ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

উত্কর্ষ সাধনে সিয়ামের ভূমিকা

এ সম্পর্কে সন্দেহ নেই, আধ্যাত্মিক ও ইহজাগতিক উত্কর্ষ সাধনে রমজানের ভূমিকা অতুলনীয়। সিয়াম সাধনায় যেমন রয়েছে পার্থিব মুক্তি সাধনের প্রক্রিয়া, তেমনি রয়েছে দৈহিক সুস্থতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের উপায়। সারা বছর মানুষ স্বাভাবিকভাবে খেয়ে-দেয়ে যে অতিরিক্ত মেদ ও অপ্রয়োজনীয় জৈব পদার্থ জমিয়ে ফেলে তারই মোক্ষণ (চঁত্মধঃরড়হ) হয় রমজানের সিয়াম সাধনায়।

অধ্যক্ষ ডাক্তার জিসি গুপ্ত বলেছেন, পবিত্র ইসলাম সিয়াম পালনের যে বৈজ্ঞানিক নির্দেশ দিয়েছে, তা মানুষের দৈহিক ও আত্মিক মঙ্গল সাধনে সক্ষম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ডক্টর আর ক্যাম্বারড বলেছেন, সিয়াম পরিপাক শক্তির সহায়ক। ডক্টর এমারসন বলেছেন, যদি কারও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য উপবাসের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সে যেন ইসলামের নির্দেশ মোতাবেক সিয়াম পালন করে।

অতি ভোজনের ফলে অনেক সময় দেহে নানা ধরনের রোগ-জীবাণু আশ্রয় নেয়, অপ্রয়োজনীয় মেদ সঞ্চিত হয় এবং কর্মক্ষমতা স্তিমিত হয়ে আসে। তাই চিকিত্সকরা এসব রোগীকে আহার নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেন। ডায়াবেটিক ও গ্যাস্ট্রিক রোগীর জন্য সিয়াম সাধনা এক পরীক্ষিত মহৌষধ। দিল্লির একজন বিখ্যাত চক্ষুচিকিত্সক বলেছেন, এক মাসের সিয়াম সাধনায় চক্ষুর ভেতরের অসংখ্য সূক্ষ্ম তন্তু বা নার্ভ সতেজ হয়ে ওঠে এবং দৃষ্টিশক্তিকে প্রখর করে তোলে। সিয়ামে বাত রোগের মহাউপকার হয়।

কিছুদিন আগে লন্ডনে এক বিশ্বস্বাস্থ্য সেমিনারে সিয়াম সাধনার ওপর আলোচনা করে মার্কিন মুল্লুকের এক খ্যাতনামা চিকিত্সক বলেছেন, মুসলমানদের এক মাসের উপবাস মানবদেহে এন্টিবায়োটিক এক বিরাট শক্তির সৃষ্টি করে, যার সাহায্যে মানবদেহের ষাট হাজার রোগ জীবাণু ধ্বংস করতে সমর্থ হয়। সিলেট মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডক্টর গোলাম মুআজ্জম লন্ডনের হাসপাতালে বেশ কয়েকজন রোগীর উপর পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছেন, রমজানের সিয়াম পালনে দেহের অর্ধেক রোগের প্রতিষেধক তৈরি হয়। মোহনলাল করমচাঁদ গান্ধী নিজের উপর পরীক্ষা করে অভিমত প্রকাশ করেছেন, ইসলামী বিধানের সিয়াম পালনে মানবদেহে অলৌকিক শক্তির সঞ্চার হয় এবং বাহ্য রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা জন্মে।

রামকৃষ্ণ পরমহংস স্বয়ং সিয়ামের অনুশীলন করেছেন বলে জানা যায়। তিনি এর অমোঘ ফলে মুগ্ধ হয়েছেন এবং বলেছেন, অধ্যাত্ম সাধনায় সাফল্য লাভের জন্য ইসলামী পদ্ধতির সিয়ামের তুলনা হয় না। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ইসলামী সিয়ামের প্রশংসা করে বলেছেন, নিয়মিত সিয়াম পালন করলে মুসলিমদের এ সিয়াম সাধনায় এ দেশের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ লোকের মানসিক ও দৈহিক রোগ প্রশমিত হতে পারে এবং পঞ্চাশ ভাগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা সিয়াম পালন কর, তাহলে অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারবে।

ভোগের স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচার থেকে সংযম এবং ত্যাগের কঠোরতায় এনে এ সিয়াম মুমিনকে যেমন দৈহিক ও জাগতিক উন্নতির প্রশিক্ষণের সুযোগ দেয়, তেমনি মানব জীবনের অধ্যাত্মা সাধনায় উত্কর্ষ লাভেরও সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়ে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়ার চাবি তুলে ধরে এ সিয়াম সাধনা। আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নতির জন্য এ যাবত এমন সাধক পাওয়া যায়নি যিনি সিয়াম সাধনার সাহায্য গ্রহণ করেননি।

ইসলামী দর্শনের অন্যতম পণ্ডিত, প্রাচ্যের একালের আদর্শ মুসলিম সাধক আল্লামা ইকবাল বলেছেন, সিয়াম সাধনায় আধ্যাত্মিক পথের আলো দেখা যায়। তিনি অবিরাম ষাটদিন পর্যন্ত সিয়াম পালন করে অধ্যাত্ম সাধনায় নিয়োজিত থাকতেন এবং কেবল ইফতারের সময় একবার মাত্র সামান্য দুধ বা অন্য খাবার খেতেন। দুনিয়ার বড় বড় সাধকের জীবনী এ ধরনের বহু ঘটনায় পূর্ণ। সিয়ামের আরও দুটি দিক রয়েছে—একটি তার সামাজিক দিক ও অন্যটি তার নৈতিক দিক।

সামাজিক দিক থেকে এর মূল্য অপরিসীম। সিয়াম সাধনায় ব্যক্তিগত দিক থেকে দৈহিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের প্রভাব যেমন আমাদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক সংশোধন অর্থাত্ ‘জিসমানি’ ও ‘রূহানী’ তরক্কীর কিংবা জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্কের উন্নতি সাধনের অধ্যাত্ম সাধনার পরিশীলনী হয়, তেমনি এর বহিরঙ্গের দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়। সিয়াম সাধনায় ব্যক্তিগত শিক্ষার সঙ্গে পরিবার ও গোষ্ঠীগত শিক্ষার মহড়া হয়। একজনের দেখাদেখি অপরজনও সিয়াম পালনে উদ্বুদ্ধ হয়। আর এভাবে তা বৃহত্তর সমাজে পরিব্যাপ্ত হয়। প্রবাদ রয়েছে যে, দেখ-দেখা ধর্ম ও শেখ-শেখা কর্ম।

রাসুলুল্লাহের (সা.) নির্দেশ রয়েছে যে, সিয়াম পালনে সব রকমের মিথ্যা, কুবাক্য, কুচিন্তা ও কুকর্ম থেকে বিরত থাকবে। যে সায়েম মিথ্যা ও পরনিন্দা ত্যাগ করে না তার সিয়াম আল্লাহতায়ালা কবুল করেন না। সিয়াম আত্মার পবিত্র মহৌষধ। সামান্য পার্থিব ক্ষতিতে আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি, এমনকি দুঃখে চোখে পানি আসে। আমরা যে অহরহ প্রতি কাজে ফাঁকি দিয়ে আসছি তার জন্য কোনো দিন সামান্য মাত্র অনুতপ্ত হয়েছি কী? আমাদের ভুললে চলবে না যে, বান্দার হক খেয়ানত করলে আল্লাহও তা ক্ষমা করেন না।

আপনার খিদমত করাই ছিল আমার আদর্শ কাজ। কিন্তু আমি তা না করে বিভিন্নভাবে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি, একবারের স্থলে পাঁচবার ঘুরিয়েছি—এসবই কি মানবতাবিরোধী ক্রিয়াকর্ম নয়? আর সেগুলো করেও সমাজের বুকে আমি দিব্যি আরামে নেতাগিরি করে বেড়াচ্ছি। এ ধরনের কৃত্রিম ধার্মিকতায় ও উপবাস-কৃচ্ছ্রতায় আমার কোনো সংশোধনই হলো না, বরং সমাজে তা পরিব্যাপ্ত হয়ে দুর্নীতির ক্যান্সার বৃদ্ধি করছে। এ রূপ সাধনায় ব্যক্তিগত বা সামাজিক কোনো উন্নতিই নেই। সওয়াব তো নেই-ই। এতে আপনি কাল্পনিক আত্মতৃপ্তি লাভ করতে পারেন মাত্র।

লেখক : ড. কাজী দীন মুহম্মদ, সাবেক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢা.বি.