ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

কুরআন বোঝার প্রয়োজনীয়তা

quran-1মানবজীবনের সার্থকতা নির্ভর করে সরল সঠিক পথপ্রাপ্তির ওপর। জীবনের পথপরিক্রমায় আমরা যদি শুধু অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াই এবং সঠিক পথের সন্ধান লাভে ব্যর্থ হই তবে আমাদের জীবন হবে অন্ধকারে পরিপূর্ণ। মানুষের জন্য তাই প্রয়োজন এক মহিমান্বিত আলো; যে আলোকরশ্মি মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে। মহাগ্রন’ আল কুরআন হচ্ছে সেই মহিমান্বিত আলো যা মানুষকে সত্যের আলোকোজ্জ্বল পথে চলতে সাহায্য করে। তাকে পথনির্দেশনা দিয়ে থাকে।

মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নোয়াবে না, আর কারো দেয়া বিধান সে গ্রহণ করবে না। পবিত্র কুরআনে তা বারবার বলা হয়েছে। মহাগ্রন’ আল কুরআন সত্যের প্রতিচ্ছবি। পবিত্র কুরআনে তাই মহান আল্লাহ মহানবী সা:কে আহ্বান করে বলেছেন- ‘তুমি ঘোষণা দাও, সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অবশ্যই মিথ্যাকে বিলুপ্ত হতে হবে’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৮১)। তিনি আরো বলেন, ‘তুমি বলো, সত্য এসে গেছে বাতিল নির্মূল হয়ে গেছে’ (সূরা সাবা : ৪৯)।

সত্য ও মিথ্যা একসাথে সহাবস’ান করতে পারে না। মহান আল্লাহ চান সত্যের সৈনিকরা একতাবদ্ধ হয়ে অসত্যের তথা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না মিথ্যা ও অন্যায়কে দূরীভূত করা সম্ভব না হয়। মহান আল্লাহ মানুষকে মানুষের জন্য সতর্ককারীরূপে দেখতে চান। তিনি বলেন, ‘যারা সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারাই তো সফলকাম। তাদের জন্য তাই রয়েছে, যা তারা তাদের পালনকর্তার কাছে চাইবে। এটি সৎকর্মীদের পুরস্কার’ (সূরা যুমার : ৩৩-৩৪)।

আত্মসাৎ ও প্রতারণা করা মানুষের ও মানব সভ্যতার কলঙ্ক। এ কারণে মানুষের উচিত সব লোভ-লালসা ও কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও ইনসাফের পক্ষ অবলম্বন করা এবং নিজের কুপ্রবৃত্তিকে পরাভূত করা। পবিত্র কুরআনে মানুষের এ রোগকে অন্তরের একটি জটিল ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মানুষকে তার প্রতিকার করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। যেকোনো শারীরিক রোগের জন্য যেমন চিকিৎসা করা প্রয়োজন, মানুষের মনের অসুখের জন্যও চিকিৎসা প্রয়োজন।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন- ‘হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে উপদেশবাণী (নসিহত) এসেছে, এগুলো হচ্ছে মানুষের অন্তরে যে ব্যাধি রয়েছে তার প্রতিকারক এবং বিশ্বাসীদের জন্য হেদায়েত ও রহমত’ (সূরা : ইউনুস-৫৭)।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আরো বলেছেন- ‘আমি কুরআনে কিছু বিষয় অবতীর্ণ করেছি যা বিশ্বাসীদের জন্য নিরাময় ও অনুগ্রহ, কিন’ অত্যাচারীদের জন্য ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না’ (সূরা : বনি ইসরাইল-৮২)।

যেসব মানুষ মহাগ্রন’ আল কুরআনকে জীবনের জন্য একটি সুন্দরতম পথনির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন, তাদের যাবতীয় মানসিক সঙ্কটের (রোগের) নিরাময় হিসেবে এটি কাজ করে থাকে। কিন’ যেসব অত্যাচারী মানুষ কুরআনকে জীবনের পথনির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করে না, তারা নিজেদের আরো ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়। সত্য প্রতিভাত হওয়ার পরেও যারা সত্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করে থাকে তাদের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আর কে হতে পারে?

মানুষের জন্য কুরআন হচ্ছে জীবনীশক্তি। অন্য দিকে যারা কুরআনকে অস্বীকার করে, তারা বেছে নেয় এক কণ্টকময় জীবনযাত্রা। তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো মানবসমাজ। মানুষের মধ্যে অনেকে আছে যারা হঠকারী বা মুনাফিক। তারা মুখে যা বলে, অন্তরে তা বিশ্বাস করে না। পবিত্র কুরআনে তাদেরকেও ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন- ‘মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কিন’ তারা বিশ্বাসী নয়। আল্লাহ ও বিশ্বাসীদের তারা ঠকাতে চায় অথচ তারা নিজেদের ছাড়া কাউকে ঠকাতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। তারপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাচারী’ (সূরা বাকারা : ৮-১০)।

হালাল ও হারামের বিষয়টি পরিষ্কার করে জেনে নেয়া এবং সেই আলোকে নিজের জীবন পরিচালনা করা বিশ্বাসীদের প্রধান কাজ। আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা এবং নিজের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো বিশ্ববাসীর প্রধান কর্তব্য। মহান আল্লাহ তাই মানুষকে আহ্বান করেছেন- ‘হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও বিশুদ্ধ খাদ্য রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না’ (সূরা বাকারা : ১৬৮)।
শয়তান মানুষকে অবৈধ বস’ গ্রহণে প্রলুব্ধ করে থাকে। তাই মানুষকে সাবধান করা হয়েছে তারা যেন শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে। খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি দ্রব্য ছাড়া সব কিছুই মুবাহ বা বৈধ। যে সামান্য কয়েকটি জিনিস মানুষের জন্য মহান আল্লাহ অবৈধ ঘোষণা করেছেন তা অবশ্যই মেনে নেয়া মানুষের উচিত। মহান আল্লাহ বলেছেন- ‘তুমি কি লক্ষ করোনি, নভোমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত করে রেখেছেন এবং তোমাদের ওপর তিনি দেখা-অদেখা যাবতীয় নেয়ামত উদারভাবে ঢেলে দিয়েছেন’ (সূরা লোকমান : ২০)।

মহাগ্রন’ আল কুরআনে মহান আল্লাহ মানুষকে প্রত্যেকের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। সম্পত্তিতে কার কতখানি অধিকার রয়েছে তার বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে পবিত্র কুরআনে। সূরা নিসায় মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মাতাপিতা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে মেয়েদের অংশ রয়েছে, তা অল্পই হোক বা বেশি হোক, একটি নির্ধারিত অংশ’ (সূরা নিসা : ৭)।

পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের প্রাপ্য ও অধিকার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। প্রত্যেকের উচিত অন্যের অধিকার সংরক্ষণ করা। অন্যের প্রাপ্য গ্রহণ করা বা অন্যকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানুষের উচিত নয়। মানুষের উচিত কুরআনের দেয়া বিধান মেনে চলা। কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা হবে কুরআনপ্রদত্ত সীমারেখা লঙ্ঘন করা। আল্লাহর নির্দেশ যারা অমান্যকারী তারাই সীমা লঙ্ঘনকারী। সীমা লঙ্ঘনকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন’দ শাস্তি। এ কথা পবিত্র কুরআনে বারবার বলা হয়েছে, যারা সীমা লঙ্ঘনকারী তারা বিভ্রান্ত। যারা বিভ্রান্ত তারা সঠিক পথের সন্ধান পান না। যেসব মানুষ সঠিক পথে চলতে চান, তাদের জেনে নিতে হবে সঠিক পথের নির্দেশনা।
মহান আল্লাহ বলেন- ‘আল্লাহ তায়ালার পথনির্দেশ অমান্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়ালখুশির অনুসরণ করে তার চেয়ে বড় বিভ্রান্ত আর কে? নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারী সমপ্রদায়কে পথ দেখান না’ (সূরা কাসাস : ৫০)।

যারা আল্লাহর পথনির্দেশ মেনে চলে, যারা সীমা লঙ্ঘন করে না, তারা নিশ্চিতভাবে সুপথপ্রাপ্ত। যারা সুপথে চলেন মহান আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের সত্যপথে চলা সুগম করে দেন। মহান আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন ও ক্ষমা করবেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের বিশ্বাসকে সীমা লঙ্ঘন দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সুপথপ্রাপ্ত’ (সূরা আনয়াম : ৮২)।

মানুষের মধ্যে যারা অহঙ্কারী আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। বস’ত অহঙ্কার মানুষের সবচেয়ে কদর্য একটি গুণ। অহঙ্কার মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অহঙ্কার মানুষকে সীমা লঙ্ঘনকারী হতে শেখায়। পবিত্র কুরআনে তাই মহান আল্লাহ মানুষকে অহঙ্কার থেকে দূরে থাকার জন্য একাধিকবার তাগিদ দিয়েছেন। অহঙ্কার এমন এক রোগ যা মানুষকে সত্যপথ থেকে দূরে রাখে। মহান আল্লাহ বলেন- ‘পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে গর্ব করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শনাবলি থেকে ফিরিয়ে দেবো, অতঃপর তারা আমার প্রতিটি নিদর্শন দেখলেও তাতে বিশ্বাস করবে না, তারা সৎ পথ দেখলেও তাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না, কিন’ তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে সে পথ ধরবে। এটি এ কারণে যে, তারা আমার নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা উদাসীন ছিল’ (সূরা আরাফ : ১৪৬)।

নামাজ মানুষকে সব ধরনের পাপকাজ থেকে বিরত রাখার উৎকৃষ্টতম ঢাল। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘বিশ্বাসীরা অবশ্যই সফলকাম হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে একান্ত বিনয়াবনত’ (সূরা আল মুমিনুন : ১-২)।

জীবনকে যারা সৎ ও সুন্দর করতে চায়, তাদের অবশ্যই সব ধরনের অসৎ কর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। নামাজ মানুষকে যাবতীয় অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। নামাজে মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। মহান আল্লাহ তাই মানুষকে বারবার আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার জন্য বলেছেন।

যেহেতু মানুষ সরল ও সঠিক পথে নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে আগ্রহী, সেহেতু তার উচিত সমগ্র কুরআন শরিফ জেনে নেয়া। পবিত্র কুরআনে মানুষকে আহ্বান করা হয়েছে এক আল্লাহর উপাসনা করার জন্য। এই আহ্বান যারা গ্রহণ করবে তাদের জন্য রয়েছে ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ। মহান আল্লাহর অনুগ্রহ শুধু তাদের জন্য যারা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে আগ্রহী। তাদের অবশ্যই কুরআনের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। কুরআনের বাণীগুলো হৃদয়ে ধারণ করতে হবে, লালন করতে হবে ও পালন করতে হবে।

নিজেকে জানার জন্য, জীবনকে সৎ ও সুন্দর করার জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য আমাদের উচিত মহান আল্লাহর অফুরন্ত জ্ঞানের উৎস মহাগ্রন’ আল কুরআন জানা ও উপলব্ধি করা এবং সেই মোতাবেক নিজের জীবনকে পরিচালিত করা। আমাদের যার যতটুকু সুযোগ আছে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, জীবনের প্রতিমুহূর্তের করণীয় সম্পর্কে কুরআনের দিকনির্দেশনা অনুসারে নিজের জীবনকে পরিচালিত করার মধ্যেই রয়েছে জীবনের সার্থকতা। ইহকালীন ও পরকালীন জীবনকে সুন্দর, সার্থক ও কল্যাণময় করার জন্য কুরআনের কোনো বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন জানার ও মানার জন্য তৌফিক দান করুন। এটিই হোক আমাদের সবার আন্তরিক কামনা।

লেখক : কাজী মো: মোরতুজা আলী