ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ঈমান-আমলের দাওয়াত

ঈমান-আমল গঠন করার লক্ষ্যে তাবলিগ জামাতের উৎপত্তি। মুমিন-মুসলিম হওয়ার দাবিদারের অভাব নেই। পিতা মুসলিম, মাতা মুসলিম, মুসলিম সমাজে জন্ম, নামও মুসলিমের, দাবিও মুসলিম হওয়ার; কিন্তু কামকাজে, চলনে-বলনে ইসলামের লেশমাত্র নেই। এ জন্য মুসলিম সমাজের এ অধঃপতন রোধে ঈমানি মেহনতের একটি পন্থা উদ্ভাবন করা হয়। প্রথমে গুটিকয়েক মানুষের মাঝে তা সীমিত ছিল। ক্রমেই তা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বর্তমানে সারা বিশ্বে এ পদ্ধতির দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ছে। হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহ: এ দাওয়াতি পন্থার উদ্ভাবক। তার ইখলাস-ন্যায়নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত। তার সমসাময়িকেরা কেউ কেউ ছিলেন রাজনীতির দিকপাল, কেউ পীর-মুরিদির মুরশিদ, কেউ ছিলেন খানকার প্রতিষ্ঠাতা আবার কেউ ছিলেন শিক্ষাদীক্ষা, দানে খ্যাতিমান। কারো কোনো অবদানকে খাটো করে না দেখলেও মাওলানা ইলিয়াস রহ: দাওয়াতের যে ধারা রচনা করে গেছেন তা যেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে অন্য কোনো পন্থা সেভাবে ব্যাপকহারে পায়নি।

তাবলিগ কোনো সাংগঠনিক সংস্থা নয়, দাওয়াতে ইলাল্লাহ এর মুখ্য উদ্দেশ্য। নিজেকে আল্লাহর পথে তৈরি করা এবং অপরকে আমল-আখলাকে উৎসাহিত করা হলো তাবলিগের মূল কাজ। যিনি এ ধারা চালু করেছেন তিনি নিজেও এর কোনো নাম চয়ন করেননি। তার চিন্তাচেতনা ছিল ঈমানকে সবল করা। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস মজবুত হয়ে গেলে মুমিনের জন্য নেক আমলের পথে চলা সহজ। কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও ঈমানদার ব্যক্তি ঈমানের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।

মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সবকিছুর মূলে আল্লাহর হুকুম কাজ করে; জলে-স্থলে, অন্তরীক্ষে যা কিছু রয়েছে সবই আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হয়। কাউকে বিত্তবান করা, কাউকে বিত্তহীন করা, কাউকে রাজা, কাউকে প্রজা বানানো সবই আল্লাহর ইচ্ছাধীন। হায়াত মউতের মালিক আল্লাহ। তিনি ইচ্ছা করলে নিশ্চিত মরণের দুয়ার থেকে কাউকে বাঁচাতে পারেন আবার সুস্থ সবল কাউকে মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুমুখে পতিত করেন। এসব বিষয়ের চর্চা হয় তাবলিগ জামাতে। এ কারণে এর প্রবর্তক বলেন, আমি যদি এ দাওয়াতি পন্থার কোনো নাম নির্বাচন করতাম তাহলে এর নাম দিতাম তাহরিকে ঈমানি বা ঈমানি আন্দোলন। ক্রমান্বয়ে এ দাওয়াতি কাফেলার নাম তাবলিগি জামাত নামে পরিচিতি লাভ করে। শায়খুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া দাওয়াতের কাজের সুবিধার্থে একটি গ্রন্থ রচনা করে দিয়েছিলেন। প্রথম দিকে একে তাবলিগে নেসাব বলা হলেও এখন দেখা যায় গ্রন্থটির নাম ফাজাইলে আমল লেখা হয়।

বৈশ্বিক বাস্তবতায় তাবলিগ : আল্লাহর এ পৃথিবী আজ বহু দেশে বিভক্ত। নানা শাসক বিভিন্ন ভূখণ্ড শাসন করছে। এক দেশ মুসলিম কর্তৃক শাসিত হলে অপর দেশ খ্রিষ্টান শাসনাধীন। এক দেশের লোকজন আস্তিক হলে অপর দেশের জনগণ নাস্তিক। কোনো দেশ গণতান্ত্রিক আর কোনো দেশ রাজতান্ত্রিক। নানা কারণে এক দেশ অপর দেশের শত্রু। তাবলিগ জামাত অরাজনৈতিক হওয়ায় এসব তন্ত্রমন্ত্রের ঊর্ধ্বে। ফলে এক দেশ থেকে অপর দেশে গমনাগমনে তারা বাধাপ্রাপ্ত হন না।

তাবলিগ একটি সেতুবন্ধন : ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা এমনকি এশিয়ায়ও বহু অমুসলিম দেশ রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অমুসলিম হলেও ফাঁকে ফাঁকে বহু মুসলিম এ দেশগুলোতে বাস করছে। রাশিয়া ও চীনে একসময় মুসলিম আধিপত্য ছিল। ইউরোপের কোনো কোনো অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন পর্যন্ত ছিল। কালান্তরে আজ তা বিস্মৃত। তাবলিগের দাওয়াতের ফলে বর্তমানে দায়িগণ সেসব অঞ্চলে যেতে পারছেন, আবার সেখানকার লোকজন অন্যান্য মুসলিম দেশে সফর করছেন। তাবলিগি দাওয়াতই এক দেশের মুসলিমের সাথে অপর দেশের মুসলিমের যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করছে।

নির্ভুল ঈমান-আকিদার লালন : অনেকে মনে করেন কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের নাম ইসলাম। মাঝে মাঝে মৌলভী-মুন্সি ডেকে একটি মিলাদ পড়িয়ে নিলে কম কিসে। কেউ মারা গেলে মাদরাসার ছাত্র অথবা কোনো হুজুর ডেকে মৃতের পাশে কুরআনখানি করলে পার পাওয়া যায়। কুলখানি, চেহলাম ইত্যাদি বড়ই সওয়াবের কাজ। নামাজ নেই, রোজা নেই, বার্ষিক মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান বড় ইবাদত। আমল-আখলাকের প্রয়োজন নেই, পীরের কাছে মুরিদ হলেই কিয়ামতকালে পীরসাহেব পার করে দেবেন। মৃত পীরের কবরকে মাজার বানিয়ে ‘মহাপবিত্র উরস’ পালন করা হচ্ছে। কবরের পীরের কাছে কিছু পাওয়ার আশায় বাবা আমার এই সমস্যা, এই বিপদ তুমি ত্বরিয়ে নাও বলে বিলাপ করছে। জিন্দাপীর ও মুর্দাপীরকে সিজদা করছে। এগুলোকে ইসলামের রীতিনীতি বলে জ্ঞান করছে। ইসলামী সমাজে এভাবে হাজারও বদরুসুম চালু রয়েছে। দাওয়াতে তাবলিগ কৌশলে এসব কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখছে। এক-দুই চিল্লা লাগালে এসব বদ-আকিদা কারো মাঝে অবশিষ্ট থাকে না। পরিপক্ব না হলেও এসব কাজ যে খারাপ তা মোটামুটি বুঝে আসে।

মসজিদে শয়ন করা : অনেকে মনে করেন মসজিদে শয়ন করা জায়েজ নেই, অথচ তাবলিগিরা মসজিদে শয়ন করে। এ ব্যাপারে মূল কথা হলো, মসজিদের ইহতিরাম করা। মসজিদের সম্মান বিঘিœত হয় এ ধরনের সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা সবারই উচিত। অযথা হইহুল্লোড় করা, উচ্চস্বরে কথা বলা ইত্যাদি মসজিদের আদবের পরিপন্থী। মসজিদে প্রবেশ করে মসজিদের সম্মানার্থে দু’রাকাত সালাত আদায় ব্যতিরেকে বসে পড়াও আদবের খেলাফ। যারা তাবলিগে যায় তারা এ ব্যাপারে খুবই সচেতন থাকে। জামাত রওনা হওয়ার সময় মুরব্বিরা এ ব্যাপারে জোর তাকিদ দিয়ে থাকেন। মসজিদের যাবতীয় আদব-কায়দা মেনেই তারা মসজিদে অবস্থান করেন।

মসজিদে থাকার জন্য কেউ তাবলিগে যায় না বরং দ্বীনের প্রয়োজনে তারা মসজিদে অবস্থান করে। প্রয়োজনে শুধু থাকা কেন মসজিদে থেকে চিকিৎসা গ্রহণের প্রমাণও রাসূলুল্লাহ সা: থেকে বর্ণিত। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত সাদ ইবন মুআজ রা: খন্দকের যুদ্ধে আহত হন। রাসূলুল্লাহ সা: তার সেবাশুশ্রƒষার জন্য মসজিদের অভ্যন্তরে একটি স্থান নির্ধারণ করে দেন। তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল। মসজিদে বানু গিফার নামক একটি গোত্রের অবস্থানের জন্য অপর একটি স্থান নির্দিষ্ট ছিল। হজরত সাদ রা:-এর ক্ষতস্থানের রক্ত পর্যন্ত সেখানে গড়িয়ে পড়ছিল (সহিহ মুসলিম, পৃষ্ঠা ৯৫)। ওই হাদিসের আলোচনায় হাদিসের বিশিষ্ট ব্যাখ্যাকার আল্লামা নাওয়ায়ি বলেন, এ থেকে প্রমাণিত হয় ঘুমানো এবং অসুস্থ ব্যক্তির অবস্থান মসজিদে জায়েজ আছে।

সাধারণ জনে তাবলিগের ব্যাপক প্রভাব : তাবলিগি দাওয়াত সাধারণ মুসলিম সমাজে বিশেষ অবদান রেখেছে। কত লোককে নানা কুকর্ম করতে দেখা গেছে কিন্তু যেই তাবলিগে অংশগ্রহণ করেছে তার মাঝে অকল্পনীয় পরিবর্তন এসেছে। বেনামাজি নামাজি হয়েছে। সুদখোর, ঘুষখোর, নেশাখোর ইত্যাদি অবৈধ খাদকরা তওবা করে ভালো মানুষে পরিণত হয়েছে। সন্ত্রাসের অনেক গডফাদার শান্তির গুডব্রাদারে পরিণত হয়েছে। হাতের পিস্তল ছেড়ে দিয়ে তাসবিহ জপায় নিমগ্ন হয়েছে। মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান চিল্লা শেষে ঘরে ফিরে জনক-জননীর পদতলে চুম্বন করেছে। কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা তাবলিগের চিল্লা থেকে ফেরার পর এমন লেবাস পোশাক ধারণ করেছে, মনে হচ্ছে, মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে ঘরে ফিরেছে। বখাটে ছেলেরা চিল্লা দেয়ার পর মা-বোনের ইজ্জত রক্ষায় সহপাঠীদের মাঝে খোদা ভীতির বয়ান শোনাচ্ছে। এভাবে হাজারও অপকর্মে লিপ্ত মানুষকে তাবলিগি দাওয়াত সোনার মানুষে পরিণত করেছে।

তাবলিগের ছয় উসুল : সমালোচকেরা বলে থাকেন ইসলামের ভিত্তি যেখানে পাঁচটি সেখানে তাবলিগ আবার ছয়টি ভিত্তি রচনা করে কোন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অনেকে বলে যে, তাবলিগের ছয় উসুল রচনা ইসলামের পাঁচটি ভিত্তি অস্বীকার করার নামান্তর। প্রকৃতপক্ষে তাবলিগের এ ছয়টি বিষয় ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির ওপর সুদূঢ়ভাবে অবস্থানের সিঁড়িস্বরূপ। তাবলিগে বহুল পঠিত ফাজাইলে আমলে ইসলামের এ পাঁচটি বিষয়ের মূলত আলোচনা রয়েছে।

উপসংহারে বলতে চাই আল কুরআনকে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের হিদায়তকারী ও সুন্দর উপদেশ বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং শুধু তিলাওয়াত নয় এর মর্ম উপলব্ধি ও বিষয়বস্তু নিয়ে হালকায় আলোচনা করতে হবে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধমূলক বিষয়গুলো তাবলিগের বয়ান ও আলোচনায় থাকতে হবে। জিহাদের আয়াত ও হাদিসকে টেনে এনে তাবলিগের কাজে ব্যবহারের মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আখেরি মোনাজাতের বিষয়টি খোলাসা করে দিতে হবে। সাধারণ মানুষ যেভাবে এর প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা একে ধার্মিক সাজার মোক্ষম সুযোগ বলে ব্যবহার করে তা হতে দেয়া যায় না। দিন দিন অনেক সংস্কার দেখা যাচ্ছে, আশা করি মুরব্বিরা বা দায়িত্বশীলগণ এ ব্যাপারে আরো সচেতন হবেন।