ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

উত্তরাধিকারী সম্পত্তিতে নারীদের যে অধিকার দেয়া হয়েছে

“হে রসূল (স.)! মানুষেরা আপনাকে মিরাস সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করছে, আপনি বলুন, এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। যদি কোন পুরুষ লোক মারা যায় এবং তার কোন সন্তানাদি না থাকে এবং এক বোন থাকে, তবে সে পাবে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক অংশ আর সে যদি নিঃসন্তান হয় তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। তার দুই বোন থাকলে তাদের জন্য তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ পক্ষান্তরে যদি এক ভাই ও এক বোন থাকে তবে বোন যা পাবে ভাই পাবে তার দ্বিগুণ।

তোমরা বিভ্রান্ত হবে বলে আল্লাহ তোমাদের সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন” (সূরা নিসা ১৭৬ আয়াত)। আরবীতে মিরাস শব্দের অর্থ হলো উত্তরাধিকারী সম্পত্তি। এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির বন্টন প্রক্রিয়াটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজ আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষ এটিকে গুরুত্বহীন মনে করার কারণে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা নামাজ পড়ছে, রোজা থাকছে, অন্যান্য ইবাদত বন্দেগী সবই আদায় করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

যার কারণে হঠাত্ একদিন মৃত্যুবরণ করায় মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির সঠিক ভাগ-বন্টন হচ্ছে না। যারা থাকছেন তারাও সঠিকভাবে করছেন না। যার যতটুকু পাওয়ার অধিকার ছিল সে তা হতে মাহরুম বা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে নারীরাই বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন। কিভাবে হচ্ছেন? তার সঠিক জবাব হলো পিতা তার সম্পত্তির বন্টন না করে যাওয়ায় ভাইয়েরা বোনদেরকে ও অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করেই চলেছেন। বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুত্ববহ তা তাদের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এটা যে অনেক সত্ লোকের আমল বিনষ্ট করে দিতে পারে। সে ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ অসচেতন। যেহেতু জমির চূড়ান্ত বিচারে মালিক কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালা। তাই তার বন্টনও হবে একমাত্র আল্লাহর নীতি বিধান অনুযায়ী।

কেউ যদি অন্যায়ভাবে ওয়ারিশি সম্পত্তি হরণ করে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। রসূল (স.) বলেছেন, ‘যে কেউ অন্যায়ভাবে অপরের সম্পত্তি হরণ করে, তা যদি এক বিঘাত পরিমাণও হয়। তবুও তার ওপর সাত তবক জমিন চাপিয়ে দেয়া হবে।’ এই কথা আমলে না নেয়ার কারণে সমাজে ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা দিনে দিনে সংক্রমিত হচ্ছে। অনেকে মাতা-পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আত্মসাত্ করছেন, গরীব দুঃখী, অসহায়, দুর্বল ও এতিমদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে আত্মসাত্ করছেন। বিধবার অন্যত্র বিবাহ হলে আগের স্বামীর সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই-বোনদেরকে অনেক সময় অস্বীকার করা হচ্ছে। এগুলো গুরুতর অন্যায়, ভীষণ পাপ, শরীয়ত পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে কারণে যারা পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় রাখে। যারা বিশ্বাস করে অবশ্যই আমাদেরকে এই নশ্বর জগত্ ছেড়ে আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতে হবে এবং জীবনের সকল কাজের পুংখানুপুংখ হিসাব দিতে হবে। তাদের উচিত হলো মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তির বন্টনের ক্ষেত্রে শরিয়তী বিধান অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করা। কারণ বারবার অভিযোগ সৃষ্টি হচ্ছে যে, ইসলাম নারীদের ঠকিয়েছে।

নারীদেরকে ইসলাম কিছুই দেয়নি। কিন্তু ইসলাম যে নারীদেরকে ঠকায়নি এবং অনেক কিছুই দিয়েছে। সে ব্যাপারে তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে আমরা ক’জন সক্ষম হয়েছি? আমরা কেন বলতে পারছি না, ‘হে নারী সমাজ! তোমাদের তো ঐ সমস্ত অধিকারগুলো দেয়া হয়েছে। তোমরা তো ঐগুলো পেয়েছো। আমরা তা বলতে পারছি না সাহস করে। কারণ আমরা প্রত্যেকেই প্রায় এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সন্ধানেরত আছি। নারীদের যে অধিকারের কথা ইসলামে বলা হয়েছে, তা যেন ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নেই’ মত দশা। যার কারণে নারীবাদী আন্দোলন সোচ্চার হচ্ছে। তারা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছেন।

রসূল (স.)-এর একটি হাদিসে এভাবে আছে -“কুল্লুকুম রইন, ওয়াকল্লুকুম মাছ উলিন, আন রয়িয়াতিহী” অর্থাত্ তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর এ ব্যাপারে তোমরা অবশ্যই আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবে।’ মানব সমাজে প্রত্যেকেরই অন্যের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। তাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো পরিত্যক্ত সম্পত্তির যারা হকদার তাদেরকে তাদের হক পূর্ণভাবে ফিরিয়ে দেয়া। যদি তা না করা হয় তাহলে অবশ্যই আমরা অপরাধী প্রতিপন্ন হবো। আর আমাদের অন্যান্য আমলগুলো সবই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। তাই আসুন নতুন করে শপথ নিয়ে আজ হতে আল কুরআনের প্রত্যেকটি বিধান মেনে চলার জন্য দৃপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করি। তার মধ্যে সর্বাগ্রে রাখি ওয়ারিশি সম্পত্তির সুষম বন্টনের কাজটি।

কুরআন ও হাদীস মোতাবেক যাদের মধ্যে ওয়ারিশি সম্পত্তি বন্টন হবে তাদেরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১. যবিল ফুরুজ বা রক্তের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠজন।

২. যবিল আছাবা বা অবশিষ্ট হকদার।

১. যবিল ফুরুজ ওয়ারিশগণ বারজন। তারা হলেন ১. মাতা ২. পিতা ৩. দাদা ৪. স্বামী ৫. স্ত্রী ৬. কন্যা ৭. পৌত্রী ৮. দাদী ৯. নানী ১০. ভগ্নি বা বোন ১১. বৈমাত্রেয় ভগ্নি বা বোন ১২. বৈপিত্রেয় ভ্রাতা ভগ্নি।

শরীয়তে এদের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। খাম-খেয়াল বা অনির্ধারিত নেই। যা আছে তা বদলানোর সুযোগ নেই। ওয়ারিশি সম্পত্তির বন্টনের শুরুতেই তাদের নির্ধারিত সম্পত্তি দিয়ে দিতে হবে। কোন অবস্থাতেই কম-বেশি করা যাবে না।

এরপর বিল আছাবা অর্থাত্ দ্বিতীয় শ্রেণীর ওয়ারিশ। প্রথম শ্রেণীর ওয়ারিশদেরকে প্রাপ্য অংশ দেয়ার পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটাই এদের মধ্যে বন্টন করে দিতে হবে। মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি ভাগ বা বন্টনের সময় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে তার কোন ঋণ আছে কিনা। থাকলে সেটা আগে পরিশোধ করতে হবে। কোন অছিয়াত থাকলে তা আগে প্রদান করতে হবে।

যেমন সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, “আল্লাহ তোমাদের সন্তান-সন্ততি সম্বন্ধে বিধান দিয়েছেন, তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তোমাদের অংশ হচ্ছে অর্ধেক, যদি তাদের কোন সন্তানাদি না থাকে। আর যদি তাদের কোন সন্তান থাকে তাহলে সে সম্পত্তিতে তোমাদের অংশ হবে চার ভাগের এক ভাগ। তারা যে অছিয়াত করে গেছে কিংবা তাদের ঋণ পরিশোধ করার পরই তোমরা এ অংশ পাবে। তোমাদের স্ত্রীদের জন্য থাকবে তোমাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ। যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি সন্তান থাকে, তাহলে তারা পাবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ।

মৃত্যুর আগে তোমরা যা অছিয়াত করে যাবে এবং যে ঋণ তোমরা রেখে যাবে তা পরিশোধ করে দেয়ার পরই এই অংশ তারা পাবে। যদি কোন পুরুষ নারী এমন হয় যে, তার কোন সন্তান নেই, পিতা-মাতাও নেই শুধু আছে তার এক বোন ও এক ভাই। তাহলে তাদের সবার জন্য থাকবে ছয় ভাগের এক ভাগ। ভাইবোন মিলে যদি এর চেয়ে বেশি হয় তবে মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের তারা সবাই সমান অংশিদার হবে।

অবশ্য এ সম্পত্তির ওপর মৃত ব্যক্তির যে অছিয়াত আছে কিংবা কোন ঋণ পরিশোধের পরই এ ভাগাভাগি করা যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কখনো উত্তরাধিকারীদের অধিকার পাওয়ার পক্ষে তা যেন ক্ষতিকর হয়ে না দাঁড়ায়। কেননা এ হচ্ছে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ।” মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তি সম্পর্কে সূরা নিসা ১১নং আয়াতে আরো পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, “আল্লাহতায়ালা তোমাদের উত্তরাধিকারে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে বিধান জারি করেছেন যে, এক ছেলের অংশ হবে দু’ কন্যা সন্তানের মত, কিন্তু উত্তরাধিকারী কন্যারা যদি দু’য়ের অধিক হয়, তাহলে তাদের জন্য থাকবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ। আর কন্যা যদি একজন হয় তাহলে সে অংশ পাবে পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক। মৃত ব্যক্তির কোন সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্যই থাকবে সে সম্পদের ছয় ভাগের এক ভাগ।

অপরদিকে মৃত ব্যক্তির যদি কোন সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই যদি হয় একমাত্র উত্তরাধিকারী তাহলে তার মায়ের অংশ হবে তিন ভাগের এক ভাগ। যদি মৃত ব্যক্তির কোন ভাই বোন জীবিত থাকে তাহলে তার মায়ের অংশ হবে ছয় ভাগের এক অংশ। মৃত্যুর আগে সে যে অছিয়াত করে গেছে এবং তার রেখে যাওয়া ঋণ আদায় করার পরই কিন্তু ভাগ বন্টন করতে হবে।” ওপরে কুরআনে বর্ণিত আয়াতের নিরিখে কন্যা সন্তানদেরকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যার কারণে দুই কন্যার অংশ এক পুত্রের অংশের সমান বলার পরিবর্তে বলা হয়েছে এক পুত্রের অংশ দু’ কন্যার সমান।

তারপরও অনেকেই বোনদেরকে অংশ দেয় না এবং বোনেরা একথা চিন্তা করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চক্ষুলজ্জার খাতিরে ক্ষমা করে দেয়। পাওয়া যখন যাবেই না তখন ভাইদের সাথে মনোমালিন্য করার দরকার কি? এরূপ ক্ষমা শরীয়াতের আইনে ক্ষমাই নয়, বরং ভাইদের জিম্মায় তার হক থেকেই যায়। যারা এভাবে ওয়ারিশি সম্পত্তি আত্মসাত্ করে তারা কঠোর গোনাহ্গার হবে। ওয়ারিশদের মধ্যে কেউ কেউ নাবালক কন্যাও আছে। তাদেরকে অংশ না দেয়া কবিরা গোনাহ্। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে “যারা আল্লাহর নির্ধারিত আইন অমান্য করবে তারা দোযখবাসী হবে।” পক্ষান্তরে অন্যত্র বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর হুকুম পালন করবে, আল্লাহ যে ফারায়েজ আইন করেছেন তা মান্য করবে, তারা বেহেশতি হবে। একটি দৃষ্টান্ত দিলে বোঝা সহজ হবে। আউস ইবনে সাবেত (রা.) স্ত্রী, দু’ কন্যা ও একটি নাবালেগ পুত্র রেখে মৃত্যু মুখে পতিত হন।

প্রাচীন আরবের নীতি অনুযায়ী তার দুই চাচাতো ভাই এসে তার সম্পত্তি দখল করে নিল এবং সন্তান ও স্ত্রীকে কিছুই দিল না। কেননা তাদের মতে নারীরা উত্তরাধিকারী হতো না। যার ফলে স্ত্রী ও দুই কন্যা এমনিতেই বঞ্চিত হয়ে গেল। এ খবর রসূল (স.)-এর কাছে পৌঁছলে রসূল (স.) চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন। কেননা এ ব্যাপারে তখন কোন আয়াত নাজিল হয়নি। এর অল্প সময় পরেই জিব্রাইল (আ.) মিরাস সম্পর্কিত আয়াত নিয়ে হাজির হলে রসূল (স.) আউস এর স্ত্রীকে মোট সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ দিলেন।

অবশিষ্ট সম্পত্তি পুত্র-কন্যাদের মাঝে এমনভাবে বন্টন করে দিলেন যে, অর্ধেক পুত্রকে এবং কন্যাদ্বয়কে সমান হারে দিলেন। চাচাতো ভাইয়েরা সন্তানদের মত নিকটবর্তী ছিল না। তাই তারা বঞ্চিত হলো (রুহুল মায়ানী)। এটাই আল কুরআনের পূর্ণাঙ্গরূপ। কেননা “মা ফাররতনা ফিল কিতাবে মিন শায়্যি” অর্থাত্ সকল কথাই আল কুরআনে বলা হয়েছে। যা কেয়ামত পর্যন্ত মানবতার জন্য প্রয়োজন।

যেহেতু মানুষের প্রয়োজনীয় সকল বিষয় কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেহেতু আমাদের প্রত্যেকের উচিত হলো কুরআনের আলোকে আলোকিত জীবন গঠন করা। তাহলে সমাজে থাকবে না কোন অসঙ্গতি। চলে আসবে অমীয় শান্তি। যেমনিভাবে এসেছিল রসূলের (স.) জামানায়। খোলাফায়ে রাশেদিনের জামানায়। আমরা কুরআন অনুযায়ী মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তির সুষম বন্টন করার চেষ্টা করি। সাথে সাথে ইসলামের প্রত্যেকটি বিধান রসূল (স.)-এর আদর্শের সাথে মিলিয়ে আমলে জিন্দেগী গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের সে তওফিক দান করুন, আমীন।

লেখক: জাকির হোসাইন আজাদী