ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ঈমানের দাবি ধর্মদ্রোহীদের সঙ্গ বর্জন

আমাদের মাঝে আছে আল্লাহর সর্বশেষ ওহী—কোরআন ও সুন্নাহ, যা কিয়ামত পর্যন্ত সব মুমিনের পথের দিশারী। সমস্যায়-সঙ্কটে বান্দা যখন আল্লাহর বিধান অন্বেষণ করবে, সর্বাবস্থায় যা তার প্রথম কর্তব্য, অবশ্যই কোরআন ও সুন্নাহে সে তা খুঁজে পাবে। আল্লাহ তাঁর পাক কালাম নাজিলই করেছেন বান্দাকে সরল পথ দেখানোর জন্য এবং অন্ধকার থেকে আলোতে আনার জন্য।

আলো ও আঁধার পৃথিবীতে ছিল, আছে এবং থাকবে। মানুষ যখন আলোর প্রত্যাশী হয় এবং আল্লাহর সামনে সমর্পিত হয়, তিনি তাকে আলো দান করেন। পক্ষান্তরে কেউ যখন আঁধার অন্বেষণ করে আর আসমানি আলোর প্রতি বিমুখতা প্রদর্শন করে তখন আল্লাহ তাকে অন্ধকারে নিক্ষেপ করেন। এই তাঁর সুন্নত, এই তাঁর শাশ্বত নিয়ম।

এই আলোকিত ও আঁধারজীবী মানুষের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করে খলিফায়ে রাশেদ হজরত আলী ইবনে আবী তালেব (রা.) বলেন, মানুষ তিন ধরনের : এক. আলিমে রাব্বানী, যিনি প্রজ্ঞার সঙ্গে মানুষের মাঝে ইলম বিতরণ করেন। দুই. মুতাআল্লিম, যিনি কোরআন ও সুন্নাহর ইলম অন্বেষণ করেন। এ দুই শ্রেণীই মুক্তির পথের পথিক। পক্ষান্তরে তৃতীয় দলটি হচ্ছে ওই নির্বোধ ও হীন মানুষের, যাদের কাছে গ্রহণ-বর্জনের কোনো মানদণ্ড নেই—না জ্ঞানের আলো, না জ্ঞানীর অনুসরণ। ফলে সব ভ্রষ্ট-আহ্বানে এরা সাড়া দেয় এবং অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়।

মুসলিম সমাজে এ শ্রেণীর মানুষের উপস্থিতি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ তো হতে পারে অমুসলিম-সমাজে, যাদের কাছে নেই ওহীর আলো। মুসলিম সমাজের কোনো ক্ষুদ্র অংশেরই তো গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়ার কথা নয়। তবুও কিছু মানুষ ভেসে যায় এবং ভেসে যাবে, যারা মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ করেও ইসলামকে হৃদয়ে ধারণ করে না কিংবা কোরআন-সুন্নাহর আলো দ্বারা উপকৃত হয় না।

কিছু মানুষ তো শিরক ও কুফরের স্রোতেও ভেসে যায় এবং ভেসে যাবে, যারা মুশরিক—
মুনাফিকের অন্ধ অনুসারী, যে অনুসরণ কোরআন-সুন্নাহে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।
বিখ্যাত ফকীহ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, তোমরা কেউ কারও এমন অন্ধ অনুসারী হও না যে, সে ঈমানে থাকলে তুমিও ঈমানে, সে কুফরে গেলে তুমিও কুফরে!

ভক্তি-শ্রদ্ধা, অনুসরণ-অনুকরণ সব কিছুরই নীতি ও বিধান আছে, মাত্রা ও ক্ষেত্র আছে। এই নীতিজ্ঞান ও মাত্রাজ্ঞানের অভাব মানুষকে জাহিল ও অজ্ঞ করে এবং এই নীতি ও বিধান লঙ্ঘনই মানুষকে অনাচারে লিপ্ত করে।

শিরক, কুফর ও ইসলামের বিরুদ্ধাচরণের ক্ষেত্রে তো পিতামাতার অনুসরণও বৈধ নয়। কারণ সন্তানের ওপর পিতামাতার যে হক তার চেয়েও বেশি হক বান্দার ওপর আল্লাহর। পিতামাতা সন্তানের পৃথিবীতে আগমন ও বেঁচে থাকার উপায়।

পক্ষান্তরে আল্লাহ তাঁর স্রষ্টা ও পালনকর্তা। একই কথা ওস্তাদ-শিক্ষক, মুরশিদ-মুরব্বি, নেতা-পরিচালক, গোত্র-সমাজ, ভাষা ও ভূখণ্ড সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এরা সবাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র, কিন্তু দ্বীন ও ঈমানের অধিক নয়। বিরুদ্ধে তো নয়ই; বরং এসব শ্রদ্ধা নিয়ন্ত্রিত দ্বীনেরই নীতি ও বিধান দ্বারা। সুতরাং কারও দ্বারা যদি দ্বীনের অবমাননা হয়, সে যে-ই হোক, তার সঙ্গে কোনো মুমিনের বন্ধুত্ব থাকতে পারে না। কারণ দ্বীনের অবমাননা ব্যক্তির কুফর ও মুনাফেকি প্রকাশ করে। কাফির ও মুনাফিক কি কখনও কোনো মুমিনের বন্ধু হতে পারে?

কোথাও যদি আল্লাহর আয়াত ও বিধানের অবমাননা হতে থাকে তখন ওই জায়গায় শারীরিক উপস্থিতিও কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, (তরজমা) তোমাদের ওপর তো কিতাবে এই বিধান নাজিল করা হয়েছিল যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতগুলোর অস্বীকার করা হচ্ছে এবং সেগুলোর সঙ্গে বিদ্রূপ করা হচ্ছে তখন ওইসব লোকের সঙ্গে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথায় লিপ্ত হয়। নতুবা তোমরাও তাদেরই মতো (মুনাফিক গণ্য) হবে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মুনাফিক ও কাফিরদের জাহান্নামে একত্র করবেন (সূরা নিসা-২৫৫)।

সূরা নিসার এই আয়াতটি মাদানি। অর্থাত্ হিজরতের পর নাজিল হয়েছে। এ আয়াতে আগের যে আয়াতের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, মুফাসসিররা বলেন, তা হচ্ছে সূরা আনআমের আয়াত, যা নাজিল হয়েছিল হিজরতের আগে—(তরজমা) আর যখন আপনি ওইসব লোককে দেখবেন যারা আমার আয়াতগুলোয়ে লিপ্ত হয় (অর্থাত্ অস্বীকার ও বিদ্রূপ করে) তখন তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। আর শয়তান যদি আপনাকে ভুলিয়ে দেয় তাহলে স্মরণ হওয়ার পর ওই জালিমদের সঙ্গে আর বসবেন না (সূরা আনআম- ৬৭)।

কোরআন মজিদের এই নির্দেশ অটল ও শাশ্বত। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এই নির্দেশ একদিকে যেমন নিজের দ্বীন ও ঈমানের জন্য রক্ষাকবচ, অন্যদিকে প্রতিবাদ-প্রতিরোধেরও শক্তিশালী উপায়।
আজ যখন নানা মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে কটূক্তি ও মিথ্যাচার হচ্ছে, তখন সুশীল ও সত্যনিষ্ঠ মুমিনদের কর্তব্য ওইসব আসর বর্জন করা। এটা প্রথমত নিজের ঈমান রক্ষার জন্য, দ্বিতীয়ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য। আর তা সুস্থতা ও সুরুচিরও দাবি।

এরপর অপপ্রচারের জবাব-প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে প্রথম কথা এই, সবার জবাব ও সবকিছুর জবাব একরকম হয় না। যে সত্যি সত্যি জানতে চায় তার যে জবাব প্রাপ্য, যে জানার পরও হঠধর্মী করে তারও কি একই জবাব প্রাপ্য? সত্য-সন্ধানীর যে জবাব প্রাপ্য অসত্য মিথ্যাচারীরও কি একই জবাব প্রাপ্য? জালিমের জবাব তো সেটাই, যা তাকে জুলুম থেকে নিবৃত্ত করে। আর এটা শুধু সত্য-ন্যায়ের স্বার্থেই নয়, শুধু সমাজের স্বার্থেও নয়, ওই দুর্ভাগারও স্বার্থে। তার অপকর্মের ফিরিস্তি দীর্ঘ হওয়া তো তার জন্যও কল্যাণকর নয়।

এখানে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব এবং অবস্থানের বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত অনাচারকারীদের প্রতিরোধ করা। নতুবা আল্লাহর দরবারে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে, কোনো ঈমানদারের মনে যদি ইসলাম সম্পর্কে, ইসলামের কোনো বিধান সম্পর্কে বা ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন-সংশয় জাগে তাহলে তার কর্তব্য, কোনো প্রাজ্ঞ আল্লাহওয়ালার শরণাপন্ন হওয়া। যে ইলমটুকু দ্বারা এ সংশয় দূর হতে পারে তা অন্বেষণ করা ওই সময় তার ওপর ফরজ। রোগের অনুভূতি ও উপশমের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে মেহেরবান আল্লাহ অবশ্যই তার রোগমুক্তির ব্যবস্থা করবেন—ইনশাআল্লাহ।

আখিরাতে কাফির-মুনাফিকদের যেসব অপকর্মের ওপর কঠিন শাস্তির হুশিয়ারি শোনানো হয়েছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে—দ্বীনের বিষয়ে কটূক্তি ও সমালোচনাকারীদের সঙ্গে ওঁেপ্রাতভাবে যুক্ত থাকা। সূরা মুদ্দাচ্ছিরে ইরশাদ হয়েছে, জাহান্নামিদের জিজ্ঞাসা করা হবে—(তরজমা) কী কারণে তোমরা জাহান্নামের অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছ? তারা বলবে, আমরা তো নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না, মিসকিনদের খানা খাওয়াতাম না, দ্বীনের বিষয়ে (কুফর ও ইসতিহযায়) লিপ্ত লোকদের সঙ্গে আমরাও লিপ্ত হয়ে পড়তাম আর হিসাব-দিবসকে অসত্য বলতাম।

এ অবস্থায়ই আমাদের কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়েছিল। সুতরাং অনুসরণ-অনুকরণ এবং সঙ্গ ও সংশ্রবের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা কাম্য। একজন মুমিন যদি জীবনের সব ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহকেই দিশারী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ঈমানদার ও পরহেজগার ব্যক্তিদের নির্দেশনা মেনে চলেন তাহলে আল্লাহ তাকে সিরাতে মুসতাকিমের ওপর রাখবেন এবং সব ধরনের পদস্খলন থেকে রক্ষা করবেন—ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।