ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম একটি জীবনব্যবস্থা

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো’ (সূরা বাকারা : ২০৮)। ইসলামকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সব মানুষের জন্য দ্বীন হিসেবে, চলার পথ হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত করে দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মে যেমন ইবাদতের বিধান আছে, ঠিক তেমনি পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় বিধানও রয়েছে। কাজেই মানুষের সমাজে বসবাস করতে গেলে যত কিছু প্রয়োজন সব ক্ষেত্রেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিয়মনীতি আছে। এসব নিয়মনীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ইসলাম ধর্মের অন্যতম বিধান। কাজেই ইসলাম ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলাম ও রাজনীতি : মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহানবী সা:কে বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। মহানবী সা: নবুয়াতপ্রাপ্তির পর মক্কায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে দাওয়াত দিতে থাকলেন। কিছু লোক তাঁর ডাকে সাড়া দিলো। আর কিছু লোক তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল। যারা তাঁর ডাকে সাড়া দিলো তারা রাসূল সা:কে নেতা হিসেবে মেনে নিলো। আর যারা দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল, তারা ভাবল মহানবী সা:-এর দাওয়াত গ্রহণ করলে নেতৃত্ব হারাতে হবে। রাসূল সা:ও বুঝলেন নেতৃত্ব ছাড়া শুধু দাওয়াত দিয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য রাসূল সা: আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। যেমন কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি বলো, হে আমার মালিক (যেখানেই আমাকে নিয়ে যাও না কেন) তুমি আমাকে সত্যের সাথে নিয়ে যেয়ো এবং (যেখান থেকেই আমাকে বের করা না কেন) সত্যের সাথেই বের করো এবং তোমার কাছ থেকে আমার জন্য একটি সাহায্যকারী (রাষ্ট্র) শক্তি প্রদান করো’। (সূরা বনি ইসরাইল : ৮০)। রাসূল সা: দোয়া করে বসে থাকেননি। বরং তিনি একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন।

মহানবী সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মদিনা রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। এটা নাম মদিনাতুন্নবী। আগের নাম ছিল ইয়াসরিব। সেখানে তিনি সর্বপ্রথম অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ইহুদি, পৌত্তলিক সবার সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যাকে মদিনার সনদ বলা হয়। ইতিহাসে এটাই সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। এর আগে কোনো লিখিত সংবিধান খুঁজে পাওয়া যায় না। রাসূল সা: যেমন ধর্মপ্রচারক ছিলেন তেমনি তিনি ছিলেন সেনাপ্রধান, শাসক ও বিচারক। তিনি নিজে সৈন্য পরিচালনা করেছেন। তিনি নিজে জিহাদ করেছেন। তাহলে কি রাসূল সা: আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া নিজের ইচ্ছায় এসব কাজ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, সে (নবী সা:) কখনো নিজে থেকে কোনো কথা বলেন না। বরং তা হচ্ছে ওহি যা (তার কাছে) পাঠানো হয়। (সূরা নাজম : ৩ ও ৪)।

রাসূল সা:-এর জীবনের প্রতিটি বিষয়কে যদি আমরা ইসলামের অঙ্গ মনে করি তাহলে ইসলামের পাশাপাশি রাজনীতিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রাসূল সা: যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ কর, আর যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক।

ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক : ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে ইসলামে রয়েছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিধান। এক কথায় মানুষ নিজে চলার জন্য, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, মহান আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন সব বিধানই ইসলামে রয়েছে। আমাদের সমাজের কেউ কেউ ধারণা করেন যে ইসলাম শুধু একটি ধর্ম। ধর্ম হিসেবে ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, দান খয়রাত, ইবাদত বন্দিগি ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আসলে তাদের ধারণা সত্য নয়। কারণ রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই আমার রাসূলদের কিছু সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ (মানুষদের কাছে)  পাঠিয়েছি এবং আমি তাদের সাথে কিতাব পাঠিয়েছি আরো পাঠিয়েছি ন্যায়দণ্ড, যাতে করে মানুষ ইনসাফের ওপর কায়েম থাকতে পারে, তাদের জন্য আমি লোহা নাজিল করেছি, যার মধ্যে বিপুল শক্তি, মানুষের বহুবিধ উপকার, এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা যিনি নিতে চান কে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলদের না দেখেও সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, আল্লাহ তায়ালা প্রচণ্ড শক্তিমান ও মহাপরাক্রমশালী’। (সূরা হাদিদ : ২৫)। আলোচ্য আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেক নবী রাসূলগণ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর এ সংগ্রামই হলো রাজনীতি। সংগ্রাম তথা চেষ্টা ছাড়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। শুধু ওয়াজ নসিহত ও দাওয়াত দ্বারা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কাজেই বোঝা যায় ইসলাম ও রাজনীতি একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ইসলাম থেকে রাজনীতি আলাদা করা যায় কি না : ইসলাম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান মেনে নেয়ার অর্থই হলো ইসলামের সব বিধান মেনে নেয়া। সব বিধানের মধ্যে রাজনৈতিক বিধানও শামিল। যেমন কেউ যদি বলে ইসলাম মানি, নামাজ মানি না তাহলে তার যেমন ইসলাম মানা হবে না। ঠিক তেমনি ইসলাম মানি, রাজনীতি মানি না তাহলে তার ঠিক  ইসলাম মানা হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের একাংশ বিশ্বাস করো এবং আরেক অংশ অবিশ্বাস করো? কখনো যদি কোনো ব্যক্তি এই আচরণ করে তাদের শাস্তি এটা ছাড়া আর কী হবে যে, পার্থিব জীবনে তাদের লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে, তাদের পরকালেও কঠিনতম আজাবে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা যা করো আল্লাহ তায়ালা সেসব থেকে উদাসীন নন’। (সূরা বাকারা : ৮৫)। যারা ইসলামকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে চায়, হয় তাদের ইসলামের পরিপূর্ণ জ্ঞানের অভাব নতুবা তারা জেনেশুনে ইসলামকে অকার্যকর করতে চায়।

ইসলাম থেকে রাজনীতি আলাদা করার পরিণতি : ইসলামি আদর্শের মূল উৎস কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। কুরআন ও সুন্নাহর বিধান শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ সব বিভাগে এর বিধান রয়েছে। ইসলাম কোরআনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, সমাজ পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যদি তাদের (মুসলমানদের) জমিনে (রাজনৈতিক) প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহলে তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, আর (নাগরিকদের) সৎকাজের আদেশ  দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে, তবে সব কাজেরই চূড়ান্ত পরিণতি একান্তভাবে আল্লাহ তায়ালারই এখতিয়ারভুক্ত (সূরা হাজ্জ : ৪১)। এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে নামাজ কায়েমের ব্যবস্থা করতে হবে। জাকাত আদায় ও বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। একটি দ্বীনভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কাজেই যারা ইসলাম থেকে রাজনীতি আলাদা করতে চায় তাদের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারাই কাফের। (সূরা মায়িদা : ৪৪)। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারাই জালেম’। (সূরা মায়িদা : ৪৫)।

আমাদের করণীয় : একজন মুসলমানের করণীয় হলো ইসলামকে পুরোপুরিভাবে মানা। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো’। (সূরা বাকারা : ২০৮)। ওপরের আয়াত থেকে বোঝা যায় ইসলামি শরিয়তের সব বিধিবিধানকে মানতে হবে। কোনো অংশকে মানা আর কোনো অংশকে বর্জন করা যাবে না। দুনিয়ার প্রতিটি কাজ ইসলামি বিধান মোতাবেক করতে হবে। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা সংগ্রাম তথা রাজনীতি করতে হবে। ইসলামি আদর্শ ছাড়া অন্য কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে না। সমাজ ও রাষ্ট্রে কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান কায়েম করার জন্য রাজনীতি করা প্রত্যেক ঈমানদারের কর্তব্য।