ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

উত্তম আদর্শ

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে কারীমে ‘নবীরা দৃঢ়চিত্ত হয়ে থাকেন’ উপাধিতে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বাস্তবতাও একথাই বলে দেয় যে, দুনিয়ার বুকে— দৃঢ়তা, স্থিরতা, বীরত্ব এবং হিম্মতের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য নবীদের মতো আর কারও মাঝে হতেই পারে না। বিশেষত, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু সর্বশেষ নবী ছিলেন, তার মাধ্যমেই সমগ্র বিশ্ব জগতে হিদায়াতের আলো ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকে আলোকিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ জন্য আল্লাহ তাআলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে এই বৈশিষ্ট্য এই গুণাগুণ পুরো মাত্রায় প্রদান করেছিলেন, যা আমাদের চিন্তার দৃষ্টি আয়ত্তে নিতেও অক্ষম।

এমনিতেই রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের প্রতিটি লহমা ছিল দৃঢ়তা-স্থিরতা, বীরত্ব এবং মাহসিকতার এক মূর্ত প্রতীক। মানবতার ইতিহাস এমন দৃঢ়তার নজির উত্থাপনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ যে,মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ছিল এমন এক সামাজিক পরিবেশে যার আগাগোড়াই জুলুম মূর্খতা আর অজ্ঞতায় ডুবন্ত ছিল শুধু তাই নয়, বরং তারা এ নিয়ে ছিল গর্বিত। তারা নিজেদের ইসলাহ-সংশোধনের কোনো প্রয়োজন তো মনে করতই না, বরং নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস, সামাজিক কুসংস্কার এবং গোষ্ঠীগত রেওয়াজরীতির বিরুদ্ধে একটি টু শব্দ পর্যন্ত শোনার জন্য প্রস্তত ছিল না।

এমনই এক প্রতিকূল পরিবেশে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ছিল একেবারেই এককভাবে। এই প্রতিকূল পরিবেশের ইসলাহ সংশোধনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সময় পেয়ে ছিলেন মাত্র ২৩ বছর। আর বিকৃত সমাজকে সঠিক পথে আনার দায়িত্ব ছিল তাঁর একার ওপর। মাতা-পিতার ছায়াহারা ছিলেন তিনি সেই ছোটকাল থেকেই। তাঁর ছিল না কোনো ভাইবোন। দৃশ্যত, তার কোনো সাহায্যকারীও ছিল না। ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠার একাকীত্ব এবং সম্পূর্ণ প্রতিকূল অবস্থার ভেতরই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসীম সাহস ও হিম্মত নিয়ে পুরো জাতির ইসলাহ সংশোধনের জন্য সামনে এগিয়ে গেলেন। ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত দাওয়াতি জীবন শেষে যখন তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান তখন সমগ্র আরব অঞ্চল শুধু একজন মুশরিকেরই অবিদ্যমান ছিল তাই নয় বরং তিনি এমন লাখো সাহাবায়ে কেরামের একটি বিশাল দল প্রস্তুত করে রেখে যান যাদের এক একটি কথা এবং কাজ বিদ্যমান পৃথিবীর মানবতার পথ প্রদর্শনে যথেষ্ট।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে আরব সমাজের চোখ ধাঁধানো এই ইনকিলাব, এই বিপ্লব ও পরিবর্তন কোনো অলৌকিক মুজিজার মাধ্যমে সাধিত হয়নি; বরং তার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অকৃত্রিম চেষ্টা-প্রচেষ্টা, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং কর্মযজ্ঞের অক্লান্ত মেহনতের বদৌলতেই পরিবর্তনের ঢেউ খেলে যায়, যা ছিল এক কল্পনাতীত ব্যাপার। কারণ সমগ্র আরবের প্রতিটি মানুষ ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথের প্রতিবন্ধক। তার পরও তিনি ছিলেন অটল, অবিচল। তাঁর দৃঢ়তা-স্থিরতার কারণে এসব প্রতিবন্ধকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

হিজরতের আগে সাহাবায়ে কেরামের ওপর চলছিল অত্যাচারের স্টিমরোলার। কোনো কোনো সাহাবী এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরজ করলেন, আপনি আমাদের জন্য কেন দু’আ করছেন না? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা ক্রোধে লাল হয়ে গেল। বললেন, আগেকার নবীদের এবং তাদের সাথী-সঙ্গীদের করাত দ্বারা চিরে দেয়া হতো, তাদের দেহ লৌহ কাস্তে চালিয়ে গোস্ত মাংস পৃথক করে দেয়া হতো, এত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পরও তারা দ্বীনের ওপর ছিলেন অটল, অবিচল। এক চুল পরিমাণ তাদের দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আল্লাহর শপথ! দ্বীন ইসলাম অবশ্যই চূড়ান্ত বিজয়ের সফলতা বয়ে আনবে। সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত একজন পথিক নিঃসংকোচ ও নির্ভয়ে চলে আসবে। আল্লাহ ছাড়া তার ভয়ের আর কোনো কারণই থাকবে না। (সহীহ বুখারী শরীফ)

কুরাইশের কাফের সর্দাররা যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দ্বীনের দাওয়াত থেকে বিরত রাখার সব চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও কৌশল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন তারা সর্বশেষ ঢাল হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাজত্ব, ক্ষমতা, ধন-সম্পদ এবং সুন্দরী রমণীর লোভ-লালসাও দেয়। এমন কি, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবও কাফির মুশরিকদের এই প্রস্তাব মেনে নেয়ার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। এ সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জবাব দেন, তা হিম্মত সাহসিকতার জগতে ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি জবাব। যার নজির খুঁজে বের করা একেবারে দুষ্কর। তিনি বলেন: চাচাজান! এরা যদি আমার একহাতে সূর্য অন্য হাতে চন্দ্রও এনে দেয়, তথাপি আমি সত্যের দাওয়াত থেকে এক চুলও সরে আসব না। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মত্যাগী সাহাবায়ে কেরাম যদিও তাঁর জন্য জীবন উত্সর্গ করে দিতে সদা-সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন। তারপর বিভিন্ন জিহাদে যখন তুমুল লড়াই শুরু হয়ে যেত, বড় বড় সাহসী যোদ্ধারাও যখন পিছপা হতে বাধ্য হয়ে যেতেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহসিকতা, হিম্মত ও বীরত্ব তাদের আশ্রয়স্থল হতো।

হজরত আলী (রা.) বলেন: ‘বদর যুদ্ধে যখন তীব্র লড়াই শুরু হয়ে গেল, তখন আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই পাশে আশ্রয় গ্রহণ করি। তিনি সবার মাঝে সবচেয়ে বেশি সাহসী ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে মুশরিকরা (অন্যদের তুলনায়) তারই বেশি কাছাকাছি থাকত।’ (মুসনাদে আহমদ : খণ্ড-১, পৃষ্ঠা ১২৬-১৫৬)।

হজরত বরা (রা.) একথা বলেছেন : ‘আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় বীর সেই গণ্য হতো, যে রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে দাঁড়াত।’ (সহীহ মুসলিম শরীফ)

হজরত আনাস (রা.) বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবার চেয়ে সাহসী বীরপুরুষ। এক রাতে হঠাত্ করেই মদীনার বাতাসে গুজব ছড়িয়ে পড়ল, শত্রুবাহিনী মদীনার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। সবাই ঘাবড়ে গিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর দেখা গেল মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঘোড়ার উন্মুক্ত পিঠে আরোহণ করে তিনি কোথাও থেকে বেরিয়ে আসছেন। তিনি এসেই উপস্থিত সবাইকে সান্ত্বনা দিলেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই। পরে জানা যায় যে, গুজব ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি একাকীই ঘোড়ার উন্মুক্ত পিঠে চড়ে আশঙ্কাজনক সব জায়গাই ঘুরে দেখে এসেছেন। (সহীহ বুখারী শরীফ)

মোট কথা মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সারাটা জীবনই ছিল দৃঢ়তা, সাহসিকতায় পরিপূর্ণ। শত্রুপক্ষের হামলা আক্রমণ, ভয়ভীতি অত্যাচার নির্যাতনে কখনও তিনি বিচলিত ছিলেন না। হিম্মত বীরত্ব ছিল তাঁর সারা জীবনের ইতিহাস। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সাহায্য আসত তাঁর ওপর বিশেষভাবে। কখনই তিনি পরাজিত ব্যর্থ হতেন না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দুজাহানের কাণ্ডারি মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুযায়ী জীবন যাপনের তাওফিক দান করুন। আমীন!