটি সম্মান ও সাহায্য করা অর্থেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শরিয়তের পরিভাষায় তাজির হলো, ‘আল্লাহ বা মানুষের অধিকারসংশ্লিষ্ট যেসব অপরাধের জন্য শরিয়ত নির্দিষ্ট কোনো শাস্তি কিংবা কাফ্‌ফারা নির্ধারণ করে দেয়নি, সেসব অপরাধের শাস্তি। স’ান, কাল, অবস’ান নিরিখে কল্যাণের দাবি অনুপাতে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হবে। সুতরাং অপরাধ, অপরাধী, সময় ও পরিবেশের প্রতি লক্ষ রেখে বিচারক যতটুকু ও যে রকম শাস্তি দান করা যৌক্তিক মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন। ইসলামী সরকার যদি ‘আলিম ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শক্রমে শরিয়তের রীতিনীতি বিবেচনা করে এসব অপরাধের শাস্তির কোনো পরিমাণ নির্ধারণ করে বিচারকদের তা মেনে চলতে বাধ্য করে, তবে তা-ও জায়েজ। যেমন আজকাল অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে দণ্ডবিধি নির্ধারণ করা হয় এবং বিচারক ও জজগণ নির্ধারিত দণ্ডবিধির অধীনে মামলা-মোকদ্দমায় রায় দেন। হুদুদ ও কিসাস জাতীয় কয়েকটি অপরাধ ছাড়া অবশিষ্ট সব অপরাধই তাজিরি অপরাধ। যেমন- বেগানা মহিলাকে চুমো দেয়া, জেনা ব্যতিরেকে কাউকে অন্য কোনো অপরাধের অপবাদ দেয়া, বিনাহেফাজতের মাল চুরি করা, খাদ্যে ভেজাল দেয়া, মাপে কম দেয়া, প্রতারণা করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ও ঘুষ খাওয়া প্রভৃতি। এসব অপরাধের শাস্তির মধ্যে কোনোটাতে আল্লাহর অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রবল থাকে, আবার কোনোটাতে বান্দার অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রবল থাকে.

আবদুল্লাহ আল হাসান সাকীব