ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

কঠোরতা নয়, শিশু পরিচর্যায় কোমলতাই পথ

ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শৈশব-কৈশোরই হচ্ছে শিক্ষার ভিত্তিকাল। স্বচ্ছ মেধা, সুস্থ বুদ্ধি, সরল চিন্তা ও স্পষ্ট মনোযোগের কারণে শিশুরা সহজেই সবকিছু আয়ত্ত করতে পারে। সঙ্গত কারণেই তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিও অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম।

শিশুরা শারীরিকভাবে যেমন দুর্বল, তেমনি মানসিকভাবেও কোমল। তাই তাদের সঙ্গে কোমল ও নরম আচরণ করতে হবে। তাদের প্রতি কঠোরতা পরিহার করে নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে হবে। যে আচরণ করতেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবার সঙ্গে। আম্মাজান হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিসের শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা আমাকে হঠকারী ও কঠোরতাকারীরূপে প্রেরণ করেননি; বরং সহজ-কোমল আচরণকারী শিক্ষকরূপে প্রেরণ করেছেন।—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৮

ওই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, শিক্ষার্থীর ভুল-ত্রুটিগুলো যথাসম্ভব কোমলতা ও উদারতার সঙ্গে সংশোধন করতে হবে এবং দয়া ও কোমলপন্থা অবলম্বন করতে হবে। ধমক ও ভর্ত্সনা নয়।—আর রাসুলুল মুয়াল্লিম, পৃ. ১১

এ প্রসঙ্গে কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করছি।
১. হজরত মুআবিয়া ইবনে হাকাম (রা.) বর্ণনা করেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে নামাজরত ছিলাম। হঠাত্ এক ব্যক্তি (নামাজের মধ্যে) হাঁচি দিল। প্রতিউত্তরে আমি ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললাম। লোকজন তখন আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। আমি বলে উঠলাম, আপনাদের কী হয়েছে? আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? লোকজন তাদের ঊরুতে হাত চাপড়িয়ে আমাকে শান্ত ও চুপ হতে ইঙ্গিত করল। আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করলেন। আমার বাবা-মা তার প্রতি উত্সর্গিত হোন, তাঁর মতো এত উত্তম ও সুন্দর শিক্ষাদানকারী কোনো শিক্ষক তার আগে কাউকে দেখিনি এবং তারপরেও দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে না প্রহার করলেন, না তিরস্কার করলেন, না ধমক দিলেন; তিনি বললেন, আমাদের এই নামাজ মানুষের কথাবার্তার উপযোগী নয়। (অর্থাত্ নামাজে কোনো ধরনের কথা বলা যায় না।) বরং এ তো হলো তাসবিহ, তাকবির ও তেলাওয়াতে কোরআন।—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৩৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৯৩০

২. হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা কোমল আচরণকারী, তিনি সর্বক্ষেত্রে কোমলতাকে ভালোবাসেন।—সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৬৫

মুসলিম শরীফের অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হে আয়েশা! আল্লাহ তায়ালা নম্র ব্যবহারকারী। তিনি নম্রতা পছন্দ করেন। তিনি নম্রতার জন্য এমন কিছু দান করেন, যা কঠোরতার জন্য দান করেন না।—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৩

৩. হযরত জারির রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে প্রকৃত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত।—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯০; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০৭

৪. হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোমলতা যে কোনো বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। আর কোনো বিষয় থেকে কোমলতা দূর হয়ে গেলে তাকে কলুষিত করে।—সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৪

৫. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা শিক্ষাদান কর, সহজ ও কোমল আচরণ কর; রূঢ় আচরণ করো না। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক (এ কথা তিনবার বললেন)।—মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৫৫৬, ২১৩৬।

৬. শিশুদের বা অন্য কাউকে প্রহার করা সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।  হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে কিয়ামতের দিন তার থেকে এর প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।—আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১৮৬।

মুফতি মুহাম্মাদ শফি রহ. বলেছেন, শিশুদের প্রহার করা খুবই ভয়াবহ। অন্যান্য গুনাহ তো তওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে। কিন্তু শিশুদের ওপর জুলুম করা হলে এর ক্ষমা পাওয়া খুবই জটিল। কেননা এটা হচ্ছে বান্দার হক। আর বান্দার হক শুধু তওবার দ্বারা মাফ হয় না। যে পর্যন্ত না যার হক নষ্ট করা হয়েছে সে মাফ করে। এদিকে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে সে হচ্ছে নাবালেগ। নাবালেগের ক্ষমা শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য এ অপরাধের মাফ পাওয়া খুবই জটিল। আর তাই শিশুদের প্রহার করা এবং তাদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহার করার বিষয়ে সাবধান হওয়া উচিত।—ইসলাহি মাজালিস, মুফতি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি।

আল্লামা ইবনে খালদুন ছাত্রদের প্রহার ও কঠোরতাকে ক্ষতিকর আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, খুব স্মরণ রাখবেন। শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে প্রহার করা এবং ধমক দেয়া শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটা উস্তাদের অযোগ্যতা ও ভুল শিক্ষা পদ্ধতির নমুনা। প্রহার করার ফলে শিশুদের মনে শিক্ষকের কঠোরতার প্রভাব বিরাজ করে। তাদের মন-মানসিকতায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং তারা লেখাপড়ার উত্সাহ হারিয়ে ফেলে। কঠোরতা তাদের অধঃপতনমুখী করে তোলে। অনেক সময় তাদের মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এসব ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও নীতি নৈতিকতার বিষয়টি বাদ দিলেও শিশুদের প্রহারের অশুভ প্রতিক্রিয়া হয় বহুরূপী ও বহুমুখী।

দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে জড়িত দু’একজন ব্যক্তি ইসলামী দিকনির্দেশনা ও শিক্ষার সুন্দর বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। কিছু সংখ্যক মানুষের অনৈতিক আচরণে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি কেউ কেউ বিরূপ ও বিতৃষ্ণও হচ্ছে। শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষা অত্যন্ত নাজুক বিষয়। এ জন্য উপযুক্ত শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালু করা এবং তাতে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি ইসলামী শরিয়তের নীতিমালা সামনে নিয়ে নৈতিক-মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় বজায় রাখতে হবে।

লেখক :  মুহাম্মদ আনসারুল্লাহ হাসান