ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

কন্যা সন্তানের মর্যাদা প্রদানে ইসলাম

islam.masudkabir.comসন্তান-সন্তুতি মানুষের পরম পাওয়া। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা সন্তানের আকাংখায় চোখের পানি ফেলে চললেও আশা পুরণ হচ্ছেনা। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার মহব্বতের পরিমাণ বর্ণনা শেষ হবেনা। পক্ষান্তরে মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এতটা জঘন্য ও নিকৃষ্ট হয়ে থাকে যে, তাদের বর্বরতা ও নিকৃষ্টতা বিবেককে প্রকম্পিত করে তুলে থাকে। ইসলামের প্রাক্কালে আরবদের নিকট কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়া পিতার জন্য অপমানজনক ছিল। সেসময় পিতার নিকট কন্যা সন্তান জন্মের খবর পৌঁছলে তারা এই কন্যার পিতা হওয়াকে জঘন্য অপমান জ্ঞান করে অপমানের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতো। তাই তারা কন্যাকে মাটিতে জীবন্ত প্রোথিত করতো। এহেন অমানবিক ও জঘন্য অপরাধ আরব সমাজকে বিশ্ব দরবারে আজও নিন্দিত ও ধিক্কার দিয়ে আসছে।







বিশ্ব নবী (স.) জাহেলী যুগের সেই কলুষিত অধ্যয়ের অবসান ঘটিয়ে আরব জাতিকে সুসভ্য জাতিতে পরিণত করে ছিলেন। এক ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর কাছে তার জাহেলি যুগের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, “আমার একটি কন্যা ছিল। সে আমাকে খুব ভালবাসতো। তাকে নাম ধরে ডাকলে সে দৌঁড়ে কাছে আসতো। একদিন আমি তাকে ডাকলাম। তাকে সাথে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। পথে একটি কুয়া পেলাম। তার হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে তাকে কুয়ার মধ্যে ফেলে দিলাম। তার যে শেষ কথাটি আমার কানে ভেসে এসেছিল তা হলো, ‘হায় আব্বা, হায় আব্বা!’ একথা শুনে রসূলুল্ল¬াহ (স.) কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো।

উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন বললেন, ওহে! তুমি রসূলুল্লা¬াহ (স.)-কে শোকার্ত করে দিয়েছ। রসূলুল্লাহ (স.) বললেন, তোমরা একে বাধা দিও না। যে বিষয়ে তার কঠিন অনুভূতি জেগেছে সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করতে দাও। তারপর তিনি বললেন, তোমার ঘটনাটি আবার বর্ণনা করো। সে ব্যক্তি আবার তা শুনালেন। ঘটনাটি আবার শুনে তিনি এত বেশি কাঁদতে থাকলেন যে, চোখের পানিতে তার দাড়ি মোবারক ভিজে গেল। এরপর তিনি বললেন, জাহেলি যুগে যা কিছু করা হয়েছে আল্ল¬াহ তা মাফ করে দিয়েছেন। এখন নতুন করে জীবন শুরু করো” (সুনানে দারামি)।

এমন অসংখ্য নির্মম হত্যাযজ্ঞ আরব সমাজে ঘটেছিল। ইসলাম-পূর্ব যুগে কন্যা সন্তানদের প্রতি পুতুল পূজারী কাফির-মুশরিকদের আচরণ ছিল অত্যন্ত কুিসত ও জঘন্য। আমাদের সভ্য সমাজে এহেন অপরাধ সংঘটিত না হলেও (দু’-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা অনেক সময় ঘটে, যা অপরাধ জনিত ঘটনা) সহমরণের নামে নারী জাতিকে কলংকিত করার ঘটনা বিগত শতাব্দিতে ছিল। কন্যা ও নারীদেরকে সমাজে মূল্যহীন হিসেবে বিবেচিত করার ঘটনা কতটা বিবেকহীন ও জঘন্য তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, “তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং তখন সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া তার গ্লানি হেতু সে নিজ সমপ্রদায় হতে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে দেবে! সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত করে তা কত নিকৃষ্ট” (সূরা নাহল/৫৮-৫৯)।

ইসলাম এই নিষ্ঠুর ও জঘন্য প্রথা নির্মূল করে দিয়ে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে, কন্যাদের লালন-পালন করা, শিক্ষা-দীক্ষা দেয়া, নেক আমল ও স্বামী-সংসারের কাজে পারদর্শী করে গড়ে তোলা পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য। কন্যাকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা দায়িত্ব পালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে থাকে। সন্তানদেরকে প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে মানুষ করে গড়তে না পারলে তার জন্য তাদেরকে অপরাধী হিসেবে আল্লাহর দরবারে পৌঁছতে হবে।




পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে। “জীবন্ত প্রোথিত কন্যা সন্তানকে কেয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল” (সূরা তাকবীর/৭-৮)। হাদীছ শরীফে আছে, “এই মেয়েদের জন্মের মাধ্যমে যে ব্যক্তিকে পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়, তারপর সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার কারণে পরিণত হবে” (বুখারি ও মুসলিম)।

আয়েশা (রা.) বলেন, “একদা এক মহিলা তার দু’টি কন্যা সাথে নিয়ে আমার কাছে আসল। মহিলাটি আমার কাছে কিছু ভিক্ষা চাইল। তখন আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমি তাই তাকে দিয়ে দিলাম। সে তা দু’ভাগ করে তার দু’ কন্যাকে দিলো এবং নিজে তা থেকে কিছু খেল না। তারপর সে উঠে চলে গেলো। এমন সময় নবী (স.) বাড়িতে প্রবেশ করলেন। আমি ঘটনাটি তাঁর কাছে পেশ করলাম। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি কন্যাদের ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করে, তা’হলে এই কন্যাগণ তার জন্য জাহান্নামের অন্তরাল হবে” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৪৯)।

“যে ব্যক্তি দু’টি কন্যাকে বিবাহ-শাদী দেওয়া পর্যন্ত লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করবে, আমি এবং সেই ব্যক্তি কেয়ামতের দিন এভাবে একত্রে থাকব। এই বলে তিনি নিজের আঙ্গুলগুলি মিলিয়ে ধরলেন” (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৩)।

“যার কন্যা সন্তান আছে, সে তাকে জীবিত কবর দেয়নি, তাকে দীনহীন ও লাঞ্ছিত করেও রাখেনি, আল্ল¬াহ তাকে জান্নাতে স্থান দেবেন” (আবু দাউদ)। “যার তিনটি কন্যা আছে, সেজন্য সে যদি সবর করে এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরকে ভালো কাপড় পরায়, তাহলে তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়ে পরিণত হবে” (আদাবুল মুফরাদ ও ইবনে মাজাহ)।

ইসলামে কন্যা সন্তানের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। নেক নারীর মর্যাদা মানুষের কাছেই কেবল নয় আল্লাহর দরবারে অধিক প্রশংসিত। ইসলাম নারী জাতিকে মর্যাদাদান করেছে কিন্তু আজকে নারী সমাজ ইসলামী নিয়ম-নীতিকে তোয়াক্কা না করে আবার মুর্খযুগের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এজন্য পিতা-মাতার দায়িত্ব অনেক বিশী। সন্তানকে নৈতিক চরিত্রে চরিত্রবান করে গড়ে তুলতে হবে। ইসলাম কন্যা সন্তানকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে, সুতরাং পিতা-মাতাকে ধর্মনিষ্ঠা ও সত্ কর্মপরায়ণ হিসেবে তাদেরকে মানুষ করতে হবে।

%d bloggers like this: